সোমবার ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

ফ্যামিলি কার্ডে জালিয়াতি ধরতে এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৬ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ফ্যামিলি কার্ডে জালিয়াতি ধরতে এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা

দেশের প্রান্তিক, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করছে সরকার। এই কর্মসূচিতে কোনো ধরনের জালিয়াতি বা অনিয়ম রোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বা মেশিন লার্নিং ভিত্তিক অসঙ্গতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সম্প্রতি সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের প্রস্তুত করা ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়ায় এসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়, সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬-এ একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক ‘সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এই রূপকল্পের মূল দর্শন হলো- ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক। এই দর্শনের আলোকে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ২১ দিনের মধ্যে এই কর্মসূচির পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রম উদ্বোধন করে। বর্তমানে দেশব্যাপী এর সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

যেভাবে যাচাই হবে তথ্য

নীতিমালায় বলা হয়েছে, আবেদনকারীর তথ্যের সত্যতা ও সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ভূমি মন্ত্রণালয়, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিবন্ধক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের (সেন্ট্রাল ডেটাবেজ) সঙ্গে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) সংযোগের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হবে। গতিশীল সামাজিক নিবন্ধনে (ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি) সংরক্ষিত তথ্যে কোনো অসঙ্গতি বা জালিয়াতি প্রতিরোধে সরকার প্রয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারবে।

কার্ড পাবেন নারীরা

পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সংশ্লিষ্ট পরিবারের মাতা অথবা উপযুক্ত জ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে। কার্ডধারী নারী মৃত্যুবরণ করলে উপজেলা কমিটির সিদ্ধান্তক্রমে তা পরিবারের অন্য কোনো উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে স্থানান্তর করা যাবে। তবে পরিবারে কোনো উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্য না থাকলে, জেলা কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে পরিবার প্রধান পুরুষের নামে কার্ড ইস্যু বা স্থানান্তর করা যাবে।

এছাড়া পার্বত্য অঞ্চল বা সমতলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (যেমন- গারো, খাসিয়া ইত্যাদি) প্রথাগত মাতৃতান্ত্রিক পারিবারিক কাঠামো ও উত্তরাধিকার বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ সূচক নির্ধারণ করা যাবে।

উপকারভোগী নির্বাচনের বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড

প্রকৃত অভাবী পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্তকরণের লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইকরণের পাশাপাশি পদ্ধতিগত ও বৈজ্ঞানিক ‘প্রক্সি মিন্স টেস্ট’ (পিএমটি) পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। এই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, আয়ের উৎস এবং জীবনযাত্রার মান বিশ্লেষণ করে দারিদ্র্যের আপেক্ষিক মাত্রা নির্ধারণ করা হবে। প্রতিটি পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট পিএমটি স্কোর প্রদান করে পাঁচটি ভাগে (কোয়াইন্টাইল) বিন্যাস করা হবে।

এর মধ্যে প্রথম ভাগে থাকা ‘অতি দরিদ্র’ পরিবারগুলো ১০০ ভাগ আবশ্যিকভাবে এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হবে। দ্বিতীয় ভাগের ‘দরিদ্র’ পরিবারগুলো পরীক্ষামূলক (পাইলট) ও প্রথম পর্যায়ে অগ্রাধিকার পাবে। এছাড়া তৃতীয় ভাগে থাকা ‘ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত’ পরিবারগুলোকে বাজেট সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে চতুর্থ ভাগের ‘নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত’ পরিবারগুলো আপাতত এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না এবং পঞ্চম ভাগে থাকা ‘সচ্ছল বা উচ্চবিত্ত’ পরিবারগুলোকে সরাসরি বর্জন করা হবে।

এই স্কোরিং পদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহ ফরম বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বা উপযুক্ত কারিগরি কর্তৃপক্ষ প্রণয়ন করবে। ‘ইউনিক আইডি’ এবং সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর (জিটুপি) পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি প্রকৃত উপকারভোগীর নিকট রাষ্ট্রীয় সুবিধা পৌঁছানো হবে।

