মঙ্গলবার ১৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে-বিপক্ষে বাহাস

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে-বিপক্ষে বাহাস

সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে-বিপক্ষে গতকাল রোববার বাহাস হয়েছে সংসদে। গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বান না করলে রাজপথে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিরোধী দল। সরকারি দল বলছে, গণভোটের রায়কে মান্য করলেও সংবিধানে অস্তিত্ব না থাকায় পরিষদের সভা আহ্বানে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারে না।

দুই পক্ষে বাহাসের মধ্যে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না দিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম বলেছেন, নোটিশ পেলে তিনি সিদ্ধান্ত জানাবেন। এর মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন শেষ হয়েছে। ঈদের ছুটির পর আগামী ২৯ মার্চ আবার বসবে সংসদ।

স্পিকারের সভাপতিত্বে গতকাল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শুরু হয় সংসদ অধিবেশন। বৈঠক শুরুর পরপরই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি তখনই বিষয়টি তুলতে চাইলে স্পিকার তাঁকে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পর ফ্লোর দেওয়ার কথা বলেন।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা রোববার শেষ হয়েছে। এরপর কী হবে– অনিশ্চয়তার মধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা দ্রুত সভা আহ্বানের দাবি জানান সংসদে। সরকারি দল বিএনপি আগের মতোই বলে, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার আগে পরিষদের সভা আহ্বানের সুযোগ নেই। সংবিধান সংস্কার পরিষদের দাবিতে ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে সবচেয়ে সরব ছিল গণসংহতি আন্দোলন। দলটি এখন সরকারি জোটের। তবে বিএনপির মতো তারাও পরিষদের শপথ নেয়নি। শপথ নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি জোটের ৭৭ এমপিসহ ৭৮ জন।

বিএনপিও গণভোটে একমত ছিল। তবে দলটি আদেশ জারির বিপক্ষে ছিল। গত ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনে রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করেন। এ আদেশের ওপর গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হয়। ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটার হ্যাঁ ভোট দিয়ে আদেশটি অনুমোদন করেন।

হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এ পরিষদ গণভোটের ফল অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করবে। ভোটের অনুপাতে (পিআর) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়ে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠন করবে।

তবে এই আট প্রস্তাবের মধ্যে নির্বাচন কমিশন বাদে বাকিগুলোতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) রয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ জিতলেও এগুলো বাস্তবায়নে রাজি নয় দলটি। যদিও গত ৫ অক্টোবর ঐকমত্য কমিশনে সনদ বাস্তবায়নে সংলাপে দলটির প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, গণভোটের ফল মানতে সংসদ বাধ্য থাকবে। গতকাল সংসদে তিনি আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর, তাঁর এই পুরোনো বক্তব্য সামাজিকমাধ্যমে আসে।

বিরোধীদের অভিযোগ, বিএনপি জুলাই সনদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাকতা করছে। এনসিপি এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ অধিবেশন থেকে বেরিয়ে বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিএনপি গণভোটের সঙ্গে বেইমানি করছে।

এরপর কী

ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সভা আহ্বান না করায় পরিষদ বাতিল হয়ে গেছে কিনা– এ নিয়ে স্পষ্ট জবাব সরকারি দলের দিক থেকে পাওয়া যায়নি। সংবিধানের ৭২(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করতে হবে।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি বলেন, অতীতে ফল প্রকাশের ৩০ দিনের অনেক পর সংসদের অধিবেশন বসার নজির রয়েছে। তাতে সংসদ বাতিল হয়ে যায়নি। পরিষদও একই কারণে বাতিল হয়নি।

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফল প্রকাশে ৩৯ দিন পর ২ এপ্রিল বসে দ্বিতীয় সংসদ। ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফল প্রকাশের ৬১ দিন পর তৃতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয় ১৯৮৬ সালের ১০ জুলাই। চতুর্থ সংসদে অধিবেশন বসে ফল প্রকাশের দেড় মাস পর।

সংসদে সমাধান না পেলে রাজপথ

প্রশ্নোত্তরের পর ফ্লোর নেন জামায়াত আমির। সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন এখনও না ডাকায় জাতীয় সংসদে উদ্বেগ জানান। তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ পুরোটা সংসদে পড়েন। তারপর প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি দল আদেশের কিছুটা মানে, কিছুটা মানে না– তা কী হতে পারে?

