বৃহস্পতিবার ৯ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগে যাচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী স্বপ্নের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এখন হাটবাজার চট্টগ্রাম বোর্ডের বুধবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত ৩ দিনে বিপৎসীমা অতিক্রম করবে তিস্তা, ১২ জেলায় বন্যার আভাস সংসদে নিষ্প্রভ জামায়াত, এমপিদের ভূমিকায় বিব্রত শনিবারের মধ্যে সব ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন না করলে লাইসেন্স বাতিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী কক্সবাজারে পাহাড়ধসের বিভীষিকা, একরাতেই প্রাণ গেল ৯ জনের জনগণের বিশ্বাস ও ভালোবাসার ওপর নির্ভরতা বজায় রাখতে চাই: প্রধানমন্ত্রী সরকারি অনুষ্ঠানের ব্যানার-বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর থ্রিডি ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ শাহ আমানতে কার্গো ফ্লাইট চালুর উদ্যোগে ভাটা পড়েছে
Advertise with us

স্বপ্নের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এখন হাটবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

স্বপ্নের মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এখন হাটবাজার

যানজটের রাজধানীতে কর্মব্যস্ত মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও স্বস্তির বাহন মেট্রোরেল। এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত, নিরাপদ ও সময়মতো পৌঁছানোর জন্য অল্প সময়েই এটি রাজধানীবাসীর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। শুধু কর্মজীবী মানুষই নন, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে বেড়াতে আসা মানুষের কাছেও মেট্রোরেল এখন অন্যতম আকর্ষণ। অথচ দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক অবকাঠামোর স্টেশনগুলোর নিচে দিন দিন গড়ে উঠছে অস্থায়ী হাটবাজার।

রাজধানীর মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও কারওয়ান বাজারে অবস্থিত মেট্রো স্টেশন এলাকায় দেখা যায়, এসব স্টেশনের নিচে বসেছে মিনি বাজার। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত এসব বাজারে বেচাকেনা চলে। পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, শিশুদের খেলনা, ফলমূল, কাঁচাবাজার, ঝালমুড়ি, চটপটি-ফুচকা, জুস, পান-সিগারেট, খাবারের হোটেল, ব্যাগ, মশারি–নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যের পসরা বসে। বিভিন্ন ভ্যান ও অস্থায়ী দোকান স্টেশনের প্রবেশপথ দখল করে রাখায় যাত্রীদের চলাচলের পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ, নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে স্টেশনের সিঁড়ি, লিফটের প্রবেশমুখও আংশিকভাবে দখল হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিকশার দীর্ঘ সারি। ফলে প্রতিদিনই হকার, রিকশাচালক ও যাত্রীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা লেগেই থাকছে।

নিয়মিত মেট্রোরেল ব্যবহারকারী যাত্রীরা জানান, উদ্বোধনের পর মেট্রো স্টেশনগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা দেখে অনেকেরই মনে হতো যেন ইউরোপের কোনো আধুনিক নগরের অবকাঠামো। সাধারণ মানুষও স্টেশনগুলোকে নিজেদের সম্পদ মনে করে পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি কমে যাওয়ায় সেই পরিবেশ আর নেই। বর্তমানে অধিকাংশ স্টেশনের নিচেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে হকারদের অবস্থান চোখে পড়ে।

স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে মেট্রোরেল স্টেশন এলাকাতেও। তখন থেকে বিভিন্ন স্টেশনের নিচে হকারদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকলেও এখন নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান কিংবা কার্যকর নজরদারি না থাকায় দিন দিন বাড়ছে দখলদারত্ব।

তাদের মতে, গত কোরবানির ঈদে উত্তরা মেট্রো স্টেশনের নিচে পশুর হাট বসানো ঘটনাকে কেন্দ্র করে হকারদের মধ্যে ‘উৎসাহ’ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গরু-ছাগলের সারি স্টেশনের সিঁড়ি ও লিফটের কাছ পর্যন্ত চলে আসার ঘটনা ঘটে। জবাবদিহি ও বিচার না হওয়ায় সেই ঘটনার পর অন্য স্টেশনেও ছোট আকারের বাজার গড়ে উঠতে শুরু করেছে।

বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে গত রবিবার সচিবালয়ের সামনে। সেদিন প্রতীকীভাবে ভাতের হোটেল চালু করে প্রতিবাদ জানাতে যান এক নারী। ১০ টাকার ভাতের হোটেল চালুর দাবি জানান ‘হকার ও অটোরিকশা হটাও’ আন্দোলনের কর্মী সোহানী শিফা। তাকে পুলিশ আটক করে। এর আগে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি ঘোষণা দেন, মেট্রো স্টেশনগুলোর রাস্তা দখলের প্রতিবাদে সচিবালয়ের সামনে প্রতীকী ভাতের হোটেল চালু করবেন।

