
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ১০ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ফুটবলের মাঠে জার্মানদের শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তা, কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা বরাবরই ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে। তবে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির জন্য সময়টা বেশ খারাপই যাচ্ছে।
ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে দাপটের সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর গত দুই আসরে প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়েছে ইউরোপের এই পরাশক্তি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ আটবার ফাইনাল খেলা জার্মানি এর আগে ১৯৩৮ সালেও প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৫৪ সালে সে যুগের সেরা দল হাঙ্গেরিকে ফাইনালে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় জার্মানি। এর ২০ বছর পর নেদারল্যান্ডসকে পরাজিত করে আধুনিক টোটাল ফুটবলের অন্যতম পথিকৃৎ সেই দেশ আরেকটি বিশ্বকাপ জেতে।
ফলে, জার্মান সমর্থকেরা আশা করবেন যে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে জার্মানি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আর এই ঘুরে দাঁড়ানোর নেতৃত্বে থাকবেন ৩৯ বছর বয়সী কোচ হুলিয়ান নাগেলসম্যান।
বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে একাধিক লিগ জেতা নাগেলসম্যানকে ইউরোপের অন্যতম কোচিং প্রতিভা হিসেবে ধরা হয়। অল্প বয়স থেকেই তিনি আধুনিক জার্মান ফুটবল দর্শনের একজন মনোযোগী ছাত্র। তার কৌশলের মূল ভিত্তি হলো হাই প্রেসিং, কৌশলগত নমনীয়তা, অবস্থানগত ফ্লুইডিটি এবং আক্রমণাত্মক কাউন্টার-প্রেসিং। ফলে জার্মানি দলটি এখন আধুনিক বুন্দেসলিগার তীব্রতা ও পজিশনাল ফুটবলের একটি সফল হাইব্রিড।
এই তীব্র গতিসম্পন্ন এবং বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবল খেলার জন্য দরকার গতি ও ম্যাচ পড়তে পারার ক্ষমতা। নাগেলসম্যান ও জার্মানির জন্য সৌভাগ্য যে, তাদের দলে রয়েছেন দুই তরুণ প্রতিভা, যারা এই কাজটি করতে সক্ষম। জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান ভির্টজ কেবল দুইজন বিশ্বসেরা ফুটবলারই নন, তাদের মধ্যে রসায়নও দারুণ। নাগেলসম্যান চাইবেন, এই দুজনকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখে একটি পরাক্রমশালী দল গড়ে তুলতে।
নাগেলসম্যানের জার্মানি কোনো নির্দিষ্ট ফর্মেশনে আটকে থাকে না। তারা মূলত ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ ছকে খেলে, কিন্তু খেলার প্রবাহ অনুসারে সহজেই ৩-৪-২-১ বা ৩-২-৫-এ রূপান্তরিত হয়।
পজেশন থাকাকালীন ফুলব্যাকরা ওপরে উঠে যান, মিডফিল্ডাররা গতিশীলভাবে অবস্থান পরিবর্তন করেন, মুসিয়ালা ও ভির্টজ ভেতরের দিকে ড্রিফট করেন এবং স্ট্রাইকার প্রায়ই নিচে নেমে লিংক-আপ খেলেন। এই ফ্লুইডিটি জার্মানির আক্রমণকে বহুমাত্রিক করে তুলেছে।
পজেশন হারানোর পর দলটি দ্রুত কমপ্যাক্ট হয়ে ওঠে এবং হাই প্রেসিংয়ের মাধ্যমে বল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। এই কাউন্টার-প্রেসিং তাদের আক্রমণাত্মক দর্শনের মূল চালিকাশক্তি।
