মঙ্গলবার ১৩ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৮শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
যাত্রীদের টিকিট কেনার গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বাংলাদেশ রেলওয়ের আগামী মন্ত্রিসভায় সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে উপস্থাপন করা হবে: গণপূর্তমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জে তুহিন হত্যা মামলায় আইভীর জামিন মঞ্জুর নিউইয়র্কে ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় সরকার ব্যবস্থা নেবে: ডা. জাহেদ এসএসসিতে অকৃতকার্যদের ১৫ দিনের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার ব্যবস্থা: শিক্ষামন্ত্রী গাইবান্ধায় সংবাদ সংগ্রহে যাওয়া সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ কক্সবাজার সৈকতে এক ব্যতিক্রমী ভাস্কর্য ‘প্লাস্টিক দানব’ দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ রাষ্ট্রপতির দেশের বাজারে এলজিপির কোনো ঘাটতি নেই: জাহেদুর রহমান ককরোচ পার্টির আবারো দুই শীর্ষ নেতা আটক
Advertise with us

তেল সংকটে ঈদের বাসযাত্রায় শঙ্কা, বাড়তি ভাড়ার ফাঁদে যাত্রীরা?

ডেস্ক রিপোর্ট   |   বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২৩৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

তেল সংকটে ঈদের বাসযাত্রায় শঙ্কা, বাড়তি ভাড়ার ফাঁদে যাত্রীরা?

তেল সংকটে ঈদের বাসযাত্রায় শঙ্কা, বাড়তি ভাড়ার ফাঁদে যাত্রীরা?

ঈদের মতো বড় উৎসব এলেই পরিবহন খাতে ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি করে সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটা— নতুন কোনো অভিযোগ নয়। তবে, এবারের ঈদযাত্রার আগে দেশজুড়ে শুরু হওয়া জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট সেই পুরনো আশঙ্কাকে আরও উসকে দিয়েছে। তেলের সরবরাহ ঘাটতি এবং দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে অনেক পরিবহন মালিক ইতোমধ্যে অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, ‘এটি মূলত শেষ মুহূর্তে বাড়তি ভাড়া আদায়ের একটি সুকৌশলী ফাঁদ!’

গত কয়েক দিন ধরে সারাদেশে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ায় বাণিজ্যিক যানবাহনগুলো চরম বিপাকে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে। নিয়ম অনুযায়ী, একটি দূরপাল্লার বাস সর্বোচ্চ ২০০–২২০ লিটার এবং লোকাল বাস ৭০–৮০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে। তবে বাস মালিকদের দাবি, বাস্তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে এই পরিমাণ তেল মিলছে না। অনেক পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়েও তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বাড়তি দামে ড্রামে করে ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

টিকিট নিয়ে অনিশ্চয়তা

ঈদকে সামনে রেখে বরাবরের মতো গত ৩ মার্চ থেকে বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছিলেন মালিকরা। তবে মাত্র দুই দিনের মাথায় জ্বালানি তেল নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতায় থমকে যায় এই কার্যক্রম। লোকসানের আশঙ্কায় অনেক পরিবহন মালিক অগ্রিম টিকিট বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। তাদের দাবি, তেলের তীব্র সংকট বা হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতিতে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করলে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিতে পড়তে হবে। তাই বিকল্প হিসেবে তারা যাত্রার আগমুহূর্তে সরাসরি টিকিট বিক্রির পরিকল্পনা করছেন।

তবে, সাধারণ যাত্রীরা পরিবহন মালিকদের এই যুক্তিকে দেখছেন ভিন্ন চোখে। তাদের মতে, এটি মূলত বাড়তি ভাড়া আদায়ের একটি সুকৌশলী ফন্দি। যাত্রীদের অভিজ্ঞতা বলছে, ঈদ এলেই ৩৫০ টাকার ভাড়া অনায়াসেই ৫০০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। এবার তেল সংকট ও ঈদ— এই দ্বিমুখী অজুহাতে ভাড়ার নৈরাজ্য আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে। ফলে বরাবরের মতোই অসহায় সাধারণ যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া গুনে যাতায়াত করতে হবে।

মালিকদের লোকসান ও সংকটের বয়ান

দূরপাল্লার আন্তঃজেলা পরিবহনের একজন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢা নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান। ২০টি বাসের এই মালিক বলেন, ‘শুরুতে নির্ধারিত দামেই অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছিলাম। কিন্তু তেলের তীব্র সংকট সব ওলটপালট করে দিয়েছে। প্রতিদিন একটি বাসের জন্য যেখানে ১০০ লিটার তেল লাগত, সেখানে গত দুদিনে পেয়েছি মাত্র ৩০ ও ২০ লিটার। রোববার রাতে কোনো তেলই পাইনি। বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে ১২৫ টাকা লিটার দরে ড্রামে তেল কিনে আজকের (সোমবারের) ট্রিপগুলো সামাল দিতে হচ্ছে।’

‘এভাবে লোকসান দিয়ে বাস চালানো অসম্ভব। সরকার রেশনিংয়ের কথা বললেও পাম্পে তেল মিলছে না। এমন অনিশ্চয়তায় ঈদের অগ্রিম টিকিট বিক্রি করার সাহস পাচ্ছি না। এর মধ্যে যদি তেলের দাম বেড়ে যায়, সেই লোকসান কে টানবে’— প্রশ্ন রাখেন তিনি।

