
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চকচকে কালো রঙের বিশালদেহী গরু। ঠিক পাশেই বাঁধা একটি খাসি। কালো-সাদা রঙের মিশেলে লোমশ শরীর, মাথায় বাঁকানো শিং। পাশাপাশি বাঁধা এই প্রাণী দুটি কোরবানির হাটের বাড়তি আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি কোরবানির হাটের ১ নম্বর হাসিল ঘরের কাছেই দেখা মেলে প্রাণী দুটির। হাটে আসা অনেক মানুষের কৌতূহল গরুটি নিয়ে। পাশে দাঁড়িয়ে আগ্রহী মানুষের নানা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন মজিবর জমাদ্দার নামের এক ব্যক্তি।
কথা বলে জানা যায়, গরুটির নাম রাখা হয়েছে ‘কালা মানিক’। এর মালিক সোহাগ মৃধা। তাঁরা পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থেকে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে হাটে এসেছেন। মজিবর জমাদ্দার সম্পর্কে সোহাগের চাচা। মজিবর জমাদ্দার জানান, কালা মানিকের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ফুট, উচ্চতা ৬ ফুট। ওজন প্রায় ৪৫ মণ বা ১ হাজার ৮০০ কেজি। সাত বছর ধরে বাড়িতে লালনপালন করা হয়েছে গরুটি। খাওয়ানো হয়েছে ভুসি আর ঘাস।
গরুর সঙ্গে থাকা খাসিটি আলাদাভাবে বিক্রি করা হবে না জানিয়ে মজিবর জমাদ্দার বলেন, যে ব্যক্তি কালা মানিক কিনবেন, তাঁকে উপহার হিসেবে খাসিটি দেওয়া হবে। খাসিটির ওজন প্রায় ৫০ কেজি।
তবে দুপুর পর্যন্ত গরুটির নির্দিষ্ট দাম বলতে চাননি তাঁরা। পরে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সোহাগ মৃধা জানান, গরুটির দাম চাওয়া হচ্ছে ২২ লাখ টাকা। হাটে আনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১৯ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম উঠেছে। তবে ২০ লাখ টাকা পেলেই গরুটি বিক্রি করে দেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁদের।
গতকাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজধানী ঢাকায় কোরবানির পশুর হাট শুরু হয়েছে। এ বছর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ২১টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলেও বসেছে ২০টি হাট। দুই সিটি এলাকায় ১০টি করে অস্থায়ী হাট পরিচালিত হচ্ছে। তবে খিলক্ষেত থানাধীন মস্তুল চেকপোস্ট-সংলগ্ন নির্ধারিত হাটটি বসেনি। সংশ্লিষ্ট ইজারাদার পুরো অর্থ পরিশোধ না করায় হাটটি চালু করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
অস্থায়ী হাটের পাশাপাশি রাজধানীতে রয়েছে দুটি স্থায়ী পশুর হাট। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটির গাবতলী ও ঢাকা দক্ষিণ সিটির সারুলিয়া পশুর হাটেও জমে উঠেছে কেনাবেচা। গতকাল দুপুরে উত্তরা দিয়াবাড়ি কোরবানির হাটে গিয়ে দেখা যায়, উত্তরা ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন বউ বাজার এলাকার খালি জায়গাজুড়ে বসেছে পশুর হাট। হাটের বিভিন্ন অংশে তখনো চলছিল শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও গরুকে গোসল করানো হচ্ছে, কোথাও দেওয়া হচ্ছে খাবার।
হাটজুড়ে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর সংখ্যাই বেশি চোখে পড়ে। বিশাল আকৃতির বা বাহারি নামের গরু তখনো খুব বেশি দেখা যায়নি। ত্রিপল টানানো প্যান্ডেলের নিচে সারি সারি গরু বাঁধা ছিল। তবে দুপুর পর্যন্ত ক্রেতাদের উপস্থিতি কম ছিল। অনেকে পরিবার নিয়ে হাট ঘুরে পশু দেখছিলেন, কেউ দাম জিজ্ঞাসা করছিলেন, আবার কেউ দরদামও করছিলেন।
দ্বিতীয়বারের মতো হাটে ‘বরিশালের বাদশা’
