বৃহস্পতিবার ১২ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
Advertisement Placeholder

জ্বালানিসংকটে ঈদযাত্রায় অস্থিরতা, সিলেট রুটে চরম ভোগান্তির শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

জ্বালানিসংকটে ঈদযাত্রায় অস্থিরতা, সিলেট রুটে চরম ভোগান্তির শঙ্কা

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের উত্তাপে বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে তেলের বাজার। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের পরিবহন খাতে। আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে জ্বালানি সংকটের শঙ্কায় দূরপাল্লার অনেক রুটে আগাম টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন বাস মালিকরা। এতে ঈদযাত্রার শুরুতেই চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ঘরমুখো মানুষ।

তেলসংকটে বাস চলাচল ব্যাহত
বাজারে জ্বালানি তেলের ‘কৃত্রিম সংকটে’ পেট্রল-অকটেনের পর এবার বিপাকে পড়েছেন ডিজেলচালিত গণপরিবহনের মালিক ও চালকরা। রেশনিং পদ্ধতির দোহাই দিয়ে পাম্পগুলো চাহিদার তুলনায় সামান্য তেল দেওয়ায় রাজধানীর লোকাল ও দূরপাল্লার অনেক বাসের ট্রিপ (যাতায়াত) সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বলছে, দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তেল নতুন কার্গো বন্দরে পৌঁছানো শুরু করেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী লোকাল বাসের জন্য ৭০-৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাসের জন্য ২০০-২২০ লিটার ডিজেল বরাদ্দের কথা থাকলেও বাস্তবে মিলছে ২০-৫০ লিটার। চালকদের দাবি, এক দিনের ট্রিপ সম্পন্ন করতে যেখানে ৫০-৭০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়, সেখানে মাত্র ১০-২০ লিটার তেল দিয়ে গাড়ি চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক বিফ্রিংয়ে বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই এবং আপাতত দাম বাড়ানোরও কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। প্রতিমন্ত্রী জানান, আসন্ন রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এই আশ্বাসেও পরিবহন মালিকদের শঙ্কা কাটছে না। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এম এ বাতেন বলেন, ‘অনেক বাস মালিক আশঙ্কা করছেন জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে। সরকার বলছে তেলের দাম বাড়বে না। তবে বাস মালিকরা এই আশ্বাসে আস্থা রাখছেন না। জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে–এমন শঙ্কায় অনেকে রাস্তায় বাস নামাচ্ছেন না। এতে সংকট তৈরি হয়েছে।’

ঈদে ঘরমুখো মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে আগামী ১২ মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে বিআরটিএর ১০ জন অতিরিক্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন। ঈদযাত্রায় লক্কড়ঝক্কড় বা ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ঈদ উপলক্ষে বিআরটিসি ১ হাজার ২৪৫টি বাসের বিশাল বহর প্রস্তুত রেখেছে, যার মধ্যে ৭৭৫টি বাস ঢাকা থেকে এবং ৪৭০টি আন্তজেলা রুটে ‘স্পেশাল সার্ভিস’ হিসেবে চলবে।

২০৭ স্পটে যানজটের ঝুঁকি
জ্বালানিসংকটের পাশাপাশি বরাবরের মতো এবারও ভোগান্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যানজট। হাইওয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, এবার সারা দেশে ২০৭টি স্পটকে ‘যানজট-প্রবণ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব পয়েন্টে গাড়ির জট সামাল দেওয়া পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান খান বলেন, ‘উৎসবের সময় গাড়ির চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। চিহ্নিত স্পটগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন থাকলেও সংকীর্ণ রাস্তা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।’

ঈদযাত্রার আগে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে। এই মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান থাকায় রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় খানাখন্দ ও ডাইভারশন তৈরি হয়েছে। ফলে এবারের ঈদে সিলেট অভিমুখী যাত্রীদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে।

সড়কপথের এই দুরবস্থার কারণে যাত্রীদের পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে রেলওয়ের ওপর। রেল কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, বাসসংকটে এবার সিলেট রুটের ট্রেনগুলোতে তিল ধারণের জায়গা থাকবে না।

রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘সড়কপথের ভোগান্তি এড়াতে সবাই ট্রেনের দিকে ঝুঁকছেন। সিলেট রুটে যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ থাকবে, যা সামাল দিতে আমরা বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।’

ঈদুল ফিতরে যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। ঈদের অন্তত ১০ দিন আগে দেশের সব জাতীয় মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ করিডরগুলোর মেরামত ও সংস্কারকাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ জানিয়েছে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের রাস্তা সংস্কারসহ গাজীপুর ও টঙ্গী এলাকার যানজট নিরসনে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং উত্তরবঙ্গগামী মহাসড়কের খানাখন্দ দ্রুত মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঈদের দিনসহ আগের ৭ দিন এবং পরের ৫ দিন সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে।

রেলে ইঞ্জিন-কোচ সংকট
আসন্ন ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে বরাবরের মতো এবারও হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কিছু বাড়তি কোচ সংযোজন এবং দাঁড়িয়ে যাওয়ার (স্ট্যান্ডিং) টিকিট বিক্রি করেই যাত্রীর চাপ সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী পরিবহন করা হলেও ঈদের আগে এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০ গুণ। এই বিপুল চাপ সামলাতে অন্তত ২০০টি পুরোনো কোচ মেরামত করে বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়তলী ও পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে ওয়ার্কশপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, পূর্বাঞ্চল রেলে প্রতিদিন ১১৯টি ইঞ্জিনের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৭০-৭৫টি। ফলে শিডিউল বিপর্যয় ও ট্রেন বাতিলের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে ২ হাজার ২৫৫ জন শ্রমিকের পদের বিপরীতে কাজ করছেন মাত্র ৭১০ জন। ফলে, চাইলেও দ্রুত মেরামত কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।

মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বাস চলাচলে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় এবার ট্রেনে বাড়তি চাপের আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সুবর্ণ ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেসসহ গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনগুলোতে সর্বোচ্চ ৩টি পর্যন্ত বাড়তি কোচ যুক্ত করা হবে। এ ছাড়া আন্তনগর ট্রেনগুলোর সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল ও কম গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনের ইঞ্জিন দিয়ে ‘স্পেশাল ট্রেন’ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে রেলের পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘বাড়তি কোচ’ আদতে নিয়মিত কোচের ঘাটতি মেটানোর একটি প্রক্রিয়া মাত্র। ২৫ শতাংশ ‘স্পেয়ার’ কোচ থাকার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা নেই। ফলে দাঁড়িয়ে যাওয়া যাত্রীদের ভিড়ে নিয়মিত আসনের যাত্রীদের ভোগান্তি এবারও অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

Facebook Comments Box
আরও
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
Advertisement
সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়