
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ০১ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় ৪৯ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সার্বিক উৎপাদন সন্তোষজনক বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সরকারি মজুত শক্তিশালী রাখতে এ মৌসুমে ১৮ লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। বন্যাকবলিত এলাকায় আগাম সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু, কৃষক নিবন্ধনের সময় বৃদ্ধি, অভিযোগ গ্রহণে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু এবং ঈদুল আজহার ছুটিতেও মাঠ প্রশাসন সচল রাখাসহ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
খাদ্য ও কৃষিসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দেশের সরকারি খাদ্যশস্য মজুতের প্রধান ভিত্তি হলো বোরো ধান। চলতি মৌসুমে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ হাওরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সরকারি হিসাবে প্রায় ৪৯ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, যা সংশ্লিষ্ট এলাকার মোট আবাদি জমির প্রায় ১১ শতাংশ। এতে চালের হিসাবে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার টন উৎপাদন ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া দেশের আরও কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বোরো সংগ্রহ কর্মসূচির আওতায় সরকার ৫ লাখ টন ধান, ১২ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ১ লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি ৫০ হাজার টন গম কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে। সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা।
সূত্র জানায়, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, বাজার স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বৃহৎ সংগ্রহ কর্মসূচি। ফলে মাঠ প্রশাসনের সক্রিয়তা, কৃষকদের অংশগ্রহণ এবং গুদাম ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপর কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দিতে সরকার পূর্বনির্ধারিত সময়ের আগেই ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু করে। যেখানে সারা দেশে চাল সংগ্রহ ১৫ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে ৩ মে থেকেই ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চালু করে সরকার। এতে কৃষকরা দ্রুত উৎপাদিত ফসল বিক্রির সুযোগ পেয়েছেন এবং বাজারে সরবরাহজনিত চাপও কমেছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সরকারি সংগ্রহের পরিমাণ কয়েক লাখ টনে পৌঁছেছে। পাশাপাশি চাল সংগ্রহের গতি তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক। তবে ধান সংগ্রহ আরও বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংগ্রহ কার্যক্রমে কৃষকদের সম্পৃক্ত করতে ‘কৃষকের অ্যাপ’-এর মাধ্যমে নিবন্ধন ও আবেদন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কিন্তু অনেক কৃষক এখনো ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি অভ্যস্ত না হওয়ায় নিবন্ধনের সময়সীমা ৫ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ম্যানুয়াল ব্যবস্থাও চালু রাখা হয়েছে, যাতে কোনো কৃষক ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো কৃষক ধান নিয়ে এলে তা গ্রহণে জটিলতা তৈরি না করারও নির্দেশ রয়েছে। এতে কৃষকরা সরকারি দামে ধান বিক্রিতে উৎসাহিত হচ্ছেন।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে খাদ্য অধিদপ্তরে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সংগ্রহ কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য সমন্বয় এবং মাঠ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। ফলে কোনো অনিয়ম বা সমস্যার তথ্য দ্রুত কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটির মধ্যেও সংগ্রহ কার্যক্রম সচল রাখতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দিয়েছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ধান-চাল সংগ্রহ, ওএমএস কার্যক্রম, আমদানি করা খাদ্যশস্য দ্রুত খালাস ও পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তর (সংগ্রহ বিভাগ) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে। চাল, গম ও ধান মিলিয়ে মজুতের পরিমাণ ১৭ লাখ টনেরও বেশি। এ ছাড়া আমদানির লক্ষ্যে পাইপলাইনে থাকা খাদ্যশস্য বিদ্যমান মজুতের সঙ্গে যুক্ত হলে খাদ্যনিরাপত্তা কার্যক্রম আরও জোরদার হবে। এতে বোরো উৎপাদনে আঞ্চলিক ক্ষয়ক্ষতি হলেও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো শঙ্কা থাকবে না বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, হাওরাঞ্চলে ক্ষতি হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ভালো ফলন হওয়ায় সার্বিক বোরো উৎপাদন সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। কৃষকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, নিবিড় তদারকি এবং প্রশাসনিক সমন্বয় অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ১৮ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
