
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

দেশের বিভিন্ন রুটে নতুন রেলপথ নির্মিত হলেও তীব্র কোচ ও লোকোমোটিভ সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ সেকশনে মেয়াদোত্তীর্ণ ও জরাজীর্ণ পুরোনো কোচ এবং ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের কারণে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে যাতায়াত করছেন হাজারো যাত্রী। একদিকে টয়লেটের অব্যবস্থাপনা, ছেঁড়া আসন ও জোড়াতালির সংস্কার, অন্যদিকে মন্থর গতি, এমন নিম্নমানের সেবা সত্ত্বেও যাত্রীদের কাছ থেকে নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে পূর্ণ ভাড়া।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা এই নিরাপত্তাহীন সেবাকে যাত্রীদের সঙ্গে স্পষ্ট অন্যায় হিসেবে আখ্যা দিলেও রেল কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের দাবি, নতুন কোচ সংগ্রহ সময়সাপেক্ষ হওয়ায় আপাতত মেরামত ও সংস্কারের মাধ্যমেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
গত রোববার দেশের প্রধান রেলওয়ে স্টেশন ‘ঢাকা কমলাপুর’ সরেজমিনে ঘুরে ময়মনসিংহ সেকশনের তারাকান্দিগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসে দেখা গেছে চরম অব্যবস্থাপনা ও জরাজীর্ণতার চিত্র। ট্রেনটির এক কোচ থেকে অন্য কোচে বিদ্যুৎ সরবরাহের সংযোগস্থলে প্লাগের পরিবর্তে বাঁশের কাঠি দিয়ে বিপজ্জনকভাবে তার আটকে রাখা হয়েছে। এছাড়া, কোচগুলোর মধ্যবর্তী যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত লোহার পাটাতনের দুটি হুকের একটি ভাঙা অবস্থায় দেখা গেছে, যা চলন্ত ট্রেনে যাতায়াতকারী যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, ডাইনিং কারের (খাবার গাড়ি) টেবিলগুলো যাত্রী ও তাদের মালপত্রের দখলে চলে গেছে। টয়লেটগুলো থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের ব্যবহার ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে কোচের আসনগুলোর কাভার ছিঁড়ে গেছে, যা কোনোমতে হাতে সেলাই করে এবং ধাতব অংশগুলো ঝালাই করে জোড়াতালি দিয়ে চলাচলের উপযোগী রাখা হয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, এটি সাময়িক কোনো চিত্র নয়; বরং বছরের পর বছর ধরে এই রুটটিতে এভাবেই লক্কড়ঝক্কড় সেবা চলছে। ট্রেনে ভ্রমণের যে আনন্দ, এমন জরাজীর্ণ কোচে ওঠার পর তা নিমিষেই ক্ষোভে পরিণত হয়। ফলে পুরো ভাড়া পরিশোধ করেও যাত্রীরা ন্যূনতম আরাম ও নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরিষাবাড়ীগামী যাত্রী তরিকুল ইসলাম বলেন, গত মাসে যমুনা এক্সপ্রেসে বাড়ি যাচ্ছিলাম। ট্রেনে উঠে দেখি, আমাদের জন্য বরাদ্দ দুটি সিটের কাভার ছেঁড়া থাকায় হাত দিয়ে সেলাই করে ব্যবহারোপযোগী করা হয়েছে। সিটে বসার পর দেখতে পেলাম, সিট ঝালাই করে ঠিক রাখা হয়েছে। সিটের জায়গা ছোট। সামনে ভালোভাবে বসা যায় না, আবার পেছনেও হেলান দেওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে ময়মনসিংহ রুটের রেললাইনও খারাপ। পথে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেয়। গফরগাঁও পর্যন্ত যেতে কোমরে ব্যথা অনুভব করি। সরিষাবাড়ী স্টেশনে নামার পর ব্যথার তীব্রতা আরও বাড়ে। পরদিন ডাক্তার দেখালে তিনি জানান, মেরুদণ্ডের একটি ডিস্ক হালকা সরে গেছে। এরপর কয়েকদিন বেড রেস্টে থাকার পর কিছুটা সুস্থ হই।
এই যাত্রী বলেন, বছরের পর বছর ধরে আমাদের রুটের ট্রেনের এমন দুর্বিষহ অবস্থা দেখে আসছি। দেশের অন্য রুটে ভালো ভালো কোচের ট্রেন চললেও আমাদের দিকে রেলওয়ের কোনো নজর নেই। অথচ আমরাও তো অন্যান্য রুটের যাত্রীদের মতো পুরো ভাড়া দিয়েই টিকিট কাটি।