জ্বালানি সংকটের কারণে অগ্রিম টিকিট বিক্রি ব্যাহত হচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নে হানিফ এন্টারপ্রাইজের জেনারেল ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন কিছুটা কৌশলী অবস্থান নেন।তিনি বলেন, ‘আমরা অনলাইনে অগ্রিম টিকিট ছেড়ে দিয়েছি। তবে, সামনের দিনগুলোতে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা এখনই বলা কঠিন।’

শ্যামলী এনআর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ
অন্যদিকে, শ্যামলী এনআর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ চলমান সংকটের গভীরতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের এই সংকট আমরা বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছি। তেল যে একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না তা নয়, তবে আমাদের নিয়মিত সাপোর্ট দেওয়া তিন-চারটি ফিলিং স্টেশনে লোক দাঁড় করিয়ে রেখে অনেক কষ্টে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এটি আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাড়তি চাপের সৃষ্টি করছে।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই সংকট যদি আরও দীর্ঘ হয় এবং সরকার যদি দ্রুত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারে, তবে ঈদের সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’

‘আমরা ইতোমধ্যে অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছি। এর মধ্যে যদি তেলের দাম বেড়েও যায়, তবে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের কোনো সুযোগ নেই এবং আমরা তা করবও না। তবে, এমনটা হলে আমাদের বড় অঙ্কের লোকসান দিয়েই বাস চালাতে হবে’— যোগ করেন শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ।

টিকিট নিয়ে ‘লুকোচুরি’, শঙ্কায় যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা

ঈদযাত্রার আগে টিকিট নিয়ে পরিবহন মালিকদের এমন সিদ্ধান্তে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। জামালপুর রুটের যাত্রী রিপন মাহমুদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই রুটের বাসগুলো এখন আর অগ্রিম টিকিট দিচ্ছে না। কাউন্টার থেকে জানানো হচ্ছে, যাত্রার ঠিক আগে টিকিট বিক্রি করা হবে। কিন্তু ঈদের ওই ভিড়ের মধ্যে টিকিট সংগ্রহ করা কতটা দুঃসাধ্য, তা কি তারা বোঝে? এখন যা ৩৫০ টাকা, তখন সেই ভাড়া হয়ে যাবে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। টাকা দিলেও টিকিট পাব কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’

একই সুর লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা এলাকার যাত্রী জুয়েল রানার কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘আগে অনলাইনে টিকিট না পেলেও কাউন্টারে পাওয়া যেত। এবার অর্ধেক টিকিট অনলাইনে ছাড়ার পর মুহূর্তেই তা শেষ হয়ে গেছে। এখন কাউন্টারে গেলে বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কা হলো, বাস আদৌ ছাড়বে কি না, তা নিয়ে। সবসময় বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না, ঈদই একমাত্র ভরসা। আগে ভোগান্তি হতো সড়কে, আর এবার যাত্রা শুরুর আগেই টিকিট নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছে। অথচ এসব দেখার কেউ নেই।’

বিশেষজ্ঞ ও নেতাদের উদ্বেগ

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘বাসের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ঈদযাত্রার গন্তব্যও নিশ্চিত করা যাবে না। ঈদের সময় বাসগুলো বিরতিহীনভাবে ট্রিপ দেয়। এবার জ্বালানি সংকট এক নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা নীতিনির্ধারকদের (মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব) ভাবনায় আছে বলে মনে হয় না। এই পরিস্থিতিকে পুঁজি করেই মূলত ভাড়া নৈরাজ্য চরমে উঠবে এবং মানুষের ভোগান্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘সরকার তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিলেও পাম্পগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। লাইন ধরে তেল সংগ্রহ করতে কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। এই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ঈদযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। কারণ, তেলের জন্য যদি গাড়ি পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে টার্মিনালে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না।’

তবে, বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘আমরা ভাড়ার বিষয়টি অত্যন্ত কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে এক পয়সাও বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে নন-এসি বাসের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না। জ্বালানির দাম না বাড়লে অগ্রিম টিকিট বন্ধ রেখে কোনো লাভ নেই, কারণ নতুন ঘোষণা ছাড়া কেউ বাড়তি ভাড়া আদায় করতে পারবে না।’

‘জ্বালানির দাম বাড়লেও বিআরটিএতে বৈঠক করে ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো সম্ভব নয়’— যোগ করেন তিনি।

জ্বালানি মজুতের বর্তমান চিত্র

ডিজেল : বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেলের মোট মজুত সক্ষমতা রয়েছে ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। গত ৮ মার্চ পর্যন্ত পাওয়া হিসাব মতে, বর্তমানে মজুত আছে ১ লাখ ২০ হাজার ২৩৭ টন ডিজেল। দেশে দৈনিক গড়ে ৯ হাজার ২২ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে; সেই হিসাবে বর্তমান মজুত দিয়ে আগামী ১৩ দিন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।

তবে, সরবরাহ অব্যাহত রাখতে বিপিসি ইতিবাচক খবরও দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী ১৩ মার্চের মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৫ টন ডিজেল নিয়ে পাঁচটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই নতুন সরবরাহ যুক্ত হলে মজুতের পরিমাণ বাড়বে এবং তা দিয়ে পরবর্তী আরও প্রায় ১৬ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। সূত্র ঢাকা পোস্ট

ড.ব.ম

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
১২৩৪৫৭
৮৯১০১১১১৩৪
১৫১৬১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২
৯৩০৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়