
নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ঢাকার হকারদের একাংশকে বসতে বায়তুল মোকাররম মসজিদ লাগোয়া যে এরশাদ রোডকে নির্বাচিত করেছিল নগর সংস্থা, সেখানে এখন বাস পার্কিং করে রাখা হচ্ছে।
জায়গাটির বিভিন্ন অংশে ছিন্নমূল মানুষের বসবাস, কোথাও জমেছে ময়লার স্তূপ; ফলে হকারদের জন্য নির্ধারিত স্থানটি ব্যবহৃত হচ্ছে ভিন্ন কাজেই।
আর বায়তুল মোকাররম ঘিরে ফুটপাতজুড়ে আবারও জমে উঠেছে হকারদের বেচাকেনা। কোথাও অস্থায়ী ছাউনি টানিয়ে পুরো ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো হয়েছে, আবার কোথাও দলবেঁধে বসা হকারদের কারণে পথচারীদের চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে।
একই চিত্র দেখা গেছে আবরার ফাহাদ অ্যাভেনিউয়ে (সাবেক বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউ)। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় রাস্তায় হকারদের জন্য স্থান চিহ্নিত থাকলেও বাস্তবে সেই সীমারেখা মানার কোনো চিহ্ন নেই; যে যার সুবিধামতো জায়গা দখল করে পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
সোমবার দুপুরে গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযান ও হকার ব্যবস্থাপনার ঘোষণার বাস্তব চিত্র সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে খুব একটা মিলছে না।
ঢাকার গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, ফার্মগেট কিংবা মিরপুরসহ যেকোনো প্রধান সড়কের ফুটপাতের চিত্র প্রায় অভিন্ন; ফুটপাতজুড়ে চৌকি, ভ্যান আর প্লাস্টিকের শিট বিছিয়ে বসানো শত শত দোকান।
ফুটপাত ব্যবস্থাপনায় নতুন উদ্যোগ
গেল ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঢাকার ফুটপাত নিয়ে পুরোনো ছক থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেয়। উচ্ছেদের বদলে পুনর্বাসন, নিবন্ধন ও নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গত ২৫ এপ্রিল রাজধানীর সড়ক থেকে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের দ্রুত পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারপ্রধানের অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন তখন জানিয়েছিলেন, উচ্ছেদ হওয়া হকারদের এমন জায়গায় পুনর্বাসন করা হবে হবে, যেখানে তারা স্বাচ্ছন্দ্য ও উৎসাহের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবেন। নিবন্ধনের মাধ্যমে হকারদের পরিচয়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়।
হকারদের ‘টেকসই পুনর্বাসনে’ প্রথমবারের মতো ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ শিরোনামে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। তাতে স্থান পেয়েছে-হকারদের নিবন্ধন, ব্যবসা পরিচালনার নির্দিষ্ট সময় ও স্থান এবং প্রশাসনিক তদারকির মতো বিষয়।
নীতিমালায় স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্রধান সড়ক এড়িয়ে অভ্যন্তরীণ বা অ্যাকসেস সড়কগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যানজট এড়াতে মেট্রোস্টেশন, বাসস্টপেজ বা গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে ৩০-৪০ ফুট দূরে হকার জোন ঠিক করতে হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ফুটপাতের পুরোটা দখল করা যাবে না, পথচারীদের জন্য ৫-৮ ফুট জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে।
ঢাকার জনবহুল এলাকায় দিনের বেলায় হকার বসার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে মিরপুর, গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, সদরঘাট, বাইতুল মোকাররম মসজিদের মতো এলাকায় অফিস শেষে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নৈশকালীন বা ‘নাইট মার্কেট’ বসানো যাবে। তাছাড়া যেসব বাণিজ্যিক এলাকায় দিনের বেলা প্রচণ্ড ভিড় থাকে, কিন্তু রাতে জনশূন্য হয়ে পড়ে, সেসব এলাকার নির্দিষ্ট লেইনে নৈশকালীন মার্কেট বসানো যাবে।
শুক্রবার, শনিবার এবং সরকারি ছুটির দিনে সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর সুযোগ রাখা হয়েছে নীতিমালায়। সরকারি অফিসের সামনের প্রশস্ত রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনের চত্বর বা সিটি করপোরেশন নির্ধারিত স্থানে এসব বাজার বসবে।
