
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ২২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

দোহাজারী–কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের জন্য ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের তিনটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল প্রায় ১১৯ একর বনভূমি। প্রকল্পটির কাজ শেষ হয়েছে, ট্রেনও চলছে প্রায় তিন বছর ধরে। কিন্তু বনভূমির ক্ষতিপূরণের সাড়ে ৯ কোটি টাকা এখনো পায়নি বন বিভাগ। গত পাঁচ বছরে সাতটি চিঠি দিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি বলে অভিযোগ তাদের। সূত্র- প্রথম আলো
রেলওয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অধিগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তাঁরা ২০১৭ সালেই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কাছে পরিশোধ করেছেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে, এক দশক ধরে বন বিভাগের প্রাপ্য অর্থ আটকে আছে কোথায়?
রেললাইন চালু, ক্ষতিপূরণ এখনো বকেয়া
দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ উদ্বোধন করা হয় ২০২৩ সালে। এই রেললাইনের ২৭ কিলোমিটার গেছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয় চট্টগ্রামের চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, কক্সবাজারের ফাসিয়াখালী বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের মোট ১১৮ দশমিক ৮৩ একর বনভূমি।
বন বিভাগ বলছে, এই রেললাইনের কারণে প্রকৃতি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক জোট কর্তৃক ঘোষিত মহাবিপন্ন (বিলুপ্তির পথে থাকা বন্য প্রাণী) হাতির চলাচলের ১৬টি পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। কাটা পড়ে ২৬টি পাহাড় ও প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার ছোট–বড় গাছ।
চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, রেললাইন নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির মধ্যে ৪২ দশমিক ০২ একর চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যের অংশ এবং ৭৬ দশমিক ৮১ একর কক্সবাজারের অংশ।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অংশে বনভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বাবদ নির্ধারণ করা হয় ৮ কোটি ২৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং অবকাঠামোগত ক্ষতির জন্য আরও ১ কোটি ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ কোটি ৬৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকায়। এই অর্থ তাঁরা এখনো পাননি।
সাত চিঠির পরও মেলেনি সাড়া
২০১৭ সালে দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্পের কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই রেললাইনের জন্য সার্বিক জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনকে ৭০০ কোটি টাকা এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসনকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করে দেয় রেলওয়ে। বন বিভাগের পাশাপাশি অন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণও এই অর্থের মধ্যে রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ এখনো পাননি জানিয়ে আবু নাছের ইয়াছিন সম্প্রতি বলেন, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট সাতবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে কোনো ধরনের সাড়া পাওয়া যায়নি।
এই বন কর্মকর্তা বলেন, গাছের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২০১৭ সালে ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। বনভূমি ও অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৯ কোটি টাকা ৬৫ লাখ টাকা এই হিসাবের বাইরে।
এদিকে এই প্রকল্পে অধিগ্রহণ হওয়া কক্সবাজার অংশের বনভূমির ক্ষতিপূরণ বন বিভাগ পেয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন।
জেলা প্রশাসনের কাছে নেই স্পষ্ট ব্যাখ্যা
স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন–২০১৭ অনুযায়ী, কোনো সরকারি সংস্থার উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমি প্রয়োজন হলে জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কমিটির মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়। এরপর প্রত্যাশী সংস্থা (যে সংস্থার ভূমির প্রয়োজন) জেলা প্রশাসনের কাছে অর্থ জমা দেয় এবং জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ভূমির মালিক বা সংস্থাকে ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করে।
গত ২৫ মে এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সংশ্লিষ্ট নথি দেখার জন্য সময় চান। নথি পাওয়ার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর তিনি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো এক বার্তায় জানান, ঈদের পর বিষয়টি জানাতে পারবেন।
এরপর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. কামরুজ্জামান বলেন, তিনি মাত্র ছয় মাস আগে এ শাখায় যোগ দিয়েছেন। জানুয়ারিতে দেওয়া বন বিভাগের চিঠিটি পেয়েছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে চিঠির একটি কপি চান। চিঠির কপি পাঠানো হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কোনো ধরনের জটিলতা না থাকলে এটি আটকে থাকার কথা নয়।
তবে কী ধরনের জটিলতায় অর্থ ছাড় হয়নি, সে বিষয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বলেননি। নথিপত্র পর্যালোচনা করে ঈদের পর জানাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঈদুল আজহার পর গতকাল সোমবার যোগাযোগ করা হলে কামরুজ্জামান বলেন, ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা আছে। জটিলতাটি কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা সার্ভেয়ার (আমিন) জানেন। তবে সার্ভেয়ার এখন ছুটিতে আছেন বলে জানান তিনি।
