শুক্রবার ১২ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাজেট নিয়ে আজ সংসদে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার ৫৪ বছরে বাজেটের মঞ্চে অর্থমন্ত্রীদের আলোচিত যত বক্তব্য বিরোধী দলের এলাকাতেও সমান উন্নয়ন হবে : প্রধানমন্ত্রী ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির ঘটনা সশস্ত্র বাহিনীর ওপর বড় আঘাত ছিল: প্রধানমন্ত্রী জর্ডানের ঘাঁটিতে মিসাইল আঘাত হানার দাবি ইরানের ‘মাতৃভাষা কি বাদ দেওয়া যেতে পারে?’ কোর্স বন্ধের খবর উড়িয়ে দিলেন মন্ত্রী সিটি কর্পোরেশনের পর এবার বগুড়ায় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, আইনের খসড়া তৈরি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে বাস, নিহত ৪ সীমান্ত হত্যা-পুশ-ইন ইস্যুতে নয়াদিল্লিকে বার্তা দেবে বিজিবি
Advertise with us

কক্সবাজারে যে উপায়ে হচ্ছে বিষমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর শুঁটকির উৎপাদন

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৮ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

কক্সবাজারে যে উপায়ে হচ্ছে বিষমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর শুঁটকির উৎপাদন

বাজারে পাওয়া যাওয়া অধিকাংশ শুঁটকিতে রয়েছে কীটনাশকসহ নানা ধরনের রাসায়নিক। এ কারণে নিরাপদ শুঁটকি খুঁজতে অনেককেই গলদঘর্ম হতে হয়। কক্সবাজার উপকূলে প্রতিবছর প্রায় ৬০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদিত হলেও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ ছাড়া অনেক শুঁটকিতে রাসায়নিকের অস্তিত্বও পাওয়া যায়। তবে কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালি আহরণ কেন্দ্রের পরমাণু গবেষকেরা নিরাপদ শুঁটকি উৎপাদনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। সোনাদিয়া দ্বীপে বাণিজ্যিকভাবে এমন শুঁটকি উৎপাদনে সাফল্যও এসেছে।

শুঁটকির মূল শত্রু হিসেবে ‘ব্লোফাই’(নীলচে সবুজ মাছি) নামের একধরনের মাছিকে চিহ্নিত করেছেন পরমাণু গবেষকেরা। মাছ শুকানোর সময় এই মাছি মাছের গায়ে ডিম পাড়ে। এর লার্ভা মাছের ভেতরের অংশ খেয়ে বড় হয়; আর লার্ভার কবল থেকে শুটকি বাঁচাতে তাতে দেওয়া হয় কীটনাশক। কক্সবাজারের গবেষকেরা একটি বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে গামা রশ্মি প্রয়োগ করে পুরুষ মাছিকে বন্ধ্যা করেছেন। এসব বন্ধ্যা মাছি স্ত্রী মাছির সঙ্গে মিলিত হলেও কোনো ডিম হয় না। ফলে মাছি আর ডিম পাড়তে পারে না। এতে মাছির বংশও যেমন কমে যায়, তেমনি শুঁটকিতে ডিম পাড়ার ভয়ও থাকে না। শুঁটকি হয় সম্পূর্ণ নিরাপদ।

মাছি বন্ধ্যা করতে ১০ কোটি টাকার যন্ত্র

কক্সবাজার শহরের একটি সুরক্ষিত ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে স্থাপন করা হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক এক যন্ত্র। নাম ‘গামা সোর্স বা কোবাল্ট-৬০’। পরমাণু প্রযুক্তির এই মূল্যবান যন্ত্রের দাম প্রায় ১০ কোটি টাকা। সারা দেশে এমন যন্ত্র আছে মাত্র দুটি।

পরমাণু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই যন্ত্রের প্রধান কাজ হলো ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত ক্ষতিকর ‘ব্লোফ্লাই’ (নীল মাছি) পুরুষ মাছিকে গামা রশ্মির সংস্পর্শে এনে প্রজননক্ষমতা নষ্ট বা বন্ধ্যা করা। এই বন্ধ্যা মাছির মাধ্যমে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন সম্ভব।

পরমাণু বিজ্ঞানীদের মতে, উচ্চপ্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব এই কোবাল্ট-৬০ মেশিনটি সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে প্রতিবছর শতকোটি টাকার খাদ্যশস্য অপচয় রোধ এবং মানসম্মত শুঁটকি রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

যেভাবে চলে মাছি বন্ধ্যাকরণের প্রক্রিয়া

‘ব্লোফ্লাই’ বা নীল-সবুজ রঙের মাছিগুলো সাধারণ ঘরের মাছির চেয়ে আকারে বড় ও চকচকে হয়। এরা প্রধানত পচা মাছ-মাংস বা আবর্জনায় ডিম পাড়ে। কক্সবাজার সৈকতের খনিজ বালু আহরণ কেন্দ্রের অভ্যন্তরে ল্যাবরেটরিতে এই মেশিনের মাধ্যমে মাছি বন্ধ্যাকরণের কাজ চলছে।