এই বাজার পারিবারিক কেনাকাটাকেন্দ্রিক হবে উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, খাবারের পাশাপাশি হস্তশিল্প ও গৃহস্থালি পণ্যের প্রাধান্য থাকবে।
নীতিমালায় এক পরিবারের একজনের বেশি সদস্যকে লাইসেন্স না দেওয়া এবং কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রথম ধাপে ৩০২ জন হকারকে কিউআর কোডযুক্ত আইডি কার্ড দেওয়া হয়। দুই সিটি করপোরেশন তথ্য অনুযায়ী, এই কার্যক্রমের আওতায় ২৯ জুন পর্যন্ত ডিএসসিসি এলাকায় ৮৮৮ জন এবং ডিএনসিসি এলাকায় ২০৪ জন হকারকে হকার কার্ড পেয়েছেন।
তবে সিটি করপোরেশনের তরফে যেসব সড়কে হকারদের জন্য জায়গা ঠিক করা হয়েছে, সেখানে ক্রেতা কম থাকায় আয় কমে যাচ্ছে বলে ভাষ্য হকার নেতাদের।
তাছাড়া যেভাবে পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে তাতে অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাশিম কবিরের।
তিনি বলেন, “পুলিশের কাছে যে যাইতাছে, তার নামই তালিকায় ঢুকতাছে। কে আসল হকার, তার কোনো যাচাই-বাছাই নাই।”
এ বিষয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক আব্দুস সালাম ঈদের আগে বলেছিলেন, পুনর্বাসন কার্যক্রমে সবাইকে শতভাগ সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়।
“তালিকা সিটি করপোরেশন তৈরি করেনি। পুলিশ সরেজমিনে গিয়ে যাচাই-বাছাই করে তালিকা করেছে।” জায়গা সংকট ও হকারদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঈদের আগে উচ্ছেদ অভিযান শিথিল করা হয়।
ডিএনসিসি প্রশাসক তখন বলেছিলেন, “হকাররা কোরবানির ঈদ পর্যন্ত সময় চেয়েছে, বিষয়টি সেই পর্যায়েই আছে।”
ঈদের পর সিটি করপোরেশনের অভিযান চলছে ঠিকই, তবে যেসব এলাকায় হকার ব্যবস্থাপনার কাজে নগর সংস্থা হাত দিয়েছে—সেখানে নয়। ১৭ থেকে ২১ জুন পর্যন্ত ধোলাইপাড়, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, মিরপুর রোড, হাতিরপুল এবং উত্তরায় শত শত অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদের পাশাপাশি জরিমানা আদায় করা হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাশিম কবির বলেন, “ঈদের পরে সিটি করপোরেশন তেমন কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালায়নি। দুই-এক জায়গায় যাও হয়েছিল, সেদিকেও এখন অবস্থা স্বাভাবিক।” নতুন কোনো নির্দেশনা বা নোটিসও তারা পাননি বলে জানান তিনি।
‘মানুষরে দেখাইবার লাগি হুদাই করে’
গুলিস্তান এলাকায় হকারদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক ধরনের নির্লিপ্ততার মধ্যে হকার রবিউল বলেন, “এখন আর কিছুই কয় না ভাই। উনাদেরও (প্রশাসন) ধৈর্য শেষ। এগুলা তো কয়দিন পরপরই হয়।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক হকার বললেন, “এডি মানুষরে দেখাইবার লাগি কয়দিন পরপর হুদাই করে।”
আরো কয়েকজন হকারের সঙ্গে আলাপের চেষ্টা করা হলেও তারা কথা বলতে চাইছিলেন না। তাদের ভাষ্য এমন, ‘পেটে ভাত জোগানোর লড়াইয়ে’ এসব আলোচনা তাদের কাছে ‘অনর্থক’; এ কারণে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নন।
হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের উদ্যোগ যে আশা জাগিয়েছিল তা নিয়ে এখন হতাশা প্রকাশ করছেন পথচারীদের কেউ কেউ।
তাদের একজন সজিব মিয়া বললেন, “আপনারা এতদিনে বুঝলেন? নতুন সরকার এসে যখন হম্বিতম্বি শুরু করল, তখনই আমি জানতাম শেষে কাজের কাজ কিছুই হবে না।”
আরেক পথচারী হাসিবুল শেখের ভাষায়, “কিছুই হবে না, সেটা শুরু থেকেই জানি। মাঝে অকারণে সরকারি টাকা নষ্ট হলো (অভিযান পরিচালনা করে), হকারদেরও কষ্ট হলো; আর পথচারীদেরও আরও একবার মন ভাঙল।”
ঈদের আগে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ থাকলেও এখন উভয়পাশে দোকান বসানোয় হাঁটাই কঠিন হয়েছে বলে জানাচ্ছেন পথচারীরা।
দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য সাইফুল বললেন, “সরকার যে কী করবে, আমরা জানি না। আপাতত অভিযান হবে, এরকম কোনো খবর নেই।”
পথচারীরা হতাশ হলেও ধৈর্য ধরতে বলছেন নগর সংস্থার প্রশাসকরা। তারা বলছেন, হকার ব্যবস্থাপনা শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আশার কথা শোনাচ্ছে নগর সংস্থা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ঈদ পর্যন্ত সময় নেওয়ার পর হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আবারও কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে।
