মঙ্গলবার ১৭ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

পুরান ঢাকায় একাধিক স্থানে উন্মুক্ত নর্দমা, খানাখন্দ ও ধুলাবালিতে চরম ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৩৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

পুরান ঢাকায় একাধিক স্থানে উন্মুক্ত নর্দমা, খানাখন্দ ও ধুলাবালিতে চরম ভোগান্তি

পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সুভাষ বোস অ্যাভিনিউয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারকাজ চলছে। কিন্তু কাজের ধীরগতি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। সড়কের পাশের গভীর নর্দমা সংস্কার করা হয়েছে। তবে একাধিক স্থানে নর্দমা ঢাকনা ছাড়াই উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে সড়কের খানাখন্দ ও ধুলাবালিতে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন এলাকাবাসী ও পথচারীরা।

সোমবার (২ মার্চ) সকালে শাহ সাহেব বাড়ি জামে মসজিদ ও মহানগর মহিলা কলেজের সামনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে সংস্কারকাজ শেষে নর্দমার ঢাকনা খোলা রেখেই শ্রমিকরা অন্য অংশে চলে গেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো পথচারী ও শিক্ষার্থী চলাচল করায় যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়রা বলেন, নর্দমাটি বেশ গভীর হওয়ায় সামান্য অসতর্কতায় কেউ পড়ে গেলে গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সন্ধ্যার পর আলো কম থাকায় বিপদের মাত্রা আরও বাড়ে।

লক্ষ্মীবাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী মামুন ইসলাম বলেন, দিনে তো মানুষ কোনোভাবে দেখে-শুনে হাঁটে, কিন্তু রাতে হঠাৎ পা পিছলে গেলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এখানে অন্তত অস্থায়ী বাঁশের বেষ্টনী বা সতর্কবার্তা থাকা উচিত ছিল। সড়কটির বেহাল দশা নিয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর জাগো নিউজে ‘ভাঙা সড়ক, ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ পুরান ঢাকাবাসী’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

ওই সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল বিভাগ জানায়, বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকা থেকে লক্ষ্মীবাজার পর্যন্ত প্রায় ৫৮০ মিটার সড়ক, দুপাশের ড্রেন ও ফুটপাত সংস্কারে গত জুনে কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। তবে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজের ভৌত অগ্রগতি ছিল মাত্র ৩০ শতাংশ। আগামী মে মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

সড়ক সংস্কার প্রকল্পের পরিচালক, ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল) রাজীব খাদেম তখন বলেছিলেন, বর্ষা মৌসুমে কাজ বন্ধ থাকায় কিছুটা পিছিয়েছে; নভেম্বর থেকে কাজের গতি বেড়েছে এবং নির্ধারিত সময়ই শেষ করার চেষ্টা চলছে।

তবে সর্বশেষ সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা যায়, কাজ চললেও তা অত্যন্ত ধীরগতির। কোথাও খোঁড়াখুঁড়ি শেষ করে ফেলে রাখা, কোথাও ইট-বালুর স্তূপ, আবার কোথাও ড্রেনের ঢাকনা স্থাপন না করেই অন্য অংশে কাজ শুরু, এমন দৃশ্য নিয়মিত। ফলে সড়কজুড়ে অস্থায়ী ঝুঁকি স্থায়ী ভোগান্তিতে রূপ নিচ্ছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঘেরা ব্যস্ত সড়ক

সুভাষ বোস অ্যাভিনিউয়ের দুই পাশে রয়েছে অন্তত নয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আছে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ, সেন্ট গ্রেগরি হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুল। পাশের অলিগলিতেও রয়েছে আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার। প্রতিদিন সকাল-দুপুরে হাজারো শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক এই সড়ক ব্যবহার করেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা রায় বলেন, ‘রাস্তা এমন খানাখন্দে ভরা যে রিকশায় বসে থাকাও কষ্টকর। আবার নেমে হাঁটলেও ধুলায় শ্বাস নেওয়া যায় না। তার ওপর খোলা ড্রেন-সবসময় ভয় লাগে।’