তবে জার্মানির আক্রমণভাগ সম্ভাবনাময় হলেও পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়। নাগেলসম্যান দ্রুত ট্রানজিশন এবং পজিশনাল ফ্লুইডিটির ওপর জোর দিয়েছেন। ফলে দলটি ছোট পাসিং কম্বিনেশন, ওয়ান-টু খেলা এবং লাইনের মাঝের সৃজনশীলতায় দক্ষ। তবে স্ট্রাইকার সমস্যা এখনও অমীমাংসিত।
কাই হাভার্টজের মুভমেন্ট ও লিংক-আপ ভালো, কিন্তু পেনাল্টি বক্সে ফিনিশিংয়ের ঘাটতি রয়েছে। ডেনিজ উন্ডাভ শক্তিশালী শারীরিক উপস্থিতি দিতে পারেন। ডর্টমুন্ডের তরুণ স্ট্রাইকার ম্যাক্সিমিলিয়ান বেয়ার এবং নিউক্যাসলের নিক ওল্টেমাডে নাগেলসম্যানের ফ্লুইড দর্শনের সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন, তা দেখার বিষয়।
জার্মানির রক্ষণাত্মক কৌশলও উচ্চ ঝুঁকির ওপর নির্মিত। অ্যান্টোনিও রুডিগার, জোনাথন তাহ ও নিকো শ্লটারবেকের মতো সেন্টার-ব্যাকরা আগ্রাসন, এরিয়াল ডুয়েল এবং বল বিল্ড-আপে দক্ষ। কিন্তু ট্রানজিশন ডিফেন্স তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। হাই প্রেসিং করতে গিয়ে পেছনে অনেক ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। দ্রুতগতির উইঙ্গার ও ফরোয়ার্ডসমৃদ্ধ দলগুলো এই স্পেস সহজেই কাজে লাগাতে পারে।
ফুলব্যাকদের আক্রমণাত্মক ভূমিকা আরও ঝুঁকি বাড়ায়। জোশুয়া কিমিখের হাইব্রিড রোল আক্রমণকে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু রক্ষণাত্মক ভারসাম্য নষ্ট করে। আর জার্মানির জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে গোলকিপিং। দিনের পর দিন দলের ভরসার প্রতীক ম্যানুয়েল নয়্যার এই দলে আছেন, কিন্তু তার বয়স ৪০ ছুঁয়েছে। ফর্মও আগের মতো নেই।
হফেনহাইমে খেলা অলিভার বাউমানের বয়সও ৩৫। আর দলের অন্য গোলকিপার আলেকজান্ডার ন্যুবেল বায়ার্ন মিউনিখে সুযোগ না পেয়ে গত ছয় মৌসুম ধারে খেলেছেন মোনাকো ও স্টুটগার্টের হয়ে।
তবে জার্মানির সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জামাল মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান ভির্টজের জুটি। ফুটবলবিশ্বে যাদের ‘উইসিয়ালা’ নামে ডাকা হয়। এই জুটির সৌন্দর্য তাদের পরিপূরকতায়।
জামাল মুসিয়ালা হলেন বিশৃঙ্খলার স্রষ্টা। সংকীর্ণ জায়গায় তার অসাধারণ ড্রিবলিং, প্রেস প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অপ্রত্যাশিত গতিবিধি যেকোনো সংকুচিত ডিফেন্সকে ভেঙে দিতে পারে। তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় নন, পুরো সিস্টেমের অস্থিতিশীলকারী।
অপরদিকে, ভির্টজ হচ্ছেন সৃজনশীলতার নিয়ন্ত্রক। তার অসাধারণ সময়জ্ঞান, পজিশন সেন্স, ফাইনাল পাস এবং কম্বিনেশন খেলা মুসিয়ালার তৈরি করা বিশৃঙ্খলাকে গোলের সুযোগে রূপান্তরিত করে। দুজনের রসায়ন এতটাই প্রাকৃতিক যে, তারা মাঠে একে অপরের চোখের ইশারাতেই খেলতে পারেন।
তবে ২০২৬ সালে তাদের বয়স মাত্র ২৩ বছরের কাছাকাছি হবে। এখনও তাদের শীর্ষ সময় আসেনি। যদি তারা সুস্থ থাকেন এবং সেরা ফর্মে খেলেন, তাহলে এই জুটি এই বিশ্বকাপে না হলেও পরবর্তী আসরগুলোতে জার্মানিকে আবারও ফেভারিট হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য করবে।
