
নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ২৪ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

শুরুটা হয়েছিল মিষ্টি কথায়। ফেসবুকে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন আর কম খরচে অস্ট্রেলিয়া নেওয়ার আশ্বাস। সঙ্গে অভিজাত অফিসে রাজকীয় আদর-আপ্যায়ন। সবমিলিয়ে বিশ্বাসের এক নিপুণ জাল। সেই মায়াজালে অন্ধ হয়ে পাসপোর্ট জমা দেন কয়েক শ মানুষ। ধাপে ধাপে করানো হয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বায়োমেট্রিক আর পুলিশ ক্লিয়ারেন্সও। বাকি ছিল শুধু বিমানে ওঠা। কিন্তু নির্ধারিত সময় এলেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত ভিসা; বরং বনানীর সেই অভিজাত অফিসে ঝুলতে দেখা যায় তালা। উধাও হয়ে যান এজেন্সির মালিক। সম্প্রতি এমন এক অভিনব ও সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। সূত্র- ঢাকা পোস্ট
বেশ কয়েক মাস ধরে বেকার সময় পার করছিলেন পাবনার ফারুক হোসেন। গত বছরের নভেম্বরের শেষদিকে ফেসবুকে ‘আলহামদুলিল্লাহ ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’-এর একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে তার। মাত্র ৪০-৪৫ হাজার টাকা খরচে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার লোভনীয় অফারটি দেখে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিজ্ঞাপনে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করা হলে, নিজেকে সিডনিপ্রবাসী পরিচয় দেওয়া মাহফুজ নামের এক ব্যক্তি তাকে রাজধানীর বনানীর অফিসে যেতে বলেন। কথামতো সেই অফিসে গিয়ে ফারুক দেখেন, বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরও অনেক মানুষের সমাগম হয়েছে। পরিবেশ দেখে তার মনে কিছুটা ভরসা জাগে।
‘অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে বড় অঙ্কের কোনো টাকা লাগবে না, শুধু সামান্য প্রসেসিং খরচ’— এভাবে ফারুককে আশ্বস্ত করেন প্রতিষ্ঠানের সিইও পরিচয় দেওয়া শামীম আহমেদ। চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝিতে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ফারুকের বিশ্বাস অর্জনের জন্য শামীম শত শত মানুষের ভিসা আবেদন ও পাসপোর্ট নম্বরও দেখান। তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেন ফারুক ও তার এক বন্ধু। নিয়মানুযায়ী প্রথমে পাঠানো হয় ‘আল-আসিল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড’-এ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর জন্য। এরপর গুলশানের ডেল্টা লাইফ টাওয়ারে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়ান বায়োমেট্রিক কালেকশন সেন্টারে গিয়ে বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করেন ফারুক। এই ধাপ শেষ হতেই থানা থেকে করানো হয় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স। একই সঙ্গে ব্যাংক স্টেটমেন্ট দেখানোর নাম করে নেওয়া হয় নগদ ১০ হাজার টাকা। চার মাস ধরে চলা এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এই বেকার যুবকের প্রায় লাখ টাকা খরচ হয়ে যায়।
এখন শুধু স্বপ্নের রাজ্য অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর অপেক্ষা। ফারুককে ভিসা সংগ্রহের জন্য ১৯ এপ্রিলের সময় দেওয়া হয়েছিল। নির্দিষ্ট তারিখে আলহামদুলিল্লাহ এজেন্সির অফিসে গেলে সিইও শামীম জানান, আরও কিছুটা সময় লাগবে। তবে, সময় পেরিয়ে গেলেও শামীম ফোন রিসিভ না করায় ফারুকের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। তিনি সরাসরি বনানীর অফিসে গিয়ে দেখেন দরজায় তালা ঝুলছে। প্রতারণার শিকার হয়েছেন বুঝতে পেরে এজেন্সির কাছে আটকে থাকা নিজের পাসপোর্টটি উদ্ধার করতে যান তিনি। কিন্তু সেখানে পাসপোর্ট ফেরত পাওয়ার জন্য আরেকটি ‘চক্রকে’ বাড়তি টাকা দিতে হয়।
শুধু ফারুকই নন; কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলেছে গণমাধ্যম। তাদের দাবি, এই এজেন্সিটি প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছিল। তবে, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কোনো খোঁজ না মেলায় পাসপোর্টের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
