
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ২১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চাকরিতে নিয়োগের সময় জাল শিক্ষা সনদ জমা দেওয়ার অভিযোগে ইসলামী ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হওয়া কর্মকর্তাকেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুনরায় চাকরিতে বহাল করার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, বরখাস্তের তারিখ থেকে পুনরায় কাজে যোগদানের মধ্যবর্তী সময়কালকে ‘বিনা বেতন ও ভাতায় সাধারণ ছুটি’ হিসেবে গণ্য করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, যা ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের চরম পরিপন্থি।
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এক অভিনব ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অন্তত ১০ হাজার কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে। এর পর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের নিয়োগ দিয়েছে ব্যাংকটি। যার মধ্যে সনদ জালিয়াতির অভিযোগে চাকরি হারানোর ব্যক্তিও রয়েছেন।
ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন চিঠিতে দেখা গেছে, ব্যাংকটিতে যোগদানের সময় মো. মহিবুল আলম চৌধুরী চট্টগ্রামের সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভুয়া ও জাল সনদ জমা দেন। ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তদন্তে জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় দুই বছর আগে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর তিনি পুনর্বহালের জন্য আবেদন করেন। ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় তার আপিলটি উপস্থাপন করা হয়। পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে চাকরিতে স্থায়ী নিয়োগ মঞ্জুর করা হয়। নামমাত্র শাস্তি হিসেবে আগামী দুই বছরের জন্য তার পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কোনো বড় শাস্তি ছাড়াই পূর্বের মর্যাদা ফিরে পেয়ে ইসলামী ব্যাংকের রাঙ্গুনিয়া শাখার ম্যানেজার (অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জানতে চাইলে মহিবুল আলম চৌধুরী জানান, তিনি সনদ জমা দিয়েছিলেন ২০১৭ সালে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যাচাই করেছে ২০২৪ সালে। তারা যাচাই করার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের ম্যানেজমেন্ট ছিল না। সেখানে সবকিছু ঠিক থাকলেও আমার জমা দেওয়া থিসিস পেপারটি ছিল না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুল। তবে আগের ম্যানেজমেন্ট না থাকার কারণে আমাকে নতুন করে থিসিস পেপার তৈরি করে জমা দিতে হয়েছে। তারপর তারা আমাকে নতুন করে সনদ দেয়। ওই সনদ দিয়ে ব্যাংকে চাকরি পুনর্বহালের আবেদন করলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে চাকরি ফেরত দেয়।
এদিকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট শাখার সিনিয়র অফিসার মোহাম্মদ ওয়ালী উল্যাহ যখন মিরপুর-১ শাখায় জুনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একটি এমবিএ সনদ জমা দেন। সনদটিতে কোনো ছাত্র আইডি ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ে সনদটি ভুয়া প্রমাণিত হয়। ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল উদ্দিন জসিম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তার বিরুদ্ধে ব্যাংকের স্থায়ী নির্দেশাবলি, নিয়মকানুন লঙ্ঘন এবং বিশ্বাসের অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতির ষষ্ঠ অধ্যায় অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও তাকে চূড়ান্ত বরখাস্ত না করে সাদা কাগজে ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বিতর্কিত দারুল ইহসানের সনদে শত শত নিয়োগ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে সনদ জালিয়াতি ও নানা অনিয়মের কারণে সরকার কর্তৃক বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের’ সনদধারী শত শত ব্যক্তি ইসলামী ব্যাংকে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন। অভিযোগ রয়েছে, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়ে এই বিতর্কিত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ব্যবহার করে তারা ব্যাংকটিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং এখনো প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছেন।
জাল সনদ জমা দেওয়ার মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় শাস্তির বদলে পুনর্বহাল কিংবা নামমাত্র কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার এই সংস্কৃতি ইসলামী ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। এটি ব্যাংকের আমানতকারী ও সাধারণ মানুষের আস্থা সংকটের অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
জানতে চাইলে ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাবির বিন আকতার চৌধুরী বলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিষয়ে এমবিএ করেছেন। তার রেজাল্টও বেশ ভালো। তিনি ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছেন। ব্যাংকিং ডিপ্লোমাও করা আছে তার। কিন্তু কোনো নোটিশ ছাড়াই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে বের করে দিল। তার মতো আরও অনেক কর্মকর্তা আছেন, যারা দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো রেজাল্ট নিয়ে বের হয়ে ইসলামী ব্যাংকে যোগদান করেছেন। সাত-আট বছর চাকরি করেছেন। চাকরিকালীন দক্ষতা ও মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবু তাদের বের করে দেওয়া হলো। অন্যদিকে শুনছি জালিয়াতির অভিযোগে চাকরি যাওয়াদেরও বহাল করা হচ্ছে। দুঃখজনক। এখানে মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়ন নেই। রাজনৈতিক বিবেচনায় তারা ব্যাংকে নিয়োগ দিচ্ছে।
আরেক চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা শাহাদাত আজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনিও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো রেজাল্ট করে লেখাপড়া শেষে ব্যাংকে যোগদান করেছেন। কিন্তু সেখানে মেধার মূল্য নেই। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চাকরি পাওয়ার জন্য এবং চাকরি বাঁচানোর জন্য সবাইকে রাজনীতি করতে হবে কেন? যারা রাজনীতি করে না তাদের কি চাকরি করার অধিকার নেই?’