আরেক যাত্রী জাহিদ আহসান বলেন, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম রুটে কত আধুনিক ও দ্রুতগতির ট্রেন চলে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের রুটে সেই লক্কড়ঝক্কড় কোচই দেখে আসছি। ট্রেনে উঠলেই দুর্গন্ধে ভরা পরিবেশ। কখনও ফ্যান নষ্ট থাকে, কখনও টয়লেটে পানি থাকে না। খাবার গাড়িতে খাবারের চেয়ে মানুষই বেশি থাকে। টাকা দিয়ে টিকিট কেটে যাত্রীসেবা আমরা কী পাই, তা ঠিক জানি না।
তিনি বলেন, ময়মনসিংহ রুটে ট্রেনের চাকা লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনাও বেশি ঘটে। রেলপথের অবস্থাও খুবই নড়বড়ে। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই পথে ট্রেনও চলে আস্তে আস্তে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ সেকশনের একাধিক লোকোমাস্টার জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন ও পুরোনো কোচের কারণে ময়মনসিংহ সেকশনে আমাদের ট্রেনের গতি কমিয়ে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জয়দেবপুর থেকে আউলিয়ানগর পর্যন্ত ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, আউলিয়ানগর থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৫০ কিলোমিটার, ময়মনসিংহ থেকে জামালপুর পর্যন্ত ৬২ কিলোমিটার এবং জামালপুর থেকে সরিষাবাড়ী পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চালানো হয়।
তারা আরও জানান, শুধু তাই নয়, এই সেকশনের অনেক ইঞ্জিনের ৪টি মোটরের মধ্যে কোনোটির ১-২টি মোটর কাটা থাকে। ফলে ইঞ্জিনেও শক্তি পায় না। অথচ সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ৭০-৮০ কিলোমিটার বেগে অনায়াসে ট্রেন চালানো যেত।
টিকিটে যাত্রীরা যেসব সেবা পান
রেলওয়ের দায়িত্বশীল এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে ঢাকা পোস্টের প্রশ্ন ছিল, একজন যাত্রী একটি আসনের টিকিট কেনার পর রেলওয়ের কাছ থেকে কী কী সুবিধা পাওয়ার কথা?
জবাবে তিনি বলেন, রেলওয়ের দৃষ্টিতে একজন টিকিটধারী ব্যক্তি ‘সম্মানিত যাত্রী’, আর টিকিটবিহীন ব্যক্তি ‘অনুপ্রবেশকারী’। একজন টিকিটধারী যাত্রী স্টেশন এলাকায় অন্তত সাতটি এবং ট্রেনের ভেতরে অন্তত ছয় ধরনের সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
তিনি বলেন, স্টেশন এলাকায় যাত্রীরা ওয়েটিং রুম, নামাজঘর, তথ্যকেন্দ্র, নিরাপত্তা সেবা, কুলি সেবা, হুইলচেয়ার সুবিধা এবং বিশুদ্ধ খাবার পানির সুবিধা পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে ট্রেনের ভেতরে যাতায়াতের পাশাপাশি ক্যাটারিং সেবা, অ্যাটেনডেন্ট সুবিধা, এসি অপারেটর সেবা, গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) সহায়তা, নামাজঘর এবং টয়লেট সুবিধা পাওয়ার কথা।
তিনি আরও জানান, টয়লেট সুবিধার আওতায় সাধারণত সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ, টিস্যু এবং এয়ার ফ্রেশনার সরবরাহ করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব সামগ্রী চুরি হয়ে যায়। ফলে ট্রেন ছাড়ার পর শুরুতে কিছু যাত্রী এসব সুবিধা পেলেও পরে সেগুলো আর অবশিষ্ট থাকে না। রেলওয়ে নিয়মিতভাবে এসব উপকরণ সরবরাহ করে, কিন্তু অনেক সময় যাত্রীরা সেগুলো সঙ্গে নিয়ে চলে যান। ফলে পরবর্তী যাত্রীরা আর সুবিধাগুলো পান না। এই জায়গায় যাত্রীদের মানসিকতারও উন্নতি প্রয়োজন।
পুরোনো কোচে যাত্রীসেবা দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, নতুন কোচ পেতে আমাদের দেরি হবে। মিটারগেজ কোচ আনার পরিকল্পনা আছে, কিন্তু আপাতত পাইপলাইনে নেই। আমাদের ৫০০টি মিটারগেজ কোচ কেনার পরিকল্পনা আছে। অনুমোদন এবং অর্থায়ন নিশ্চিত হলে আমরা প্রজেক্টগুলো নেব। সেগুলো পেলে আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুরোনো কোচ পাল্টে দেব।