কোরবানির হাটে বড় গরুর তালিকায় নজর কাড়ছে ‘বরিশালের বাদশা’ নামের একটি বিশালাকৃতির গরু। উত্তরার দিয়াবাড়ি হাটে গরুটি নিয়ে এসেছেন বরিশালের বাবুগঞ্জের খামারি কামরুল ইসলাম। তাঁর দাবি, প্রায় ৯ বছর ধরে লালনপালন করা হয়েছে গরুটি।
কামরুল ইসলাম জানান, বরিশালের বাদশার ওজন প্রায় ১ হাজার ৪০০ কেজি। গরুটির দাম চাওয়া হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। এলাকায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম উঠলেও আরও ভালো দামের আশায় ঢাকার হাটে এনেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার গরুটি নিয়ে হাটে আসতে ট্রাকভাড়া দিতে হয়েছে ২১ হাজার টাকা।
কামরুল ইসলাম বলেন, গত বছরও পুরান ঢাকার ধোলাইখাল হাটে তোলা হয়েছিল বরিশালের বাদশাকে। তখন ৯ লাখ টাকা দাম উঠলেও বিক্রি করেননি তিনি। পরে গরুটি আবার বাড়িতে ফিরিয়ে নেন।
কামরুল ইসলাম দাবি করেন, ঘাস ও ভুসি খাইয়ে গরুটি বড় করা হয়েছে। মোটাতাজাকরণের কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি। তাই প্রত্যাশিত দাম না পেলে এবারও গরুটি বাড়িতে ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
দেখতে যেন ‘যমজ’ গরু
চুয়াডাঙার আলমডাঙ্গা থেকে ২৬টি গরু নিয়ে উত্তরার দিয়াবাড়ি কোরবানির হাটে এসেছেন পাইকার আক্তার ব্যাপারী। এর মধ্যে দুটি বড় গরু আলাদাভাবে নজর কাড়ছে ক্রেতাদের। পাশাপাশি দাঁড় করালে গরু দুটির গঠন, রং ও আকৃতিতে এতটাই মিল যে অনেকেই ‘যমজ গরু’ মনে করছেন।
আক্তার ব্যাপারী জানান, বড় দুটি গরু তিনি বাছুর অবস্থায় কিনে সাড়ে তিন বছর ধরে নিজের বাড়িতে পালন করেছেন। তাঁর ভাষ্য, দুই বাড়ি থেকে কেনা হলেও গরু দুটির আকার-আকৃতিতে মিল রয়েছে। কাঁচা ঘাস, বিচালি ও গমের ভুসি খাইয়ে বড় করা হয়েছে গরুগুলোকে। দুই মাস আগে একটির ওজন হয়েছিল ৯৮০ কেজি, অন্যটির ৯৭০ কেজি। এখন ওজন আরও বেড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা তাঁর।
গরু দুটির দাম নিয়ে আক্তার ব্যাপারী বলেন, প্রথমে ২৫ লাখ টাকা চাইলেও এখন ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ছাড়তে রাজি আছেন। তাঁর দাবি, বড় গরু এবার তুলনামূলক কম এসেছে। হাটে ছোট ও মাঝারি গরুর সংখ্যাই বেশি।
জোড়া গরু ২১ লাখ টাকা
কালশী বালুর মাঠ কোরবানির হাটের হাসিল ঘরের পাশেই নজর কাড়ছে ফ্রিজিয়ান জাতের দুটি বিশাল গরু। একটি সাদা, অন্যটি কালো। আকার-আকৃতি ও ওজনে প্রায় সমান এই দুই গরুই এখন হাটটির বড় আকর্ষণ। গরু দুটির মালিক সিরাজগঞ্জের খামারি আমীর হোসেন। তিনি জানান, প্রতিটি গরুর ওজন প্রায় ১ হাজার ১০০ কেজি। দাম চাওয়া হচ্ছে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে, অর্থাৎ জোড়া গরুর মোট দাম ২১ লাখ টাকা।
আমীর হোসেন বলেন, ‘এই দুইটা আমার নিজের খামারের গাভির পেটের গরু। সাড়ে চার বছর ধইরা অনেক যত্ন নিয়া পালছি। ছোলা, ভুসি, কুড়া, খইল খাওয়াইছি। ওষুধপত্রেও ভালো খরচ হইছে।’
কোরবানির হাটে এখনো পুরোপুরি জমে ওঠেনি বেচাকেনা। তবে হাটজুড়ে ছোট ও মাঝারি আকারের দেশি গরুই বেশি চোখে পড়ছে। বিক্রেতাদের আশা, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়বে ক্রেতার ভিড় ও বিক্রি।
রাজবাড়ী থেকে আটটি দেশি গরু নিয়ে কালশী বালুর মাঠ হাটে এসেছেন ইমন শেখ। নিজের বাড়িতে পালন করা গরুগুলোর মধ্যে শুক্রবার একটি মাঝারি আকারের ষাঁড় ২ লাখ ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। ইমনের আশা, বেচাকেনা শুরু হলে বাকি গরুগুলোও বিক্রি হয়ে যাবে।