পুলিশ আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় আন্দোলনের কর্মী সোহানী শিফা চিৎকার করে বলতে থাকেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মেট্রো স্টেশন এখন হাটবাজার হয়ে যাচ্ছে, কেউ দেখছে না। পুরো রাজধানীতে হাঁটার জায়গা নেই, ফুটপাত ও সড়ক পুরোটাই হকারদের দখলে! ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে রাজধানী। তাও দেখার কেউ নেই। এসবের বিচার চেয়েছেন তিনি। যদিও আটকের পরে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান এই আন্দোলনকর্মী।

প্রতিদিন মেট্রোরেল চলাচল শুরু হওয়ার পরপরই হকাররা দোকান সাজাতে শুরু করেন। রাতে শেষ ট্রেন চলাচল শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের বেচাকেনা অব্যাহত থাকে। এসব দোকানের ক্রেতাদের একটি বড় অংশ অবশ্য মেট্রোর যাত্রী।

ভুক্তভোগী যাত্রীদের দাবি, নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান, স্থায়ী নজরদারি এবং স্টেশন এলাকার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় দেশের সবচেয়ে আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থার নিচে গড়ে ওঠা এই ‘মিনি হাটবাজার’ শুধু যাত্রী ভোগান্তিই বাড়াবে না, রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও প্রতীক হয়ে থাকবে।

প্রতিদিন মিরপুর-১০ নম্বরে অবস্থিত মেট্রো স্টেশন থেকে শাহবাগ পর্যন্ত যাতায়াত করেন গণমাধ্যমকর্মী ফারজানা লাবনী। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যানজটের এই রাজধানীতে আমাদের সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক ও নির্ভরযোগ্য বাহন এখন মেট্রোরেল। কিন্তু যথাযথ তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মেট্রো স্টেশনগুলোর নিচে এখন হাটবাজার গড়ে উঠছে। বিষয়টি দেখার যেন কেউ নেই।’

তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনের তাগিদে মেট্রোরেল ব্যবহার করতেই হয়, তাই বিকল্পও নেই। অথচ এখন স্টেশনের নিচে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে যে নারীদের পোশাক থেকে শুরু করে ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পণ্যই বিক্রি হচ্ছে। স্টেশনের প্রবেশপথ দখল করে এসব দোকান বসায় যাত্রীদের চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। আধুনিক একটি গণপরিবহনের সঙ্গে এমন দৃশ্য মোটেও মানানসই নয়।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. আরিফ হোসেন প্রতিদিন মেট্রোরেলে করে মতিঝিলে যান। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, অফিসে যাওয়ার সময় প্রতিদিনই মিরপুর-১০ স্টেশনে ভিড় ঠেলে চলতে হয়। দোকান আর রিকশার কারণে হাঁটার জায়গাই থাকে না। আধুনিক মেট্রো স্টেশনের নিচে এমন দৃশ্য সত্যিই হতাশাজনক।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, শুরুতে স্টেশনগুলো খুব পরিচ্ছন্ন ছিল। এখন মনে হয় যেন বাজারের মধ্য দিয়ে স্টেশনে ঢুকতে হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এটিও গুলিস্তানের মতো হয়ে যাবে।

পরিকল্পনাবিদদের মতে, মেট্রোরেল শুধু একটি গণপরিবহন নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো। স্টেশন এলাকা দখলমুক্ত ও নিরাপদ রাখা অত্যন্ত জরুরি। অনিয়ন্ত্রিত দোকান, ভ্যান ও জনসমাগম জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।

মেট্রো স্টেশনের নিচে হাটবাজার স্থাপনকে ন্যক্কারজনক বললেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, মেট্রোরেল একটি বিশেষায়িত নগর অবকাঠামো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেট্রো স্টেশনকে কেন্দ্র করে ১০০ থেকে ১৫০ মিটার এলাকা আলাদাভাবে পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় রাখা হয়, যাতে পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল, যানবাহনের সংযোগ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু ঢাকায় এ ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, গেল কোরবানির ঈদে মেট্রো স্টেশনের নিচে পশুর হাট বসার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা প্রমাণ করে ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ধীরে ধীরে এই এলাকা অন্য সড়ক ও ফুটপাতের মতোই অবৈধ দখলে চলে যেতে পারে। এতে শুধু যাত্রী ভোগান্তি নয়, মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ও সেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সমাধানের বিষয়ে এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, প্রতিটি মেট্রো স্টেশনের চারপাশের অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ মিটার এলাকাকে ‘নো বিজনেস জোন’ ঘোষণা করে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্টেশনকেন্দ্রিক একটি সমন্বিত মোবিলিটি প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে পথচারী চলাচল নির্বিঘ্ন থাকে এবং মেট্রোরেলের পরিবেশ শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নিরাপদ রাখা যায়।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড–ডিএমটিসিএলের পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এমন অবৈধ দোকানপাট ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড উচ্ছেদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। ৫ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়মিত এই অভিযান পরিচালনা করছেন। পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সহায়তায় আমরা স্থায়ীভাবে এই সমস্যার সমাধান করব।’

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১
১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭৩০৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়