
নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০২ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালুর চূড়া স্পর্শ করে ইতিহাস গড়েছেন পর্বতারোহী বাবর আলী। এর মধ্য দিয়ে আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পাঁচটি পর্বতশৃঙ্গ জয়ের বিরল কৃতিত্ব অর্জন করলেন এই বাংলাদেশি।
শনিবার (২ মে) বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার (২৭,৮৩৮ ফুট) উচ্চতার এই পর্বতের চূড়ায় ওঠেন তিনি। ‘এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই অভিযানের আয়োজক চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’।
ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের সভাপতি ফরহান জামান নেপালের আউটফিটার ‘মাকালু অ্যাডভেঞ্চার’-এর স্বত্বাধিকারী মোহন লামসালের বরাতে সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। চূড়ায় ওঠার সময় বাবরের সাথে ছিলেন আং কামি শেরপা। বাবরের এই অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ভিজ্যুয়াল নিটওয়্যারস লিমিটেড, সামুদা স্পেক-কেম লিমিটেড, মাই হেলথ, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন এবং রহমানস গ্রোসারিজ।
‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ বা ‘মহা-কালো’ খ্যাত এই চূড়া আরোহণের উদ্দেশ্যে বাবর গত ৭ এপ্রিল দেশ ছাড়েন। আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শেষে ৯ এপ্রিল তিনি বিমানে করে টুমলিংটার পৌঁছান এবং সেখান থেকে গাড়িতে সেদুয়া গ্রামে যান। এরপর পায়ে হেঁটে গত ১৮ এপ্রিল পর্বতের উচ্চতর বেসক্যাম্পে পৌঁছান তিনি।
উচ্চতার সাথে শরীরকে মানিয়ে নেয়ার জন্য ২১ এপ্রিল তিনি ক্যাম্প-১ এবং পরের দিন ক্যাম্প-২ তে রাত্রিযাপন করে ৭ হাজার মিটার উচ্চতা ছুঁয়ে বেসক্যাম্পে ফিরে আসেন। দ্বিতীয় দফায় ২৭ এপ্রিল তিনি আবারও পর্বতে চড়ে ক্যাম্প-২ এ এক দিন কাটিয়ে পরের দিন বেসক্যাম্পে নেমে আসেন। এরপর শুরু হয় অনুকূল আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা।
আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হলে বাবর আবারও পর্বতে চড়তে শুরু করেন। মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) সরাসরি ৬ হাজার ৬০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-২ এ উঠে যান তিনি। এরপর বুধবার (১ মে) ওঠেন ৭ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতার ক্যাম্প-৩ এ। সেখানে বিকেলটা পার করে মধ্যরাতে শিখরের উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত আরোহণ শুরু করেন বাবর। একটানা ১ হাজার ১০০ মিটারের বেশি ভয়ংকর চড়াই পার হয়ে শনিবার (২ মে) ভোরে মাকালুর শিখরে পৌঁছান তিনি।
অভিযানের ব্যবস্থাপক ফরহান জামান আশা প্রকাশ করেছেন যে, বাবর শনিবার ক্যাম্প-২ এ নেমে আসবেন এবং রোববার (৩ মে) নাগাদ বেসক্যাম্পে পৌঁছাবেন।
বাবর আলীর ট্রেকিংয়ের জগতে হাতেখড়ি হয় ২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে। এরপর ২০১৪ সাল থেকে তিনি পর্বতারোহণে যুক্ত হন। তিনি চট্টগ্রামের পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক। এই ক্লাবের হয়েই গত এক যুগ ধরে হিমালয়ের বিভিন্ন শিখরে অভিযান চালিয়ে আসছেন তিনি। ২০১৭ সালে ভারতের উত্তরকাশীর নেহেরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ নেন বাবর।
২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে হিমালয়ের অন্যতম দুর্গম ও টেকনিক্যাল চূড়া ‘আমা দাবলাম’ (২২,৩৪৯ ফুট) জয় করেন বাবর আলী। এরপর ২০২৪ সালে একই অভিযানে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (২৯,০৩৫ ফুট) এবং চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট লোৎসে (২৭,৯৪০ ফুট) আরোহণ করেন তিনি। একই অভিযানে দুটি আট হাজারি পর্বত জয়ের এমন কৃতিত্ব আর কোনো বাংলাদেশি পর্বতারোহীর নেই।
২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বত অন্নপূর্ণা-১ (২৬,৫৪৫ ফুট) জয় করেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি কৃত্রিম অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই আরোহণ করেন বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত মাউন্ট মানাসলু (২৬,৭৮১ ফুট)। এটি ছিল কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া কোনো বাংলাদেশির প্রথম আট হাজারি শিখর জয়। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার মাকালু জয় করলেন বাবর, যা আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ১৪টি পর্বত শিখর ছোঁয়ার স্বপ্নের পথে তার পঞ্চম বড় সাফল্য।