তিনি সোমবার রাতে বলেন, “এইমাত্র এ বিষয়ে একটি সভা করেছি। আগামী দুই-চার দিনের মধ্যেই আমরা আবার কার্যক্রমে যাচ্ছি।”
উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “উচ্ছেদ বলতে কী? আমরা বারবার একটি কথাই বলছি, প্রধানমন্ত্রী ‘উচ্ছেদ’ শব্দটা শুনতে চান না। আমরা এটাকে একটি সিস্টেমের মধ্যে আনতে চাই।”
কী ধরনের ব্যবস্থাপনা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা একটি সিস্টেম করব। ডে-নাইট মার্কেট করব, সন্ধ্যাকালীন মার্কেট করব, হলিডে মার্কেট করব। কিছু কিছু জায়গা মার্কিং করে দেওয়া হবে। এর বাইরে তারা বসতে পারবে না।”
এরশাদ রোডে চিহ্নিত স্থানে হকার না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, “এগুলো এতদিন আমরা করিনি। আগামী দুই-চার দিনের মধ্যেই আমরা এগুলো নিয়ে অ্যাকশনে যাব।”
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ঈদের আগে হকারদের বিষয়ে যে সময় নেওয়া হয়েছিল, ঈদের পর আবারও তাদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
পুনর্বাসন কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমাদের যে বাজেট প্রক্রিয়া চলছে, সেটা শেষ হলে বসে আবার এ কাজ চলমান করা হবে। বাজেট নিয়ে এখন একটু ব্যস্ততা আছে।”
ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, “তালিকা বিভিন্নভাবে আসে। আমরা যাচাই-বাছাই করে যারা মূলত ফুটপাতে বসে ব্যবসা করেন, তাদেরই তালিকাভুক্ত করছি।”
ঈদের আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কেন্দ্রীয় হকার ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য, সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেছিলেন, “সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনায় মূল সড়কের পাশে হকার না রাখার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তবে নির্দিষ্ট মার্কেট বা পুনর্বাসন স্থান তৈরির ক্ষেত্রে জায়গা সংকটও রয়েছে।”
হকার পুনর্বাসন উদ্যোগের সফলতার বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, এ বিষয়ে উভয় পক্ষের সমঝোতা প্রয়োজন। “একতরফা পরিকল্পনা দিয়ে ফল পাওয়া যাবে না, দুই পক্ষের সম্মতি লাগবে।”
সার্বিক বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম ফয়সাল বলেন, হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতোমধ্যে নীতিমালা জারি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “নীতিমালা জারির পর সিটি করপোরেশন বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করেছে। হকারদের একটি ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনার জন্য লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছিল। একই সঙ্গে সন্ধ্যাকালীন মার্কেট ও হলিডে মার্কেট চালুর বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল।”
বর্তমান সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “কার্যকর করার জন্যই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন সেটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে আমাকে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।”
ফয়সাল বলেন, “মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কমিটি ও অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বিষয়টি কিছুটা ধীর হয়ে গেছে।”
‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’
হকার উচ্ছেদ ও পুনর্দখলের চক্র প্রায় পাঁচ দশক ধরেই চলছে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম হকার উচ্ছেদ অভিযান চলে ঢাকার গুলিস্তান এলাকায়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে হাজারীবাগ, কচুক্ষেত ও ডেমরায় হকারদের পুনর্বাসনের স্থান নির্ধারণ করা হয়। কয়েকশ হকারকে ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরযুক্ত বরাদ্দপত্র দেওয়া হলেও ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে সেখান থেকেও তাদের উচ্ছেদ করা হয়। বিকল্প না থাকায় হকাররা ফের ব্যস্ত মোড়গুলোতে ফিরে আসেন।
বুয়েটের গবেষক ফারুকী জাহান রত্না ২০১২ সালে ‘ঢাকার হকার: তাদের বেঁচে থাকার লড়াই এবং ঢাকা শহরের কার্যকারিতা’ শীর্ষক গবেষণায় স্বাধীনতার পর থেকে হকার উচ্ছেদের ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরেছেন।