আলহামদুলিল্লাহ ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ই-ট্রেড লাইসেন্সের ঠিকানা ধরে বনানীর ১১ নম্বর রোডের ৭৬ নম্বর বাড়িতে যায় গণমাধ্যম। ভবনের চতুর্থ তলায় গিয়ে দেখা মেলে ‘কো-ডেস্ক’ নামের একটি যৌথ কর্মক্ষেত্রের (শেয়ার্ড অফিস)। তবে, সেখানে এজেন্সির কোনো সাইনবোর্ড ছিল না। কো-ডেস্কের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর নাম করে শত শত মানুষের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছেন আলহামদুলিল্লাহ এজেন্সির মালিক শামীমসহ অন্য সহযোগীরা। এরপর কাকলী-বনানীর মাঝামাঝি সৈনিক ক্লাব মোড়ে অবস্থিত ‘আল-আসিল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড’-এ গিয়ে সেটির গেটেও তালা ঝুলতে দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া মুঠোফোন নম্বরে বারবার কল দেওয়া হলেও কেউ সাড়া দেননি।
ভিসা আবেদনের সত্যতা যাচাই করতে অস্ট্রেলিয়া সরকারের অফিশিয়াল ‘ইমি অ্যাকাউন্ট’-এ (ImmiAccount) প্রবেশ করে গণমাধ্যম। কয়েকজন ভুক্তভোগীর দেওয়া নথিপত্রের ‘ভিসা লজমেন্ট নম্বর’ ও ‘ট্রানজেকশন রেফারেন্স নম্বর’ দিয়ে মূল ডেটাবেজে অনুসন্ধান চালাতেই বেরিয়ে আসে আসল জালিয়াতি। অনুসন্ধানে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের যে কাগজ দিয়ে বায়োমেট্রিকের জন্য পাঠানো হয়েছিল, সেখানে লেখা ছিল অস্ট্রেলিয়ার আকর্ষণীয় কাজের ভিসা ‘স্কিলস ইন ডিমান্ড’ (সাবক্লাস ৪৮২)। অথচ অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মূল সার্ভারে আবেদন করা হয়েছিল সম্পূর্ণ ফ্রি ‘ট্রানজিট ভিসার’ (সাবক্লাস ৭৭১) জন্য। মূলত অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথে সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টার ট্রানজিটের জন্য এই ভিসা দেয় দেশটির সরকার, যার জন্য কোনো সরকারি ফি লাগে না। শামীমের চক্র এই ফ্রি ভিসাকেই পুঁজি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
অভিনব এই জালিয়াতির কৌশলটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চক্রটি সুকৌশলে ইমি অ্যাকাউন্টে ভুক্তভোগীদের নাম ও পাসপোর্ট নম্বর ব্যবহার করে একটি ফ্রি ট্রানজিট ভিসার আবেদন করত। এরপর সার্ভার থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হওয়া আসল বায়োমেট্রিক ‘রিকুয়েস্ট লেটার’ ডাউনলোড করা হতো। ডাউনলোডের পর কম্পিউটারের এডিটিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে ‘ট্রানজিট ভিসা (সাবক্লাস ৭৭১)’ লেখাটি মুছে সেখানে কাজের ভিসা বা ‘স্কিলস ইন ডিমান্ড (সাবক্লাস ৪৮২)’ বসিয়ে দেওয়া হতো। যেহেতু চিঠিতে থাকা বারকোড, অ্যাপ্লিকেশন আইডি এবং রেফারেন্স নম্বর আসল ছিল, তাই গুলশানের ভিএফএস গ্লোবাল সেন্টারের অফিশিয়াল স্ক্যানারও সেটিকে বৈধ হিসেবে শনাক্ত করে গ্রাহকদের আঙুলের ছাপ ও চোখের স্ক্যান সম্পন্ন করত। ভিএফএস-এর এই বৈধ প্রক্রিয়া আর সেখান থেকে পাওয়া রসিদকে হাতিয়ার বানিয়েই গ্রাহকদের মনে শতভাগ বিশ্বাস স্থাপন করেছিল শামীমের এই চক্র।
ইমি অ্যাকাউন্ট ঘেঁটে আরও দেখা যায়, অস্ট্রেলীয় ইমিগ্রেশন বিভাগ থেকে আসা কোনো সতর্কবার্তা বা আসল নোটিশ যেন আবেদনকারীর হাতে না পৌঁছায়, সেজন্য নথিপত্রে একটি ‘ভুয়া’ ইমেইল ব্যবহার করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পোর্টালে আবেদনকারীদের কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা বা কাজের অভিজ্ঞতার সনদও আপলোড করা হয়নি। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের নিয়মানুযায়ী, যেকোনো সাধারণ ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা এজেন্সির নিজস্ব মেডিকেল থেকে করা স্বাস্থ্য পরীক্ষা গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠানকে প্যানেল ফিজিশিয়ান হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ইমিগ্রেশন আইনগত স্বীকৃতি দিয়েছে। অনুমোদিত কেন্দ্রগুলো হলো— গুলশানের ওয়াহাব মেডিকেল, বারিধারার গ্রিন ক্রিসেন্ট হেলথ সার্ভিসেস, বারিধারার মেডিকেল অ্যান্ড রেডিওলজি ক্লিনিক এবং গুলশান-১-এর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাইগ্রেশন হেলথ অ্যাসেসমেন্ট ক্লিনিক। ইমিগ্রেশন পোর্টাল থেকে স্বয়ংক্রিয় নোটিশ ছাড়া এই চার কেন্দ্রও কোনো আবেদনকারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করতে পারে না।
