
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর ফলাফলে অভিনব জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। ওই শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে খাতায় শূন্য নম্বর পেলেও ফলাফল শিটে সেটি ৪৫ নম্বর দেখায়। পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনের পর বিষয়টি নজরে আসে বোর্ড কর্মকর্তাদের। শুধু তাই নয় ফলাফলে ওই শিক্ষার্থীকে ৪ দশমিক ৯৪ জিপিএ পেয়ে উত্তীর্ণ দেখায়। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বললেও ১০ কর্মদিবসেও তা দেওয়া হয়নি।
গত ২৫ আগস্ট পুনঃনিরীক্ষণ কার্যক্রমের সময় পদার্থবিজ্ঞানের একটি উত্তরপত্র যাচাই করতে গিয়ে প্রথম এই অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরে কম্পিউটার সেন্টারে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে উত্তরপত্রের নম্বর মিলিয়ে দেখলেও একই ধরনের পার্থক্য পাওয়া যায়।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় ওইদিনই চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিজ্ঞান বিভাগের ওই শিক্ষার্থী প্রকৃতপক্ষে মাত্র একটি বিষয়ে পাস করেছিলেন। অথচ প্রকাশিত ফলাফলে তাকে জিপিএ ৪ দশমিক ৯৪ পেয়ে উত্তীর্ণ দেখানো হয়। প্রকাশিত ফলাফলে বাংলায় ১২০, রসায়নে ৭৮ এবং আইসিটিতে ৩৭ নম্বরসহ অধিকাংশ বিষয়ে ‘এ’ প্লাস দেখানো হয়েছিল। কিন্তু পুনঃনিরীক্ষণের সময় উত্তরপত্রের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফল মিলিয়ে দেখার পর একাধিক বিষয়ে বড় ধরনের অমিল পাওয়া যায়।
শুরুতে পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়—এই তিন বিষয়ের উত্তরপত্রে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় শিক্ষার্থীর অন্যান্য বিষয়ের উত্তরপত্রও তলব করে যাচাই করা হয়।
শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্রের নম্বর বিভিন্ন ধাপে কম্পিউটার সেন্টারের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়। এই ঘটনার পর ফের প্রশ্নের মুখে পড়েছে শিক্ষা বোর্ডের কম্পিউটার সেন্টারের নিরাপত্তা ও ফলাফল তৈরির প্রক্রিয়া। কারণ এর আগেও ফলাফল পরিবর্তন ও নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
বোর্ডের সাবেক কর্মকর্তারা জানান, পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্রের নম্বর বিভিন্ন ধাপে কম্পিউটার সেন্টারের সার্ভারে সংরক্ষণ করা হয়। ফলাফল প্রকাশের আগে এসব তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে চূড়ান্ত ফলাফল তৈরি করা হয়। এই প্রক্রিয়ার কোনো পর্যায়ে অননুমোদিতভাবে নম্বর পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি-না, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ হয়নি। ফলে ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে নম্বর পরিবর্তন হলো এবং ফলাফল প্রকাশের আগে বা পরে কোনো পর্যায়ে অনিয়ম করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু উত্তরপত্রের নম্বরের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফল মিলিয়ে দেখলেই হবে না। নম্বর সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ডাটা এন্ট্রি, যাচাই এবং চূড়ান্ত ফলাফল তৈরির প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার সিস্টেমে কখন, কোথা থেকে এবং কার মাধ্যমে তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে কি-না, সেটিও যাচাই করা জরুরি।
এদিকে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নাটকীয়তা। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিনটি বিষয়ের পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু আগ্রাবাদ কলোনি সরকারি বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে এমন কোনো আবেদন করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। যদি পরিবারের কেউ আবেদন না করে থাকে, তাহলে আবেদনটি কে করেছেন—এমন প্রশ্ন উঠেছে।
এর মধ্যে শিক্ষার্থীর ফলাফল সার্ভার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমে ওই ফলাফল ব্যবহার করে আবেদন ঠেকাতেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কারণ একটি ফলাফল বাতিল, স্থগিত বা সংশোধনের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তারও একটি পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড থাকা জরুরি।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী জানান, ২৫ আগস্ট পুনঃনিরীক্ষণের সময়ই প্রথম অসঙ্গতিটি ধরা পড়ে। এরপর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয় এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন জানান, বিষয়টি তদন্তাধীন। এ ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, তা নিয়ে আমরা তদন্ত কমিটির সদস্যরা কাজ করছি। এ ঘটনার সাথে সংশিল্ষ্টদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।
এর আগে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর এবার এসএসসি পরীক্ষার ফলেও একই বোর্ডে নম্বরের অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বা ব্যবস্থাপনার মিল রয়েছে কি-না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
