
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ০১ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ঈদুল আজহার আগে কোরবানির পশু কেনাকাটার জন্য নগরের বিভিন্ন স্থানে ১৬টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা দিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এসব হাট হাট ইজারায় কার্যাদেশে ইজারাদারকে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয় ডিএনসিসি। ওই নির্দেশনার একটিতে বলা হয়েছিল, ঈদের পরদিন শুক্রবার দুপুর ১২টার পর হাটে বাঁশের খুঁটি বা অস্থায়ী অবকাঠামো থাকলে ডিএনসিসি নিজ তত্ত্বাবধায়নে অপসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
এ অপসারণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম পরিচালনায় যাবতীয় খরচ ইজারাদারের জামানত বাবদ রক্ষিত অর্থ থেকে সমন্বয় করা হবে বলে জানায় সিটি করপোরেশন।
অথচ, কোরবানির পশুর হাট ইজারায় এমন নির্দেশনা খোদ ডিএনসিসিই মানেনি। ঈদের পাঁচদিন পরও উত্তরা দিয়াবাড়ি পশুর হাট পরিষ্কার করা হয়নি। হাটে কোরবানির পশুর বর্জ্য স্তূপ হয়ে পড়ে আছে এখনও। হাটের ভেতর বৃষ্টির পানি জমে আছে। এ পানি পচে মশার লার্ভা জন্মাচ্ছে। হাট থেকে বাঁশের খুঁটি বা অস্থায়ী অবকাঠামোও অপসারণ করেনি ডিএনসিসি। ফলে, দুর্গন্ধে বউবাজার এলাকায় হাঁটা দায় হয়ে পড়েছে। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ।
ঈদে ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত ছিল দিয়াবাড়ি পশুর হাট। ঈদের আগে ডিএনসিসির ইজারা দেওয়া হাটগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ দর উঠেছিল এ হাটে। এই হাটে সর্বোচ্চ ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা দর পেয়েছে ডিএনসিসি। হাটের ইজারা পেয়েছিলেন এসএফ করপোরেশনের মালিক ও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ হোসেন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি ডিএনসিসি নির্ধারিত সময়ের আগেই দিয়াবাড়িতে হাট বসিয়েছিলেন। এছাড়া, উত্তরা সেন্টার মেট্রোরেল স্টেশনের নিচেও হাট বসিয়েছিলেন এই স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা। ফলে মেট্রো স্টেশনের নিচের পরিবেশ মারাত্মক নোংরা হয়। যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে যাত্রীদেরও।
উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন বউবাজার এলাকায় বসেছিল কোরবানির পশুর হাট। তবে এ হাট বউবাজার এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। আশপাশের প্রায় এক হাজার একর জমি, সড়কে তা ছড়িয়ে ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঈদের অন্তত ১৫ দিন আগে দিয়াবাড়িতে পশু বেচাকেনা শুরু করেছিলেন শেখ ফরিদ হোসেন। ঈদের পাঁচ দিন আগে হাটের সীমানা চলে যায় মেট্রোলের নিচ পর্যন্ত। এমনকি মেট্রোরেল স্টেশনে ওঠার সিঁড়ি, লিফটের সামনেও কোরবানির পশু বেচাবিক্রি হয়েছে। ফলে পশুর বর্জ্য যাত্রীদের জুতার সঙ্গে স্টেশনের ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে।
এছাড়া, হাটের কারণে স্টেশনের নিচে থাকা সব গাছ ও ঘাস মরে গেছে। কিন্তু তখন শেখ ফরিদ হোসেনের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি ডিএনসিসি। আবার ঈদের পাঁচদিন চলে গেলেও অপসারণ করা হয়নি দিয়াবাড়ি হাটের বর্জ্যও।
রোববার (৩১ মে) বিকেলে সরেজমিনে দিয়াবাড়ি হাট ঘুরে দেখা যায়, বউবাজার ঘিরে চারপাশে হাজারো বাঁশের খুঁটি পোতা রয়েছে। এসব বাঁশের খুঁটির ওপর আবার শামিয়ানা টাঙানো। অনেক জায়গায় বাঁশ, শামিয়ানা ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে। হাটের ভেতর যে স্থানে সারিবদ্ধভাবে পশু (গরু) রাখা হতো, সেখানে জমে আছে ময়লা পানি। পানির ওপর মশা, মাছি উড়ছে। বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তেও পানি জমে আছে। যত্রতত্র পশুর বর্জ্য স্তুপ করে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কিন্তু কোথাও বাঁশ, শামিয়ানা খুলতে সিটি করপোরেশনের লোকজন দেখা যায়নি।
তবে, মেট্রোরেল স্টেশনের নিচসহ আশপাশের প্রধান সড়কগুলো ডিএনসিসিকে পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। এসব রাস্তায় এখনো পশুর গোবরসহ ধুলাবালি স্তুপ হয়ে আছে। ডিএনসিসির কর্মীরা রোডসুইপার যন্ত্র দিয়ে তা পরিস্কার করছেন। আবার স্টেশনের নিচে যেসব স্থানে গাছ ও ঘাস মরে গিয়েছিল, সেখানে নতুন করে ডিএনসিসিকে গাছ লাগাতে দেখা গেছে।
অতিষ্ঠ স্থানীয়রা