ই-ট্রেড লাইসেন্স অনুযায়ী শামীমের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার উত্তর তল্লায়। তার বাবার নাম মো. সফিউল্লা। লাইসেন্স ইস্যুর তারিখ চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি এবং মেয়াদ ছিল ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে গুলশানের রিক্রুটিং এজেন্সিতে কর্মরত এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের কোনো বৈধ রিক্রুটিং লাইসেন্সই ছিল না।
ভুক্তভোগী ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে প্রথমে মাহফুজ নামের একজনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলি। তিনি সিডনিতে আছেন জানিয়ে আমাকে বনানীর অফিসে পাঠান। সেখানে শামীম আমাদের চার মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর আশ্বাস দেন। টাকা-পয়সা আগে লাগবে না জানিয়ে বলেন, ওই দেশে যাওয়ার পর অভিভাবকের মাধ্যমে পরিশোধ করলেই হবে। বড় বড় কোম্পানি, ওয়্যারহাউজ, ফুড প্যাকেজিং ও কৃষিকাজে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। শুধু মেডিকেল টেস্ট, বায়োমেট্রিক ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের প্রাথমিক খরচটুকু আমাদের দিতে বলা হয়। তারা আমাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশে অফিসে নানাভাবে আপ্যায়ন করত। তাদের কথা বিশ্বাস করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলাম। শামীম নিজেই আমাকে বলেছিল, আমার মতো প্রায় ৭৫০-৮০০ মানুষ এখানে পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিন-সাড়ে তিন মাস পর খোঁজ নিতে গেলে শুধু আশ্বাস দেওয়া হতো। মে মাসের ৬-৭ তারিখে কো-ডেস্কের রায়হান নামের একজনের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি জানান, শামীমের অফিসে তালা এবং তারা কয়েক দিন ধরে আসছেন না। এ কথা শুনে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। বহু কষ্টে টাকাগুলো জোগাড় করেছিলাম। চিন্তায় কয়েক দিন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে অফিসে গিয়ে সত্যি সত্যিই তালা ঝুলতে দেখি।’
অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার স্বপ্নে নিজের বাবার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সাকিবুল হাসান। সাকিবুল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বেকার ছিলাম। পরে বাবা একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে দেন, যা দিয়ে আমাদের সংসার চলত। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে বনানীর অফিসে যাওয়ার পর সিইও শামীম মিষ্টি কথায় আমার মন জয় করে নেন। শামীম আমাকে বলেছিলেন, ‘সাকিব ভাই, আমি একজন-দুজনের ফাইল নিচ্ছি না, ৮০০ ফাইল নিয়েছি। এত মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আমি কি টাকা নিয়ে কবরে যাব? কাফনের কাপড়ের কি পকেট আছে?’ তার এই কথায় বিশ্বাস করে মা-বাবার বাধা সত্ত্বেও পাসপোর্ট জমা দিই। এরপর ব্যাংক স্টেটমেন্ট, মেডিকেল ও ভিএফএস করতে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতারিত হওয়ার পর পরিবারের সবাই আমার ওপর বিরক্ত। নিজের ব্যবসাটিও হারিয়েছি, অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার স্বপ্নও শেষ। মনের দিক থেকে একেবারে ভেঙে পড়েছি। শামীম মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা করেছে।’
সাকিবুল আরও জানান, তারা সাত শতাধিক পাসপোর্ট জমা নিয়েছিল। সবাই প্রতারিত হয়েছেন। এপ্রিলের ১৮ তারিখ থেকে অফিস বন্ধ হওয়ার পর তারা চার বন্ধু মিলে রায়হান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে জনপ্রতি আড়াই হাজার টাকা দিয়ে নিজেদের পাসপোর্ট ফেরত এনেছেন। রায়হানও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন বলে তার ধারণা।
