
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে রবিবার গভীর রাতে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নেয় অন্তত ৩০০ জনের সশস্ত্র বাহিনী। হামলায় সবচেয়ে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র একে-৪৭ ব্যবহার করেছে তারা। পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা এ হামলা চালায়।
হামলার সময় বুলডোজার দিয়ে নির্মাণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাতায়াত ঠেকাতে সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ কেটে দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে অন্তত ২০ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়। তবে যৌথ অভিযান কিংবা সন্ত্রাসীদের হামলায় কেউ হতাহত হয়েছে কিনা, তা এখনও জানায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
র্যাব জানিয়েছে, রাস্তা কেটে দেওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও রাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযানে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে। সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা এ হামলার সঙ্গে জড়িত। আগামী ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। সন্ত্রাসীরা যে ক্যাম্পটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে, সেটি উদ্বোধন করার কথা ছিল মন্ত্রীর।
হামলার সময় বুলডোজার দিয়ে নির্মাণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়
র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘রবিবার রাত ১টার দিকে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর ২৫০-৩০০ জন সশস্ত্র সদস্য সংঘবদ্ধ হয়ে এই হামলা চালায়। তাদের হাতে রামদা, দেশীয় অস্ত্র এবং একে-৪৭ রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।’
তিনি বলেন, ‘হামলাকারীরা বুলডোজার দিয়ে আলীনগর স্কুলে থাকা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পের পেছনের দেয়াল ভেঙে দেয়। ওই স্কুলের শেষ প্রান্তে যৌথ বাহিনীর নতুন একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছিল। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। বুলডোজার দিয়ে সেটি প্রায় পুরোটাই গুঁড়িয়ে দিয়েছে তারা। সন্ত্রাসীরা গুলি করে আমাদের লোকজনকে ব্যস্ত রাখে এবং সেই সুযোগে ভাঙচুর চালায়। পাহাড়ে থাকা নতুন কয়েকটি টিনের ঘরের ভেতর থেকে টিন ফুটো করে বন্দুকের নল বের করে গুলি ছুড়েছে তারা।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাতায়াত ঠেকাতে সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ কেটে দেওয়া হয়
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক বলেন, ‘ইয়াসিন ও তার সহযোগীরা আলীনগর সংলগ্ন পাহাড়ি ও জঙ্গলে অবস্থান পরিবর্তন করে লুকিয়ে থাকে। এ ছাড়া আমাদের বাহিনী পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় আগেই সরে যাওয়ার সুযোগ পায়। মূল সড়ক থেকে আলীনগর পর্যন্ত পৌঁছাতে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগে। ভাঙা রাস্তার কারণে দ্রুত অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার সহজ হবে।’
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে যত ঝাঁকুনি দিক, আমাদের পিছু হটার সুযোগ নেই। ইয়াসিন, রোকন বা যারাই জড়িত থাকুক, সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’
এই হামলা পরিকল্পিত উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, ‘হামলার আগে ভেকু মেশিন দিয়ে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। একইসঙ্গে আলিনগর এলাকায় নির্মাণাধীন একটি অস্থায়ী ক্যাম্প লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। জঙ্গঙ্গল সলিমপুর এলাকায় যৌথ বাহিনীর দুটি ক্যাম্প ছিল। একটি প্রবেশমুখে এবং অন্যটি আলিনগর এলাকায়। নতুন যে অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণ করা হচ্ছিল, সেটিই ছিল হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য। সেখানে যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্থায়ীভাবে অবস্থান নিতে না পারে, সে উদ্দেশ্যেই হামলা চালানো হয়েছে। আলিনগর স্কুলে র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। হামলাকারীরা চেয়েছিল, বাহিনীর সদস্যরা যেন ক্যাম্প থেকে বের হতে না পারেন। এজন্য কিছু ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। পাল্টা জবাবে যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও শটগান, চাইনিজ রাইফেল ও গ্যাস গান ব্যবহার করেন।’
এ ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়
পুরো ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ১০৪ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে জানিয়ে এসপি মাসুদ আলম বলেন, ‘কঠোর প্রতিরোধের কারণে হামলাকারীরা ক্যাম্পে ঢুকতে পারেনি এবং বাহিনীর কোনও সদস্য হতাহত হননি। তবে হামলাকারীরা ভেকু মেশিন দিয়ে ক্যাম্পের কিছু অবকাঠামো ভেঙে ফেলেছে। রাস্তা কেটে দেওয়ায় অনেককে হেঁটে ঘটনাস্থলে যেতে হয়েছে। শেষরাতে হামলাকারীরা পাহাড়ি এলাকায় সরে যায়।’
এর আগে রবিবার (২৪ মে) রাত ১টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়েছে। গুলিবর্ষণের মাধ্যমে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে এই হামলা চালানো হয়। পরে র্যাব সদস্যরা পাল্টা আক্রমণ করলে প্রায় দুই ঘণ্টা গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
এ প্রসঙ্গে র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপ রাত ১টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনীর পক্ষ থেকে নন-লেথাল অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরে যৌথ বাহিনী এলাকায় প্রবেশ করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। এরপর আজ সকাল থেকে যৌথ বাহিনী এলাকাজুড়ে অভিযানে নামে। দুপুরে ঘটনাস্থল ঘিরে তল্লাশি কার্যক্রমও চালানো হয়।’