মেট্রোরেলের উত্তরা সেন্টার স্টেশনের পূর্ব পাশের একটি ৬ তলা ভবনে ভাড়া থাকেন জাহাঙ্গীর আলম। রোববার (৩১ মে) বিকেলে চার বছরের ছেলেকে নিয়ে তিনি বাসার নিচে ঘুরতে বের হোন। আলাপকালে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঈদের অন্তত ১৫ দিন আগে দিয়াবাড়িতে পশুর হাট বসে যায়। হাটের চারপাশে অর্ধশত মাইক লাগানো হয়। ঈদের আগে পরিস্থিতি এমন হয়েছে, মাইকের শব্দে বাসায় কোনোভাবেই থাকা যাচ্ছিল না। আবার বাসার প্রায় সামনেও পশুর হাটের সীমানা চলে আসছিল। ফলে ঈদের সাত দিন আগে গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে চলে যাই।
তিনি বলেন, এখন ঈদের পাঁচদিন চলে গেছে। কিন্তু হাটসহ আশপাশে শতশত টন পশুর বর্জ্য স্তুপ হয়ে আছে। বর্জ্য ছড়িয়ে ড্রেন-নালায় পড়ছে। এতে নোংরা পানিতে মশার উপদ্রব আরও কয়েকগুন বেড়েছে।
বেড়িবাঁধ এলাকার বাস থেকে রিকশায় উত্তরা সেন্ট্রাল স্টেশন সংলগ্ন লেকপাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন আরিফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী রাবেয়া সুলতানা। হাটের কারণে দিয়াবাড়িতে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা জানতে চাইলে আরিফুল ইসলাম বলেন, হাট থেকে কোরবানির পশু কিনতে সবাই পছন্দ করে। কিন্তু এবার হাটে সবচেয়ে বেশি অব্যবস্থাপনা হয়েছে।
উত্তরার এই বাসিন্দা আরও বলেন, ঈদের আগে দিয়াবাড়ি অঞ্চলের প্রায় সব রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ হেঁটেও চলাচল করতে পারতো না। এখন ঈদে শেষ হলেও হাটের অস্থায়ী অবকাঠামো অপসারণ করা হয়নি। দুর্গন্ধে সড়ক দিয়েও চলাচল করা যায় না। পশুর বর্জ্য দীর্ঘ সময় খোলা স্থানে পড়ে থাকলে তা শুধু দুর্গন্ধই সৃষ্টি করে না, জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এসব বর্জ্য পানির সঙ্গে মিশে আশপাশের পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা বাড়ায়। মাছি ও অন্যান্য রোগবাহী পোকামাকড়ের বিস্তার ঘটার সম্ভাবনা তো থাকেই।
ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ সূত্র জানায়, ঈদের আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া নিয়ে দিয়াবাড়ির হাটে হাজির হয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। তখন এ হাটের সীমানা মেট্রোরেল স্টেশন পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। এ কারণে ওই হাট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। মেট্রোরেলের নিচ দিয়েও মানুষ চলাচল করতে পারছিল না। পরে পশুর হাটে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হাট পরিদর্শন করেন ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তখন তিনি মেট্রোরেলের নিচে হাট বসানোর কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ইজারাদারকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করার নির্দেশ দেন।
গত ৩০ মে ডিএনসিসির গুলশান কার্যালয়ে আয়োজিত কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রশাসক। তখন তিনি দাবি করেন, কোরবানির বর্জ্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছে ডিএনসিসি। তার এ বক্তব্যের পাঁচদিন পরও কেন দিয়াবাড়ি হাটে পশুবর্জ্য অপসারণ করা হয়নি, তার সঠিক জবাব দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
‘শিগগির’ শুরু হবে বর্জ্য অপসারণ, বলছে ডিএনসিসি
এ বিষয়ে জানতে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীরের মুঠোফোনে একাধিকার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থপনা কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের পরদিনের মধ্যে হাটের বাঁশ, খুঁটি অপসারণের দায়িত্ব ইজারাদারের। অনেক হাটের ইজারাদার তা যথাসময়ে অপসারণ করেছেন। তবে দিয়াবাড়ি হাট অনেক বড়। সেখান থেকে এখনো বাঁশ, খুঁটি অপসারণ করা হয়নি
ডিএনসিসির এই কর্মকর্তা বলেন, দিয়াবাড়ির হাটের বর্জ্য অপসারণের আগে মেট্রো স্টেশনসহ আশপাশের সড়ক থেকে সব বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। এখন তারা যদি তা অপসারণ না করে বা ডিএসসিসি নিজে অপসারণ করলে ইজারাদারের জামানত থেকে টাকা কেটে রাখা হবে। শিগগির হাটের ভেতরের বর্জ্য, বাঁশ ও খুঁটি অপসারণ কার্যক্রম শুরু হবে।
তবে, এরইমধ্যে হাটের বর্জ্য ও বাঁশ-খুঁটি অপসারণ শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইজারাদার এসএফ করপোরেশনের মালিক ও ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আজকের মধ্যেই হাটের খুঁটি, বাঁশ অপসারণ শেষ হবে।
