
নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের কাছে বিধ্বস্ত হওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জারি করা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নির্দেশনার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় শত শত সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বহাল রয়েছে।
রাজউকের নথি, বিভিন্ন সভার কার্যবিবরণী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং নগর পরিকল্পনাবিদ, বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পর এক বছরে একাধিক আন্তঃসংস্থার বৈঠক, সুপারিশ ও আলোচনা হলেও বিমানবন্দরসংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি।
রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম রিজু এই প্রতিবেদককে বলেন, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চিহ্নিত ৬৩০টি সমস্যাযুক্ত ভবনের তালিকা রয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনি প্রক্রিয়া ও উচ্ছেদ কার্যক্রম এখনও অসম্পূর্ণ।
রাজউক-বেবিচকের মতবিরোধে বিলম্ব
রাজউক চেয়ারম্যান জানান, ভবনের উচ্চতা-সংক্রান্ত তথ্য ও কারিগরি বিষয়ে রাজউক এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে বাস্তবায়ন কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছে।
তার ভাষ্য, যৌথ জরিপের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিনিধি না পাওয়ায় মাঠপর্যায়ে ভবনের উচ্চতা পরিমাপের কাজই শুরু করা যায়নি। এছাড়া মেট্রোরেল ডিপোর চারপাশে নির্ধারিত ৩০০ ফুট নিরাপত্তা বাফার জোনের ভেতরের ভবন অপসারণের পরিকল্পনাও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
উচ্ছেদে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ
দুর্ঘটনার পর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বক্তব্যে রিয়াজুল ইসলাম রিজু স্বীকার করেন, একাধিক উচ্ছেদ অভিযান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কিছু উচ্ছেদ কার্যক্রম বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা একাধিক প্রশাসনিক ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, জ্যেষ্ঠ এক প্রতিমন্ত্রী এবং একটি বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর অংশগ্রহণে কয়েক দফা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলেও কোনও ক্ষেত্রেই স্থায়ী সমাধান হয়নি।
যদিও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে রাজনৈতিক চাপের বিষয়টি রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্যে উঠে আসায় অভিযোগটি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
দুর্ঘটনার পর দেওয়া হয়েছিল সাত নির্দেশনা
রাজউকের প্রধান প্রকৌশলীর দফতরের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের দুর্ঘটনার পর জরুরি ভিত্তিতে সাতটি নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়। এগুলো হলো— বিমান বিধ্বস্ত হওয়া ভবন অপসারণ; মেট্রোরেলের নিরাপত্তা বাফার জোনে থাকা ইউ-আকৃতির টিনশেড ও তিন তলা ইংলিশ ভার্সন একাডেমিক ভবন অপসারণ; অনুমোদিত ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন; অননুমোদিত হোস্টেল কার্যক্রম বন্ধ; বিএনবিসি-২০২০ অনুযায়ী অগ্নি ও কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; উত্তরার ৫, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টরে বেবিচকের উচ্চতা সীমা অতিক্রমকারী ভবন শনাক্ত করা; বিমান ওঠানামার করিডোরে উচ্চঘনত্বের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে এয়ার ফানেল জোন নীতিমালা প্রণয়ন।
এ ছাড়া ২০০৭ সালের এক প্রজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ করে রাজউক জানায়, মেট্রোরেল ডিপোর পাশের ৩০০ ফুট এলাকাকে সবুজ বাফার জোন হিসেবে সংরক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে। ফলে ওই সীমার মধ্যে থাকা স্থাপনা অপসারণ আইনগত বাধ্যবাধকতা।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত ভবনের কিছু অংশ অপসারণ এবং কিছু জরুরি অবকাঠামো যুক্ত করা হলেও বহু ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা এখনও বহাল রয়েছে।
রাজউকের ভেতর থেকেই ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা’র স্বীকারোক্তি
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রাজউকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দায় এড়ানোর কোনও সুযোগ রাজউকের নেই। মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনার পর সাত-আটটি বৈঠক হয়েছে। কিন্তু আমরা কার্যকর কোনও অপারেশনাল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি।