যারা সুবিধা পাবেন না

কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রকৃত লক্ষ্যভুক্ত পরিবারের নিকট সুবিধা পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট বর্জন নীতিমালা বা ‘নেগেটিভ লিস্ট’ তৈরি করা হয়েছে।

খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের ঊর্ধ্বসীমার অতিরিক্ত স্কোরপ্রাপ্ত কোনো পরিবার এই কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। এ ছাড়া পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান যদি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মরত থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রাপ্ত হন কিংবা এমপিওভুক্ত শিক্ষক বা কর্মচারী হন, তবে সেই পরিবার ফ্যামিলি কার্ড পাবে না।

একইসঙ্গে মনোনীত নারী প্রধান যদি নিয়মিত সরকারি পেনশন বা অনুরূপ অবসর সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলেও তিনি এর আওতাভুক্ত হবেন না; তবে প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে বিশেষ পেনশন সুবিধা গ্রহণকারীরা এই নিয়মের বাইরে থাকবেন।

অর্থনৈতিক ও অন্যান্য সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রেও কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিবারের কোনো সদস্যের নামে যদি জাতীয় সঞ্চয়পত্রে ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকে অথবা বিআরটিএ নিবন্ধিত কোনো চার চাকার মোটরযান, যেমন—কার, জিপ বা মাইক্রোবাস থাকে, তবে সেই পরিবার এই সুবিধা থেকে বাদ পড়বে। একইভাবে পরিবারের কোনো সদস্যের নামে হালনাগাদ বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে লাইসেন্স বা ব্যবসা থাকলে এবং পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা (টিন নম্বরধারী) ও করযোগ্য আয়ের অধিকারী হলে তারা ফ্যামিলি কার্ড পাবেন না।

ভূমির মালিকানার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, পরিবারের বসতভিটাসহ আবাদি জমির মোট পরিমাণ শূন্য দশমিক পাঁচ শূন্য (০.৫০) একর বা তার বেশি হলে অথবা কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমির বাজারমূল্য ৫ লাখ টাকার অধিক হলে সেই পরিবারও এই কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।

অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষার শর্তাবলি

সুবিধাভোগী পরিবারের মনোনীত নারী প্রধান ব্যতীত অন্য সদস্যগণ প্রচলিত নিয়মে অন্যান্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা (যেমন- বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ইত্যাদি) গ্রহণ করতে পারবেন। তবে মনোনীত নারী প্রধান নিজে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন টিসিবি স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচি বা অন্য কোনো নিয়মিত সরকারি নগদ সুবিধা পেয়ে থাকলে, তাকে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা গ্রহণের পূর্বে বিদ্যমান সুবিধাটি সমর্পণ করতে হবে। অন্যথায় কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার যাচাইয়ের মাধ্যমে তার পূর্বতন সুবিধাটি বাতিল বা স্থগিত করা হবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, নিয়মিত বিরতিতে বা বার্ষিক সরাসরি যাচাইকরণ (লাইভ ভেরিফিকেশন) ও তথ্য পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এতে যদি কোনো উপকারভোগী পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন ঘটে এবং তারা নির্ধারিত পিএমটি স্কোরের সীমা অতিক্রম করে, তবে উক্ত পরিবারটি এই কর্মসূচি হতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘উত্তীর্ণ’ (গ্রাজুয়েট) হবে এবং সেই শূন্য আসনে নতুন যোগ্য দরিদ্র পরিবার প্রতিস্থাপন করা যাবে। এই লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থান (জিও-লোকেশন) ভিত্তিক পদ্ধতিতে দেশব্যাপী একটি বিশেষ সমন্বিত পরিবার জরিপ পরিচালনা করা হবে।

পুনর্মূল্যায়ন ও উত্তরণ

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বলয়কে আরও আধুনিক, পরিবার-কেন্দ্রিক এবং স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে সময়োপযোগী ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন

নীতিমালা-২০২৬’ এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। দ্রুতই এটি চূড়ান্ত করা হবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়