
নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৯৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে হ্যাকাররা এখন সহজেই বেনামী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে কারো আসল পরিচয় শনাক্ত করতে পারে বলে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
নতুন গবেষণা সতর্ক করে বলেছে, এআইয়ের কারণে হ্যাকারদের জন্য এখন বেনামী বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা অনেক সহজ হয়েছে।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, অধিকাংশ পরীক্ষায় দেখা গেছে, অনলাইনে বেনামী ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা তথ্যের ভিত্তিতে অন্য প্ল্যাটফর্মে থাকা তাদের আসল পরিচয়ের সঙ্গে সফলভাবে মিলিয়ে দিতে পারছে ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ বা এলএলএম বা চ্যাটজিপিটির মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর মূল প্রযুক্তি।
এআই গবেষক সায়মন লারম্যান ও ড্যানিয়েল পালেকা বলেছেন, বিভিন্ন এলএলএম এখন উন্নতমানের ‘প্রাইভেসি অ্যাটাক’ বা প্রাইভেসি হরণ করাকে সহজ ও সাশ্রয়ী করে তুলেছে। ফলে অনলাইনে কোন তথ্যটিকে ব্যক্তিগত বা গোপন বলা যাবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
গবেষকরা তাদের পরীক্ষায় কিছু বেনামী অ্যাকাউন্ট এআইয়ের কাছে জমা দিয়ে সেগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে বলেন। তারা কাল্পনিক উদাহরণ দিয়ে দেখান যে, ধরা যাক একজন ব্যবহারকারী স্কুলে নিজের পড়াশোনার সমস্যার কথা বলছে এবং ‘ডলোরেস পার্ক’-এ তার ‘বিস্কুট’ নামের কুকুরটিকে নিয়ে হাঁটতে যাওয়ার কথা লিখেছে।
সেই কাল্পনিক ঘটনায়, এআই তখন ইন্টারনেটের অন্যান্য জায়গায় এসব তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান চালায় এবং কাল্পনিক নামের অ্যাকাউন্টটির আসল পরিচয় নির্ভুলভাবে শনাক্ত করে ফেলে।
উদাহরণটি কাল্পনিক হলেও গবেষণায় লেখকরা এমন কিছু পরিস্থিতির কথা বলেছেন, যেখানে সরকার এআই ব্যবহার করে বেনামে পোস্ট দেওয়া ভিন্নমতাবলম্বী ও অধিকারকর্মীদের ওপর নজরদারি চালাতে পারে বা হ্যাকাররা কারো ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে জালিয়াতি করতে পারে।
এআই নজরদারি দ্রুতই বাড়ছে, যা কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও প্রাইভেসি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। এ নজরদারিতে এলএলএম ব্যবহার করে অনলাইনে কোনো ব্যক্তির বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে ম্যানুয়ালি করা প্রায় অসম্ভব।
গবেষক লারম্যান বলেছেন, অনলাইনে সাধারণ মানুষের যেসব তথ্য সহজে পাওয়া যায় সেগুলো এখন জালিয়াতির কাজে ‘সরাসরি অপব্যবহার’ করা সম্ভব, যার মধ্যে রয়েছে ‘স্পিয়ার ফিশিং’। এর মাধ্যমে বিশ্বস্ত বন্ধু সেজে ভুক্তভোগীকে তার ইনবক্সে থাকা কোনো ম্যালওয়্যার লিংকে ক্লিক করতে প্ররোচিত করে হ্যাকার।
এখন এ ধরনের উন্নতমানের সাইবার আক্রমণ চালানোর জন্য আগের মতো বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন কমেছে। হ্যাকারদের এখন কেবল একটি ইন্টারনেট সংযোগ এবং সাধারণ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোতে প্রবেশাধিকার থাকলেই চলছে।
‘ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন’ বা ইউসিএল-এর কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক পিটার বেন্টলি বলেছেন, বেনামী অ্যাকাউন্ট শনাক্তের বাণিজ্যিক প্রযুক্তি বা পণ্য যদি বাজারে চলে আসে তবে তা গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এর একটি বড় সমস্যা হচ্ছে বিভিন্ন এলএলএম প্রায়ই ভুলভাবে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টকে একে অপরের সঙ্গে যোগ করে ফেলবে। বেন্টলি সতর্ক করে বলেছেন, “এর ফলে মানুষ এমন সব কাজের জন্য অভিযুক্ত হতে পারেন, যা আসলে তিনি করেননি।”
এদিকে, ‘ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরা’র সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ের অধ্যাপক মার্ক জুয়ারেজ আরেকটি উদ্বেগের কথা বলেছেন। তার মতে, এআই মডেলগুলো সামাজিক মাধ্যমের বাইরেও সাধারণ মানুষের অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করতে পারে। যেমন, হাসপাতালের রেকর্ড, ভর্তির তথ্য ও বিভিন্ন পরিসংখ্যানগত ডেটা।
এআইয়ের যুগে নাম পরিচয় গোপন রাখার যে কঠোর মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন, এসব তথ্য হয়ত সেই নিরাপত্তা দিতে যথেষ্ট নয়।
জুয়ারেজ বলেছেন, “বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক। আমি মনে করি এ গবেষণাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, বর্তমান কাজের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবা উচিত।”
অনলাইনে পরিচয় গোপন রাখার ক্ষেত্রে এআই কোনো জাদুকরী অস্ত্র নয়। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন এআই মডেল বেনামী তথ্য থেকে পরিচয় শনাক্ত করতে পারলেও সেখানে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট তথ্য থাকে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ফলাফলের সংখ্যা এত বেশি হয়ে যায় যে, নির্দিষ্ট কাউকে খুঁজে বের করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।
