
নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

রংপুর বিভাগের আট জেলায় বাস চলাচল বন্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ২০ বছরের পুরনো বাস ও মিনিবাস চলাচলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না হলে আগামী ১ নভেম্বর থেকে সর্বাত্মক পরিবহন ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মালিকেরা। এ দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন তাঁরা। এতে উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের দুর্ভোগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাতে রংপুর নগরীর জেলা মোটর মালিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ আলটিমেটাম দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রংপুর বিভাগীয় বাস-মিনিবাস মোটর মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম বসুনিয়া। তিনি বলেন, গাড়ির বয়স ২০ বছর হলেই সেটিকে চলাচলের অনুপযোগী ঘোষণা করা উচিত নয়। বরং গাড়ির প্রকৃত অবস্থা, যান্ত্রিক সক্ষমতা ও ফিটনেস পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তাঁর মতে, বয়সের ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক বাস ও মিনিবাস একযোগে চলাচলের বাইরে চলে গেলে পরিবহন খাতে সংকট তৈরি হবে। পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগও বাড়তে পারে।
পরিবহন মালিক সমিতির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিআরটিএর নীতিমালা অনুযায়ী বাস ও মিনিবাসের ইকোনমিক লাইফ ২০ বছর এবং ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ক্ষেত্রে ২৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমিতির দাবি, এ নিয়মের কারণে সারা দেশে নিবন্ধিত ২০ বছরের পুরনো ৫৬ হাজারের বেশি বড় বাস এবং ২৮ হাজারের বেশি মিনিবাস চলাচলের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা দেশে নতুন নিবন্ধন পাওয়া বাসের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৩৬টি। এর মধ্যে মিনিবাস ছিল ২২০টি।
তাঁদের বক্তব্য, এত বিপুলসংখ্যক পুরনো গাড়ির বিকল্প হিসেবে অল্প সময়ে পর্যাপ্ত নতুন বাস ও মিনিবাস যুক্ত করা কঠিন। ফলে গণপরিবহনের সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি যাত্রীসেবাও ব্যাহত হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবহন নেতারা বলেন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় মেরামতের মাধ্যমে পুরনো গাড়িও চলাচলের উপযোগী রাখা সম্ভব। তাই শুধু বয়সের কারণে গাড়ি বাতিল না করে কারিগরি পরীক্ষা ও ফিটনেসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তাঁদের দাবি, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৪০ ধারায় নির্ধারিত শর্তে চেসিস ছাড়া গাড়ির অন্যান্য যন্ত্রাংশ পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। এ কারণে গাড়ির বয়সকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়ে তাঁরা আপত্তি জানিয়েছেন।
তবে পরিবহন নেতারা স্পষ্ট করেছেন, তাঁরা ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে চালানোর পক্ষে নন। তাঁদের মূল দাবি, যেসব পুরনো গাড়ি প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং চলাচলের উপযোগী, সেগুলোকে শুধু বয়সের কারণে বাতিল করা যাবে না।
রংপুর অঞ্চলের অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে মালিক সমিতির নেতারা বলেন, এ অঞ্চল কৃষিনির্ভর এবং এখানকার অনেক পরিবহন মালিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তাঁদের পক্ষে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয়ে নতুন বাস কেনা কঠিন।
তাঁদের অভিযোগ, পুরনো বাস বাতিল করে নতুন গাড়ি কেনার বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে অনেক মালিক আর্থিক সংকটে পড়বেন। এর প্রভাব পড়বে পরিবহন ব্যবসা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং যাত্রীসেবার ওপর।
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা আরও অভিযোগ করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল ও কিছু আমদানিকারককে সুবিধা দিতে আমলাতান্ত্রিক পর্যায় থেকে সরকারকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হচ্ছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবহন মালিকদের আশঙ্কা, বিপুলসংখ্যক পুরনো বাস একসঙ্গে বাতিল করে নতুন গাড়ি আমদানি করতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
তাঁদের মতে, সচল রাখা সম্ভব এমন গাড়ির প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও মেরামতের মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে পরিবহনসেবা চালু রাখা সম্ভব।
একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেছেন তাঁরা। তবে তাঁদের বক্তব্য, এ ক্ষেত্রে গাড়ির বয়সের পাশাপাশি বাস্তব অবস্থা ও ফিটনেসকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সমিতির ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে দাবির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দিতে হবে। অন্যথায় ১ নভেম্বর থেকে রংপুর বিভাগের সব জেলায় সর্বাত্মক পরিবহন ধর্মঘট পালন করা হবে।
ধর্মঘট কার্যকর হলে আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাস চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়তে পারেন। আঞ্চলিক যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রংপুর জেলা মোটর মালিক সমিতির উপদেষ্টা ও রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে রংপুর বিভাগীয় বাস-মিনিবাস মোটর মালিক সমিতির সভাপতি শ্রী ভবানী শংকর আগরওয়াল, সাধারণ সম্পাদক ওয়াসিমুল বারী রাজসহ পরিবহন খাতের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
