মঙ্গলবার ১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

দিল্লিতে উপদেষ্টাকে হেনস্থা, সম্পর্কে অস্বস্তি, প্রতিবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

দিল্লিতে উপদেষ্টাকে হেনস্থা, সম্পর্কে অস্বস্তি, প্রতিবাদ

দিল্লি বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাকে। পরে প্রবেশের অনুমতি পেলেও ঢাকায় ফেরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের দিল্লি সফরের বিষয়টি অন্তত দুই দিন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল বাংলাদেশ। এরপরও গত রোববার দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হয়। শুরুতে ভারতে প্রবেশের অনুমতিও দেওয়া হয়নি। পরে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে ঢাকায় ফিরে আসেন।

পূর্বনির্ধারিত সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার এমন পরিস্থিতির মুখে পড়ার ঘটনায় গতকাল সোমবার ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। এ সময় দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তীব্র অসন্তোষ জানানো হয়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ইতিবাচক পথে এগোনোর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাতে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করেছে। সীমান্তে বিএসএফের ‘পুশ ইন’ চেষ্টার পর এবার প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে দিল্লি বিমানবন্দরে আটকে রাখার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।

সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে জানায়, দিল্লিতে ভারত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট আইওআরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা ছিল জাহেদ উর রহমানের। ওই বৈঠকের ফাঁকে ভারতের রাজনৈতিক ও সরকারি পর্যায়ে তাঁর কয়েকটি বৈঠকের সূচিও নির্ধারিত ছিল।

সূত্রগুলো জানায়, আগামী দু-এক মাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের আয়োজন করা যায় কি না তা নিয়ে আলোচনার জন্য ওই বৈঠকগুলো ঠিক হয়েছিল। ফলে দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনাকে শুধু ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত জটিলতা হিসেবে দেখছে না ঢাকার কূটনৈতিক মহল।

ভারতের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দিল্লি বিমানবন্দরে যাচাই (স্ক্রিনিং) প্রক্রিয়ার সময় জাহেদ উর রহমানের নাম নজরদারি তালিকায় উঠে আসার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হয়।

ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব

ঢাকায় ভারতে ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ানকুমার বাধেকে গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তলব করে। এ দিন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় তাঁকে ডেকে পাঠান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া অণু বিভাগ) ইশরাত জাহান। তলবের সময় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে গত রোববার দিল্লির বিমানবন্দরে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, দিল্লির ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। এর আগে তিনি ঘটনাটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ও ‘দুঃখজনক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছিলেন, এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামও সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার সঙ্গে যা হয়েছে, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

উপদেষ্টার সফর নিয়ে চিঠি ও ফোনালাপ

গত শুক্রবার দুপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে জানায় যে, আইওআরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠকে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।

সূত্র জানায়, ওই দিন বিকেলে বাংলাদেশ হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ ফোনে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বি শ্যামের সঙ্গে। ফোনালাপের সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাহেদ উর রহমান বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি। এ সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে জানান আরও একাধিক উপমন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রীও আইওরারের বৈঠকে প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সবুজ পাসপোর্টধারী ছিলেন। ঢাকায় সময়ের স্বল্পতার কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁকে দিল্লি ভ্রমণের জন্য সার্ক ভিসা অব্যাহতি স্টিকার দিয়েছিল।

যা ঘটেছিল ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে

গত রোববার বিকেল পাঁচটার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান ঢাকা থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে নামার পর তাঁকে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ অভ্যর্থনা জানান এবং ইমিগ্রেশন ডেস্কে নিয়ে যান।

একপর্যায়ে হাইকমিশনার লক্ষ করেন, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার ব্যক্তিগত বৃত্তান্ত কম্পিউটার স্ক্রিনে খুব মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করছেন, কিন্তু কিছু বলছেন না। প্রায় ১৫ মিনিট কেটে যাওয়ার পর বাংলাদেশের হাইকমিশনার তাঁর কাছে জানতে চান, ‘কোনো সমস্যা আছে কি?’ কিন্তু নীরব থাকেন ওই কর্মকর্তা।

এর কিছুক্ষণ পর ওই কর্মকর্তা জাহেদ উর রহমানের জন্মস্থান কোথায়, এর আগে ভারত সফর করেছিলেন কি না তা জানতে চান। এরপর ডেস্ক থেকে উঠে ওই কর্মকর্তা ভেতরে যান। ফিরে এসে তিনি জাহেদ উর রহমানের আঙুলের ছাপ এবং আইরিশ স্ক্যান নেন।

কিছুক্ষণ পর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে বলেন: আপনি সোফায় গিয়ে বসুন। কিছুটা সময় লাগবে।

দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পর এমন কালক্ষেপণ দেখে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কয়েক দফা তাদের মধ্যে ফোনে কথা হয়। একপর্যায়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে জানানো হয়, ভারতের ইমিগ্রেশন বিভাগের নথিতে জাহেদ উর রহমানকে বারড বা ওয়াচলিস্টে দেখানো হচ্ছে। এমন অবমাননাকর পরিস্থিতির পর ঢাকায় সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মহলে যোগাযোগ করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করে উপদেষ্টা দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।

তখন বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা ভারতীয় ইমিগ্রেশন থেকে পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার কথা বলেন। তখন ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, জাহেদ উর রহমানের ছাড়পত্র হয়ে গেছে এবং তিনি প্রবেশ করতে পারেন। দিল্লির বিমানবন্দরে এই পরিস্থিতির সময় ইমিগ্রেশনে বিভিন্ন দেশের যাত্রীদের সঙ্গে বাংলাদেশের যাত্রীরা ওই ঘটনার সাক্ষ্য হয়েছেন।

সংসদে বিবৃতির দাবি জামায়াতের

জাহেদ উর রহমানকে দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দাবি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান। গতকাল পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাকে ভারতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তিনি যতটুকু জেনেছেন, যথাযথ কূটনৈতিক চিঠি দেওয়ার পরও তথ্য উপদেষ্টাকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। শেষ পর্যন্ত অনুমতি দেওয়া হলেও তথ্য উপদেষ্টা ফিরে এসেছেন। তিনি জানতে চান, এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ব্যর্থতা কী। এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি ৩০০ বিধিতে জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেন।

তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিষয়টি পয়েন্ট অব অর্ডার নয়; এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হলে তা বিবেচনা করা হবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়