
নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের কৃষি, মৎস্য ও সড়ক যোগাযোগ এবং ঘরবাড়ি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের কৃষি, মৎস্য ও সড়ক যোগাযোগ এবং ঘরবাড়ি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের কৃষি, মৎস্য ও সড়ক যোগাযোগ এবং ঘরবাড়ি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির তোড়ে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ক্ষেতের ফসল, আউশ ধান ও আমনের বীজতলা। ভেসে গেছে হাজার হাজার পুকুর-দিঘী ও মাছের ঘের। একইসঙ্গে বন্যার পানিতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে আঞ্চলিক ও মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ। এতে একদিকে কৃষক ও মৎস্যচাষিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, অন্যদিকে ভেঙে পড়া সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
৯ হাজার ৪৩ হেক্টর আউশ চাষাবাদের ক্ষতি
বন্যায় চট্টগ্রামে কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাঠে থাকা আউশ ধান, আমন বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন সবজি, পানের বরজ, আদা-হলুদ ও উদ্যান ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি আউশ আবাদ আক্রান্ত হয়েছে। ৩০ হাজার ২২ দশমিক ৫ হেক্টর আউশ আবাদের মধ্যে ৯ হাজার ৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ হাজার ৭২১ দশমিক ৬৭ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। ১৭ হাজার ৮২৮ দশমিক ৬৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর আক্রান্ত হয়েছে। এতে প্রায় এক হাজার ২০০ কৃষকের ছয় কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।
এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের কাজ এখনও চলমান। অনেক এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বর্তমানে যে হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে, তা প্রাথমিক। সব তথ্য সংগ্রহ শেষে ক্ষয়ক্ষতির একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে। সেখানে এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।’
মৎস্যখাতে প্রাথমিক ক্ষতি ৯১ কোটি ৪১ লাখ
বন্যায় চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলায় ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর-দিঘী এবং ৩২০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাথমিক জরিপে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উঠে এসেছে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মৎস্য কর্মকর্তারা কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, পটিয়া উপজেলায় বন্যায় ১৫টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর ও দিঘী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে রাউজান উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৯০টি, চন্দনাইশে ১০টি ইউনিয়নের ৩৮৩টি, লোহাগাড়ায় ৯টি ইউনিয়নে ১ হাজার ৬২০টি, মীরসরাইয়ে ৩টি ইউনিয়নে ৯৭টি, সীতাকুণ্ডের তিনটি ইউনিয়নে ১০টি, সন্দ্বীপে ১৩টি ইউনিয়নে ৪১২টি, বোয়ালখালীতে নয়টি ইউনিয়নে ৭৫৬টি, আনোয়ারায় ১১টি ইউনিয়নে ১ হাজার ১০০টি, বাঁশখালীতে ১৪টি ইউনিয়নে ২ হাজার ৫০০টি, ফটিকছড়িতে ১৮টি ইউনিয়নে ৫৩৩টি, হাটহাজারীতে আটটি ইউনিয়নে ১৭০টি, কর্ণফুলীতে পাঁচটি ইউনিয়নে ৫৫৭টি এবং রাঙ্গুনিয়ায় ১২টি ইউনিয়নে ২৭০টি পুকুর-দিঘীর মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, ‘বন্যায় ১৫টি উপজেলায় মৎস্যখাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে ৩ হাজার ২১১ দশমিক ৯২ হেক্টর পুকুর-দিঘী ও ৯০০ হেক্টর ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মোট ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার ক্ষতি হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।’
রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি
বন্যায় চট্টগ্রামে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়া, সড়ক ধসে পড়া, পিচ ও কার্পেটিং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, সড়কের ওপর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে নষ্ট হয়ে গেছ। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষজন।
সওজ সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের অধীনে মোট ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ৫০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৬ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৪ দশমিক ৭১ কিলোমিটার জেলা মহাসড়ক রয়েছে। এসব সড়ক মেরামতে স্বল্পমেয়াদে প্রায় ৮ কোটি ৩০ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদে ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে।
অপরদিকে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগে আওতাধীন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার। এখানে জাতীয় মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৭ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার ও জেলা মহাসড়ক ৩৭ দশমিক ৮২ কিলোমিটার বিভিন্ন অংশ বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিভাগের জন্য স্বল্পমেয়াদি সংস্কার ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ কোটি ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের চট্টগ্রাম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুল হালিম বলেন, ‘বন্যায় চট্টগ্রামের বেশ কিছু সড়ক-ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দিন যতই যাচ্ছে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। সড়কের যেসব কাজ জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন সেগুলো দ্রুত সংস্কার করা হবে।’ সৌজন্যে বাংলা ট্রিবিউন
