
নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ডিজিটাল ওজন স্কেলে কারচুপি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস, পণ্য আত্মসাতের মতো একের পর এক ঘটনায় দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা।
যদিও কাস্টম বলছে, আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি ও শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনও রাজস্ব কমার অন্যতম কারণ।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের তথ্যমতে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। একই সময়ে বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ২ হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন পণ্য।
এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ২৯ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা এবং আমদানি হয়েছিল ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০৯ মেট্রিক টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা এবং আমদানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫ মেট্রিক টন।
ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ওজন পরিবর্তন, মিথ্যা ঘোষণা এবং সাফটা সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের বিপুল রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি করছে। তাদের অভিযোগ, শুল্কহার বাড়ার পর উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাসের প্রবণতা আরও বেড়েছে।
বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, সাফটা সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কহার গত তিন অর্থবছরে ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার ছিল ৭ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ শতাংশ। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানিতে সাফটা সুবিধা দিলেও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা ভারতে একই ধরনের সুবিধা পান না।
সম্প্রতি কাস্টমের একটি দাপ্তরিক চিঠি প্রকাশ্যে এলে ওজন কারচুপির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সহকারী কমিশনার অটল গোস্বামী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, গত ১৪ জুন বন্দরের ৫ নম্বর ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে একই ভারতীয় খালি ট্রাকের একই সময়ে দুটি পৃথক পণ্যতালিকায় দুটি ভিন্ন ওজন দেখানো হয়েছে। একটিতে খালি ওজন ৪ হাজার ৮৮০ কেজি, অন্যটিতে ৪ হাজার ৯২০ কেজি উল্লেখ করা হয়। এ ঘটনায় ট্রাফিক পরিচালকের কাছে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছে কাস্টমস।
কাস্টমস সূত্র জানায়, ওজনের অসঙ্গতি ধরা পড়া চালানটি ছিল সাইকেলের যন্ত্রাংশের। পরে ২৫ জুন চালানটি আটক করে তদন্ত শুরু করা হয়।
বন্দরের ৩১ নম্বর পচনশীল পণ্যের শেড নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্য অনেক সময় একই শেডের বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে রাখা হয়। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে সেগুলো ধাপে ধাপে খালাস করা হয়।
গত ১২ মার্চ ৩৭ নম্বর শেডে ‘সাফা ইমপেক্সের’ বেকিং পাউডারের ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় শাড়ি ও থ্রি-পিস আত্মসাতের ঘটনা সামনে আসে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১০ জুন এ ঘটনায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে কাস্টমস। এর মাত্র পাঁচ দিন পর ২৬ নম্বর শেডে টি এস ইন্টারন্যাশনালের ইরেজার ও পেনসিল ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের ৩ হাজার ৩৮৫ পিস উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ করা হয়।
এর আগে ২৫ এপ্রিল রোকেয়া ট্রেডার্সের আমদানি করা আঙুরবোঝাই একটি ভারতীয় ট্রাকের ওজনেও অসঙ্গতি ধরা পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাকটির প্রকৃত খালি ওজন ছিল ১৩ হাজার ৩১০ কেজি, কিন্তু ওজন স্লিপে তা ১৩ হাজার ৮৮০ কেজি দেখানো হয়। সে সময় দায়িত্বে থাকা ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি অবশ্য দাবি করেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন ও যন্ত্রের কারিগরি ত্রুটির কারণেও এমন পার্থক্য হতে পারে।
জুন মাসে শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য পাচারের অভিযোগে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ চারটি পৃথক মামলায় অজ্ঞাতনামাসহ মোট ৫৪ জনকে আসামি করেছে। তাদের মধ্যে কাস্টমসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। এছাড়া ২৭ জুন কেমিক্যাল জোন থেকে ভারতীয় ট্রাকের পণ্য অবৈধভাবে বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তরের ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করেছে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, যে ঘটনায় মামলা হয়েছে সেখানে শেড ইনচার্জকে বাদ দেওয়া হয়েছে কেন, সেটিও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। শেডের ভেতর থেকে কীভাবে পণ্য বের হলো, তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, ওজন নির্ধারণে সামান্য অসঙ্গতিও সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্বে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পুরো ওজন ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ওজনযন্ত্রে কারচুপিসহ সব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেনাপোল কাস্টমের কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান বলেন, সরকারের এক টাকার রাজস্বও যাতে ফাঁকি না যায়, সে বিষয়ে কাস্টমস সর্বোচ্চ সতর্ক। ওজন স্কেলে কারচুপি, মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।