তিনি আরও বলেন, কোচ আমদানিতে সময় লাগবে বিবেচনায় আপাতত বিদ্যমান কোচগুলো সংস্কার ও নবায়নের মাধ্যমে সেবার মান উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাহাড়তলী ওয়ার্কশপে কিছু কোচ পুনর্বাসন (রিহ্যাবিলিটেশন) করার পরিকল্পনা রয়েছে। নিয়মিত মেরামত কার্যক্রমের পাশাপাশি এসব কোচে নতুন আসন স্থাপন, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য উন্নয়নকাজ করা হবে। বিশেষ বরাদ্দ পাওয়া গেলে এ কার্যক্রম আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক বলেন, নতুন কোচ সংগ্রহ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাই নতুন কোচ হাতে আসার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান কোচগুলো সংস্কার করে সেবায় রাখার বিকল্প নেই। রেলওয়ের বিভিন্ন ওয়ার্কশপে কোচ সংস্কার ও মেরামতের একাধিক প্রকল্প চলমান রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রায় ৫০টি কোচ সংস্কার ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে যাত্রীদের জন্য তুলনামূলক উন্নত সেবা নিশ্চিত করা যায়।
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, গত ১৫ বছরে দেশে অনেক নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সেই রেলপথগুলোর তুলনায় প্রয়োজনীয় কোচ, ক্যারেজ ও লোকোমোটিভ সংগ্রহে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে বর্তমানে বিশেষ করে মিটারগেজ অঞ্চলে লোকোমোটিভ ও কোচের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ব্রডগেজ অঞ্চলে আমরা কিছুটা হলেও চাহিদার কাছাকাছি যেতে পারি, কিন্তু মিটারগেজে লোকোমোটিভ ও ক্যারেজের বড় ধরনের স্বল্পতা রয়েছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ঈদের সময়। স্বাভাবিক সময়েই যেখানে সংকট থাকে, সেখানে ঈদে যাত্রীচাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেলে চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। তখন নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করেছি। ভবিষ্যতে নতুন কোনো রেলপথ নির্মাণ বা সম্প্রসারণ প্রকল্প নেওয়া হলে শুধু ট্র্যাক নির্মাণ নয়, একই প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ সংগ্রহের ব্যবস্থাও রাখতে হবে, যাতে রেলপথ নির্মাণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবা দেওয়া সম্ভব হয়।
সংকট নিরসনে রেলওয়ের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিটারগেজ ও ব্রডগেজ মিলিয়ে প্রায় ৬০টি নতুন লোকোমোটিভ এবং কয়েকশ কোচ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এগুলো টেন্ডার ও ক্রয় প্রক্রিয়ার কারণে সময়সাপেক্ষ। বাস্তবে হাতে পেতে অন্তত তিন বছরের মতো সময় লাগবে। তারপরও আমরা প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ ও ক্যারেজের চাহিদা চিহ্নিত করে কাজ শুরু করেছি, যাতে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি, দুই ধরনের সংকটই ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা যায়।
ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন রুটের পুরোনো কোচ, ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ ও দুর্বল যাত্রীসেবা প্রসঙ্গে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এসব বিষয়ে কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। রেল একটি গণপরিবহন ও সেবামূলক খাত। যাত্রীদের ন্যূনতম নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অনেক রুটে রেলপথের অবস্থা দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পুরোনো কোচ, অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ও নিম্নমানের সেবার কারণে যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অথচ তারা পূর্ণ ভাড়াই পরিশোধ করছেন।
তিনি বলেন, নিরাপত্তাহীন ও নিম্নমানের সেবা দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে পূর্ণ ভাড়া নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি যাত্রীদের সঙ্গে অন্যায় এবং রেলসেবার ক্ষেত্রে একটি গুরুতর ব্যর্থতা। রেলকে নিরাপদ, আরামদায়ক ও যাত্রীবান্ধব করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