সংবিধানে পরিষদের বিধান নেই– সরকারি দলের এই বক্তব্য খণ্ডন করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এ সংসদ স্বাভাবিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি।

সংসদ থেকে বেরিয়ে শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, সংসদে সমাধান না হলে পরিষদের জন্য রাজপথে আন্দোলনে যাবে ১১ দল। স্পিকারের অনুরোধ অনুযায়ী নোটিশ দেব। সংসদের ভেতরেই সমাধান চাই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ পরিষদের সভা আহ্বানের বিষয়টি সংসদে কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে আলোচনার প্রস্তাব করেছেন– এ বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এটি সংসদের বিষয়। সংসদেই সমাধান হোক।

সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ না থাকার বিষয়ে সরকারি দলের বক্তব্য প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সংবিধানে ২০২৬ সালে নির্বাচন ছিল না। রাষ্ট্রপতির আদেশে তা হয়েছে। দেশের একটি অংশ সংবিধানের বাইরে গেলেও মানবেন, আরেক অংশ বাইরে গেলে মানবেন না, না মানলে দুটাই না মানেন। মানলে দুটাই মানতে হবে।

আদেশকে বৈধ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, জনগণের অভিপ্রায় সর্বোচ্চ সংবিধান। জনগণ গণভোটে তাদের রায় দিয়েছেন। গণভোটে সরকারি দলও সম্মত ছিল। আমাদের দাবি ছিল গণভোট আগে হোক। তাদের দাবি ছিল গণভোট ও নির্বাচন একই দিনে হোক। তাদের দাবিই বাস্তবায়ন হয়েছে। গণভোটে সংস্কারের পক্ষের প্রস্তাব বিজয়ী হয়েছে।

সংবিধান দেখালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যের পর সরকারি দলের পক্ষে জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কোন বিধিতে শফিকুর রহমান বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এরপর সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীও রাষ্ট্রপতিকে সভা আহ্বানের পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই আদশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, যখন সংসদ থাকে না, রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। সংবিধানের ৯৩ (১)(ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংবিধান পরিবর্তন হবে– এমন কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। সেটা জায়েজ নেই। সংবিধান সংশোধনের কোনো বিধান রাষ্ট্রপতি করতে পারেন না। কিন্তু এই আদেশটি না অধ্যাদেশ, না আদেশ। মাঝামাঝি কী জিনিস! সে জন্য আমি বলেছিলাম হয়তো ‘নিউটার জেন্ডার’ হতে পারে।

আদেশকে আরোপিত বলে আখ্যা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে অসাংবিধানিকভাবে শপথ নিয়েছেন।

বিরোধী দলকে কটাক্ষ করে সালাহউদ্দিন বলেন, বিরোধী দলের বন্ধুরা রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনতে চাননি, তারা চলে গেছেন। আবার সেই ভাষণের ওপর আলোচনার জন্য বিরোধীদলীয় নেতা প্রস্তাব করেছেন ৫০ ঘণ্টা বরাদ্দ করা হোক।

গণভোট ও জুলাই আদেশ নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এখানে হয়তো বিচার বিভাগ মতামত দেবে, বিচার বিভাগের মতামত এই সার্বভৌম সংসদের ওপরে কখনও বাধ্য নয়। আর এই সংসদ কখনও এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যেটা আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে অবৈধ হয়ে যাবে। কাজেই আমাদের উভয় দিকে লক্ষ্য রেখে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে যেতে হবে।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জনগণ জুলাই সনদ চায় কি চায় না– প্রশ্নে গণভোট চেয়েছিলেন। কিন্তু গণভোটে দেওয়া হলো চারটি প্রশ্ন। একটি বিশাল প্রশ্ন, যে বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে সমঝোতা হয়নি। এটি একটি জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ। জনগণ সেটা পড়ে হ্যাঁ এবং না দিয়েছে কিনা আমি জানি না।

সংস্কারে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করা তিনি বলেন, তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে। কোনো কিছু অস্বীকার করছি না। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে; কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে, আইনগতভাবে দিতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্র ইমোশন দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে, আইন দিয়ে, কানুন দিয়ে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছে প্রথম দিনে। সময় আছে ৩০ দিন। এই সময়ের মধ্যে এই অধ্যাদেশগুলো সম্পর্কে ফয়সালা করতে হবে। মাঝে ১৫ দিন এখন লম্বা ছুটি। তারপর বাজেট অধিবেশন। বাজেট অধিবেশনের সময় যদি সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সংসদ সিদ্ধান্ত নেয়, কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে যদি সিদ্ধান্ত হয়, তখন জুলাই জাতীয় সনদকে ধারণ করে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিল উত্থাপন করতে পারে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়