প্রকল্পের পরিচালক ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মোশাররফ হোসেন জানান, ১০ কোটি টাকার এই মেশিন ল্যাবে স্থাপন করা হয় ২০১৮ সালে। ২০০১ সাল থেকে সোনাদিয়া দ্বীপে বন্ধ্যা মাছি ছেড়ে গবেষণা শুরু হয়েছিল। ২০২১ সালে ৫ লাখ বন্ধ্যা মাছি ছেড়ে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এরপর তিন বছরে সোনাদিয়ায় অন্তত ৯০ লাখ বন্ধ্যা মাছি ছাড়া হয়েছে এবং বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনে অভূতপূর্ব সফলতা এসেছে। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তহবিলসংকটে এই কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের খাদ্য ও বিকিরণ জীববিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বিকিরণ কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. এ টি এম ফয়েজুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি বলেন, মাঠের মাছি গবেষণাগারে এনে কৃত্রিম উপায়ে লাখ লাখ মাছি উৎপাদন করা হয়। মাছির মূককীট (পিউপা) দশায় নির্দিষ্ট মাত্রায় গামা রশ্মি বা রেডিয়েশন দিলে তাদের প্রজনন অঙ্গ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং তারা বন্ধ্যা হয়ে যায়। এই বন্ধ্যা পুরুষ মাছিগুলো শুঁটকিপল্লিতে ছেড়ে দিলে তারা মাঠের স্বাভাবিক স্ত্রী মাছির সঙ্গে প্রজনন করে; কিন্তু বন্ধ্যা হওয়ার কারণে স্ত্রী মাছির ডিমগুলো নিষিক্ত হয় না। ফলে নতুন করে আর লার্ভা জন্মায় না এবং প্রাকৃতিকভাবেই মাছির সংখ্যা কমে যায়।

শুঁটকিতে বিষ ছড়ানোর নেপথ্যে

সাধারণত কাঁচা মাছ রোদে শুকানোর সময় মাছি মাছের ফুলকা ও ভেজা অংশে ডিম পাড়ে। ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়ে মাছ খাওয়া শুরু করে। ৩-৪ দিন পর এগুলো মূককীটে রূপান্তরিত হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মাছি হয়ে আবার প্রজনন ঘটায়।

এই লার্ভার আক্রমণ থেকে শুঁটকি বাঁচাতে উৎপাদনকারীরা কাঁচা মাছে ক্ষতিকর ও বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করেন। এই বিষাক্ত শুঁটকি খাওয়ার ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় এবং ক্যানসার, লিভার, কিডনি ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। এমনকি গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত বা বিকলাঙ্গ শিশু জন্মের আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া শুঁটকি মহালের শ্রমিকেরা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এই বিষাক্ত কীটনাশক শরীরে গ্রহণ করায় দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।

পরমাণু বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বলা হয়, দেশে উৎপাদিত মাছের ১৫ শতাংশ শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। কিন্তু মাছির আক্রমণে প্রায় ৬০ শতাংশ শুঁটকি খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

খাদ্যশস্যের সুরক্ষা ও জীবাণুমুক্তকরণ

গামা সোর্স মেশিনের রেডিয়েশন প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু শুঁটকি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি খাদ্য সুরক্ষায় এক বৈপ্লবিক সমাধান। পরমাণু বিজ্ঞানী মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, গুদামজাত ধান, চাল বা ডালে ‘উইভিল’ বা ঘুণপোকা আক্রমণ করলে অল্প মাত্রার রেডিয়েশন দিয়ে পোকা ও তাদের ডিম সম্পূর্ণ ধ্বংস করা যায়। এতে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক (যেমন ফসফিন ট্যাবলেট) ব্যবহার করতে হয় না। তা ছাড়া আটা-ময়দা বা গুঁড়া মসলায় (মরিচ, হলুদ, ধনে) আর্দ্রতার কারণে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া বা সালমোনেলা জন্মাতে পারে। গামা রশ্মি এগুলোকে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত করে দীর্ঘকাল সতেজ রাখে। একইভাবে আলু বা পেঁয়াজে নির্দিষ্ট মাত্রায় রেডিয়েশন দিলে তা থেকে আর নতুন কুঁড়ি বা গাছ বের হয় না, ফলে এগুলো দীর্ঘদিন ভালো থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যসামগ্রী ও শুঁটকি রপ্তানি করতে হলে এই মেশিনের মাধ্যমে মান যাচাই বাধ্যতামূলক।

১০ কোটি টাকার যন্ত্রটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তেজস্ক্রিয়তা রোধে এটিকে কয়েক ফুট পুরু কংক্রিট ও সিসার তৈরি বিশেষ কক্ষে রাখা হয়েছে এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের দক্ষ বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের মাধ্যমে এর সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল শুক্কুর বলেন, এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক প্রসার ঘটানো গেলে দেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য—উভয় ক্ষেত্রেই এক বিশাল পরিবর্তন আসবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়