ওই গবেষণার তথ্যানুযাযী, ১৯৮৯ ও ১৯৯৮ সালের মধ্যে অন্তত ২০টি বড় উচ্ছেদ অভিযান চলে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ। ১৯৮৯ সালে ফুলবাড়িয়া, আদর্শ, বঙ্গবাজার ও গুলিস্তান হকার্স মার্কেট ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি)। ২ হাজার ৩৭০ জন হকারকে বঙ্গবাজারে অস্থায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়।
কিন্তু ১৯৯৮ সালে চারতলা সুন্দরবন সুপার মার্কেট নির্মিত হওয়ার পরও হকাররা অস্থায়ী স্থান ছাড়েননি, আর কর্তৃপক্ষও নীরব ভূমিকা পালন করে।
২০০৫ সালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিএমপি এবং ডিসিসির যৌথ অভিযানে ফুটপাত ফাঁকা করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ব্যাপক উচ্ছেদ চলে। সে সময় দুটি হলিডে মার্কেট ও প্রায় ২০টি হকার্স মার্কেটে পুনর্বাসনের চেষ্টা হলেও তদারকির অভাবে তা মুখ থুবড়ে পড়ে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের পুরনো প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৬ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অভিযানে গুলিস্তানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালে কর্মদিবসে হকার বসতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বড় পরিসরে অভিযান চলে। ২০১৯ সালেও দুই সিটি করপোরেশন অভিযান চালায়। তবে প্রতিবারই কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের ব্যবধানে ফুটপাত ফের হকারদের দখলে চলে যায়।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেছেন, “পথচারীর অধিকার পথচারীকেই ফিরিয়ে দিতে হবে। ঢাকার মতো শহরে ফুটপাত দখল করে হকার বসানো বা রাস্তার অংশ ব্যবহার করতে দেওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে। একজনকে বসতে দিলে আরও ১০ জন এসে বসবে। কার্যকর নজরদারির সক্ষমতাও আমাদের নেই।”
একই সুর শোনা গেল ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খানের কণ্ঠে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের উচিত ছিল শুরু থেকেই একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যে, হকারদের পুনর্বাসনের জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে, কিন্তু এরপর আর অনুমোদনহীনভাবে রাস্তা বা ফুটপাতে বসার সুযোগ থাকবে না।
“কিন্তু সরকার যখন বলল, পুনর্বাসন ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না; আবার ফুটপাথে দাগ কেটে বসার সুযোগও দিল, তখন যে বার্তাটা গেল সেটা হচ্ছে, ‘আমাদের কিছুই হবে না’। হকাররাও বুঝে গেছে, এই সরকারও তাদের সরাবে না।”
তিনি বলেন, এর ফলে শুধু হকাররাই নয়, তাদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়কারী চক্রও একই বার্তা পেয়েছে।
“যারা এই পুরো ব্যবস্থাটা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের লোক আছে, অন্য রাজনৈতিক দলের লোক আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যও আছে। তারা বুঝে গেছে, আগের বন্দোবস্তই চলছে, শুধু হাতবদল হয়েছে।”
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “সরকারের উচিত ছিল কয়েকজনকে আইডেন্টিফাই করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। পাশাপাশি হকারদের একটা ডেটাবেজ তৈরি করা।
“কে সত্যিকার অর্থে দরিদ্র, কার পারিবারিক দুরবস্থা আছে, তাকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নিতে হবে। কিন্তু সেটা হকার পুনর্বাসনের নামে হওয়া উচিত না।” রাষ্ট্রকে একইসঙ্গে আইন প্রয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তা দুটোই নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
আইপিডি নির্বাহী পরিচালক আদিল বলেন, “সমস্যার মূল কারণ শুধু কর্মসংস্থানের অভাব নয়। আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি করা যাচ্ছে না; আবার যারা কর্মসংস্থানের বাইরে আছেন, তাদের সামাজিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এই দুই ব্যর্থতার কারণেই মানুষ এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক পেশায় আসছে।”
এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “হকারদের বসিয়ে রাখার পেছনে যে রাজনৈতিক অর্থনীতি, যে মাসোহারা-নির্ভর চক্র কাজ করে, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই চক্রটাকে না ভাঙলে কোনো নীতিই কার্যকর হবে না।”