গণমাধ্যমের হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়ার একটি এজেন্সির মাধ্যমে এই চক্রের কাছে ৯২টি পাসপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের একজন ৫০টি, কেরানীগঞ্জের একজন ৩৫টি এবং নোয়াখালীর এক স্কুলশিক্ষিকা তার আত্মীয়স্বজনদের অন্তত ২০টি পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, বর্তমানে শামীম বা তার চক্রের কারও সঙ্গে যোগাযোগের কোনো উপায় নেই। এই চক্রে সাজিন, নাসিমা, সুকন্যা ও ফারহানসহ আরও কয়েকজন জড়িত ছিলেন, যাদের সবার ফোন নম্বর বন্ধ।
এর মধ্যে সাজিনের সঙ্গে কথা হয় এক ভুক্তভোগীর। পাসপোর্টসহ জমা দেওয়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কথা তাকে জিজ্ঞেস করলে ‘কো-ডেস্কের লোকজন জব্দ করে রেখেছেন’ বলে জানান এই এজেন্ট। কো-ডেস্কের রায়হানই এখন টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট দিচ্ছেন ভুক্তভোগীদের। তিনি পাসপোর্ট ফেরত দিতে ২৫০০-৩০০০ টাকা করে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
২১ মে সন্ধ্যায় বনানীর কো-ডেস্ক অফিসে ভুক্তভোগী সেজে যান এই প্রতিবেদক। সেখানে কথা হয় প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর ও সিইও মো. বোরহান উদ্দিনসহ তিন কর্মকর্তার সঙ্গে। আলহামদুলিল্লাহ এজেন্সির নাম শুনতেই তারা বলেন, ‘পাসপোর্ট জমা না দিয়ে থাকলে আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়েছেন। এই এজেন্সিটি ভুয়া। শত শত মানুষের চার-পাঁচ কোটি টাকা নিয়ে শামীম পালিয়েছে। আমরা অনেকগুলো পাসপোর্ট বনানী থানায় জমা দিয়ে এসেছি।’
মুঠোফোনে বোরহান উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের এটি একটি শেয়ার্ড অফিস (যৌথ কর্মক্ষেত্র)। শামীম স্পেস ভাড়া নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ভাড়া বাকি রেখে ১৮ এপ্রিল থেকে তিনি উধাও। আমরা নোটিশ পাঠিয়ে কোনো জবাব না পেয়ে বনানী থানায় একটি লিখিত অভিযোগ করেছি।’ রায়হান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রায়হান কো-ডেস্কের কেউ নন, তিনিও একজন ভুক্তভোগী। আলহামদুলিল্লাহ এজেন্সিতে তিনি কিছু পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন।’ পাসপোর্ট ফেরত দিতে তিনি কোনো টাকা নিচ্ছেন কি না, জানতে চাইল বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘এটি আমার জানা নেই।’
কো-ডেস্কের কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া রায়হান গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, ‘এজেন্সির কার্যকলাপে সন্দেহ হওয়ায় আমরা চুক্তি পরিবর্তন করেছিলাম। কিন্তু দুই মাসের ভাড়া না দিয়েই তারা পালিয়েছে।’ গ্রাহকের পাসপোর্ট ফেরত দিতে টাকা নিচ্ছেন— এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে অনেকের পাসপোর্ট ছিল। আমরা সেগুলো বনানী থানায় জমা দিয়েছি। কোনো ধরনের টাকা-পয়সা নেওয়া হয়নি। আলহামদুলিল্লাহ এজেন্সির লোকজনই হয়তো আমার নামে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন।’ এই এজেন্সির সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে আমি কেন পালাইনি; প্রশ্ন রাখেন তিনি।
তবে, কো-ডেস্ক বা রায়হানের এই দাবির সত্যতা মেলেনি পুলিশি সূত্রে। বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মেহেদী হাসান গণমাধ্যমকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘এমন কোনো এজেন্সির নামে আমাদের থানায় কোনো অভিযোগ আসেনি এবং কেউ কোনো পাসপোর্টও জমা দিয়ে যায়নি।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আলহামদুলিল্লাহ ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের সিইও শামীম আহমেদের মুঠোফোনে দুদিন ধরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। একপর্যায়ে কল কেটে দিয়ে ফোনটি বন্ধ করে দেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি জানান, শামীম রাত ১২টার পর হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
অভিজাত এলাকায় অফিস দেখে ভুক্তভোগীরা বুঝতেই পারেননি এত বড় প্রতারণার শিকার হবেন। টাকা হারানোর কষ্টের চেয়েও এখন তাদের বড় চিন্তা আটকে থাকা পাঁচ শতাধিক পাসপোর্ট নিয়ে। ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, এই পাসপোর্ট ও ব্যক্তিগত তথ্য অন্য কোনো অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে তাদের বৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