রিমন রহমান নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘শিশুদের হাত ধরে নিয়ে যেতে হয়। একবার অসাবধান হলেই বিপদ। সিটি করপোরেশন যদি কাজই করে, তাহলে অন্তত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে করা উচিত।’

সড়কজুড়ে ধুলা, খানাখন্দ ও দখল

গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটিতে দিন-রাত ধুলা উড়তে দেখা যায়। বালু, ইট ও নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ পড়ে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। খানাখন্দে ভরা সড়কে রিকশা, মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহন চলতে গিয়ে প্রায়ই আটকে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংস্কারের নামে দীর্ঘদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ি চললেও সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকায় একই অংশ বারবার কাটতে হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফুটপাত ও সড়কের দুই পাশ দখল করে বসা অস্থায়ী দোকান। ফলে পথচারীদের হাঁটার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে চলাচল করছেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

মোমেন আলী স্থানীয় বাসিন্দা। সড়কের পাশেই তার বাড়ি। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু এমন উন্নয়ন চাই না যেখানে মাসের পর মাস কষ্ট পেতে হয়। কাজ দ্রুত শেষ করা হোক। আর যতদিন চলবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধুলা নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাইসুল ইসলাম বলেন, সড়ক ও ড্রেন সংস্কারকাজে ‘সাইট সেফটি ম্যানেজমেন্ট’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খোলা নর্দমা বা গর্তের চারপাশে দৃশ্যমান ব্যারিকেড, প্রতিফলক টেপ, সতর্কবার্তা সাইনবোর্ড ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক। ধুলা নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পানি ছিটানো এবং নির্মাণসামগ্রী নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণও প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকায় কাজ হলে অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া উচিত। স্কুল-কলেজের সময়সূচি বিবেচনায় ভারী কাজ সীমিত রাখা এবং নিরাপত্তা তদারকি বাড়ানো জরুরি।

স্থানীয়রা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় মে মাস হলেও এর মধ্যে যেন আর কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। সেজন্য অন্তর্বর্তীকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে জরুরি।

পুরান ঢাকায় উন্মুক্ত নর্দমা

ঢাকা-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ। এই সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করা গেলে জনদুর্ভোগ কম হতো। কারণ সড়কটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানঘেরা।

তিনি আরও বলেন, কোনো ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কাজ শুরুর আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার দেয়। কিন্তু বাস্তবে যদি কেউ নিরাপত্তা বিধি না মানে, তাহলে সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। তা না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলবো।

ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে আব্দুল মান্নান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের দুই পাশের ফুটপাত অস্থায়ী ও স্থায়ী ব্যবসায়ীদের দখলে থাকায় পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে প্রধান সড়ক ব্যবহার করতে হয়। আমাদের নির্বাচনি ইশতেহারেও হকারদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ী বন্দোবস্ত করার কথা বলা হয়েছিল। তিনি এটিকে জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে বর্তমান সরকার কোনো উদ্যোগ নিলে সহযোগিতা করার কথা বলেন।

গত বুধবার (৪ মার্চ) সুভাষ বোস অ্যাভিনিউ সড়কের চলমান উন্নয়নকাজ ঘুরে দেখেন ঢাকা-৬ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। তিনি বলেন, সুভাষ বোস অ্যাভিনিউয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ০.৫৮ কিলোমিটার এবং সড়কের দুই পাশে মোট ১.১৬ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণের কাজ চলছে। উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হলে জলাবদ্ধতা কমবে এবং এলাকার সড়ক অবকাঠামোর মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।

ইশরাক হোসেন বলেন, সড়ক ও ফুটপাতের কিছু অংশ অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে, যা মানুষের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এসব দখলদারিত্ব অপসারণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ট্রাফিক বিভাগ, সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সড়কগুলো যান চলাচলের উপযোগী করে তোলা হবে, যাতে এলাকাবাসী ও পথচারীরা স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন।

Facebook Comments Box
Advertise with us

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়