
নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চট্টগ্রামের জনপদে একসময় যে বলী খেলার জয়জয়কার ছিল, এখন তা বিলুপ্তির পথে। মাঠের অভাব, অপরাজনীতি ও মোবাইল ফোনের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্য যেন কেবলই গল্প। সময়ের বিবর্তনে সব জৌলুশ এখন ফিকে হয়ে আসছে। টিকে আছে কেবল জব্বারের বলী খেলা।
চট্টগ্রামে একসময় বৈশাখ ছিল উৎসবের মাস। এক উপজেলার খেলা শেষ হতে না হতেই অন্য উপজেলায় শুরু হতো নতুন আয়োজন। ফটিকছড়ির কবির বলীর (মরহুম কবির আহমদ) বড় ছেলে মান্নান বলীর স্মৃতিতে আজও ভাসছে সেই চার দশক আগের দিনগুলো। তিনি খবরের কাগজকে জানান, তার বাবা অসংখ্য বলী খেলায় জিতে এত শিল্ড পেয়েছিলেন যে তার কোনো হিসাব নেই। সেসব শিল্ড এলাকার ছোট আয়োজকদের কাছে বিক্রিও করতে হতো।
আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘একসময় বিজয়ী বলীর গলায় টাকার মালা পরিয়ে মেলায় ঘোরানো হতো, যা দেখে কিশোরদের মনে বলী হওয়ার স্বপ্ন জাগত। সেই দৃশ্য এখন দুর্লভ।’
সে সময় ফটিকছড়ির সেবাখোলার বিল, করইল্যে পুকুর পাড়, ঘাইস্যের ঘাটা কিংবা হাটহাজারীর চারিয়ার বলী খেলা ছিল তুঙ্গে। কবির বলী নিজে সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে যুবকদের বলী খেলার কলাকৌশল শেখাতেন। তার শিষ্য জহুর বলী লালদীঘির ময়দানে ট্রফি জিতেছিলেন। কিন্তু আজকের যুবকদের সেই আগ্রহ নেই; তারা মোবাইলের স্ক্রিনেই সময় কাটাতে ব্যস্ত।
গ্রামাঞ্চলের মেলাগুলো হারিয়ে গেলেও ঐতিহ্যের বাতিঘর হয়ে টিকে আছে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক আব্দুল জব্বারের বলী খেলা। ১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুবকদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে এই খেলার সূচনা করেছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বার সওদাগর। গবেষক আব্দুল হক চৌধুরীর ভাষায়, ‘চট্টগ্রাম বলীর দেশ’। একসময় পাড়ায় পাড়ায় বলী খেলা হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এই ঐতিহ্যে ছন্দপতন শুরু হয়।
এ বছর লালদীঘি ময়দানে বসছে এই মেলার ১১৭তম আসর। ২৪ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। আব্দুল জব্বারের নাতি ৭১ বছর বয়সী শওকত আনোয়ার বাদল স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘চৈত্র মাস থেকেই বলীরা নৌকা-সাম্পানে করে চলে আসতেন। তাদের থাকা-খাওয়ার রাজকীয় ব্যবস্থা হতো। তখন বলীদের কোনো অভাব ছিল না।’ বাদল বলেন, ‘আগে গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ছিল।’
তিনি বলেন, এখনকার বলীরা হয়তো এক দিন আগেই আসেন বা খেলার দিন হাজির হন। তবে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন সারা বিশ্ব এই খেলা দেখতে পায়।
গ্রামাঞ্চলে উৎসবের এই ভাটার পেছনে গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। লোক, গবেষক ও কবি শামসুল আরেফীন এবং শওকত আনোয়ার বাদলের মতে, বলী খেলা বিলুপ্তির পেছনে মূল কারণগুলো হলো স্থানীয় অপরাজনীতি ও কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, খেলার মাঠের চরম সংকট, ধর্মীয় । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চন্দনাইশের ভরাপুকুরের বলী খেলাটি র কারণেই বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বলী অর্থের অভাবে দূর-দূরান্ত থেকে আসার উৎসাহ হারান। এলাকাভিত্তিক খেলা বন্ধ হওয়ায় নতুন করে কুস্তিগীর তৈরি হচ্ছে না।
সবকিছুই যে নেতিবাচক, তা নয়। গবেষক শামসুল আরেফীন মনে করেন, ‘আধুনিকতা ঐতিহ্যের শত্রু নয়; বরং আধুনিক মানুষ তার সংস্কৃতিকে আরও বেশি লালন করবেন। অনেক মেলা হারিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের সিআরবি শিরীষতলার মতো কিছু জায়গায় নতুন করে উৎসবের আমেজ তৈরি হচ্ছে।’