তার মতে, অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় সমস্যাকে ফলহীনতার অজুহাত হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। রাজউকের পরিকল্পনা পরিচালক আশরাফুল ইসলামও স্বীকার করেন, বেশিরভাগ উদ্যোগ এখনও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। তিনি বলেন, সব বিষয়েই আমরা কাজ করছি। তবে অনেক উদ্যোগ এখনও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
‘দায় চাপিয়ে দায়িত্ব এড়ানো যায় না’
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মতে, দুর্বল বাস্তবায়নের দায় কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এড়িয়ে যেতে পারে না।
ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য বলেন, এত বড় একটি দুর্ঘটনার পর এক প্রতিষ্ঠান আরেক প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব এড়াতে পারে না। মানুষ জানতে চায়, শুরুতেই এসব ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সুযোগ কেন দেওয়া হয়েছিল এবং কারা এর জন্য দায়ী।
তাদের অভিযোগ, গত এক বছরে একের পর এক কমিটি ও বৈঠক হলেও বাস্তবে হয়েছে কেবল কাগুজে অগ্রগতি। ঝুঁকিগুলো প্রায় আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে।
নতুন করে আলোচনায় বিমানবন্দরসংলগ্ন জলাভূমি
রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, বিমানবন্দরসংলগ্ন জলাভূমি ও প্লাবনভূমিকে আবাসিক প্রকল্পে রূপান্তরের জন্য জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি নগর নিরাপত্তা, জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বিমানবন্দরের বাফার জোন শুধু বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য নয়; রাজধানীর পরিবেশ, দুর্যোগ সহনশীলতা এবং নগর ব্যবস্থাপনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চতা বিধি লঙ্ঘন করে ৬৩০ ভবন
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বেবিচকের উচ্চতা সীমা লঙ্ঘন করে ৬৩০টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে এসব ভবনের মধ্যে কতটির বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে, কতটিতে জরিমানা হয়েছে, কতটি বৈধ করা হয়েছে বা কতটি ভেঙে ফেলা হয়েছে—এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তথ্যের এই ঘাটতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী বিমানবন্দরের এয়ার ফানেল জোন কঠোরভাবে সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক।
তার ভাষ্য, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে। শুধু নীতিমালা নয়, কার্যকর ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফানেল জোন সুরক্ষিত রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক এস কে মেহেদী হাসান বলেন, মাইলস্টোনের ঘটনা দেশের একটি পুরোনো প্রবণতারই প্রতিফলন।
তিনি বলেন, বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত কমিটি হয়, সুপারিশ আসে, কিছুদিন সংস্থাগুলো সক্রিয় থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সব থেমে যায়। সুপারিশ বাস্তবায়নের আগেই বিষয়টি ভুলে যাওয়া হয়। এরপর আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটলে আবার একই আলোচনা শুরু হয়।
তার মতে, এই চক্র ভাঙতে হলে সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপযোগ্য করতে হবে, নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্যাম্পাসের বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি সরকারি লিজের মাধ্যমে পাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও ছিল।
তবে রাজউকের নথিতে দেখা যায়, অনুমোদিত ব্যবহার ও বাস্তব ব্যবহারের মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য অনুমোদিত ভবন হোস্টেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কিছু স্থাপনা অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, ভবনের অনুমোদন, পরিদর্শন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর নজরদারিতে বছরের পর বছর এসব অসঙ্গতি কীভাবে চলতে পেরেছে।
এক বছর পরও বাস্তবায়ন হয়নি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পরও— এয়ার ফানেল জোন নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি; রাজউক ও বেবিচকের যৌথ উচ্চতা জরিপ শুরু হয়নি; মেট্রোরেল ডিপোর ৩০০ ফুট নিরাপত্তা বাফার জোন পুরোপুরি খালি করা যায়নি; উচ্চতা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে চিহ্নিত শত শত ভবনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া এখনও অসম্পূর্ণ।
