
নিজস্ব প্রতিবেদক | মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার জন্য আলাদা ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তৃতীয় শ্রেণিতে শিক্ষার্থীপ্রতি ৩০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণিতে ৪০ টাকা এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ৫০ টাকা করে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক উল্লেখ করে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অনেকে বলেছেন, পরীক্ষার জন্য আলাদা ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত অবৈতনিক শিক্ষার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী প্রায় এক কোটি। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। বছরে তিনটি পরীক্ষা হয়ে থাকে—ত্রৈমাসিক, অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক।
সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তান। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, টাকার অঙ্কে ফি খুব বড় না হলেও অবৈতনিক শিক্ষার নীতি, দরিদ্র পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নে এর তাৎপর্য রয়েছে।
জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, বরাদ্দ–সংক্রান্ত জটিলতার কারণে আপাতত সরকারিভাবে পরীক্ষার খরচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা নিতেই হবে, আর এর জন্য টাকা দরকার। কিন্তু এখন সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে এ সমস্যা থাকবে না, তখন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও ফি নেওয়া হবে না।’ ফি নেওয়ার বিষয়ে মৌখিক নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান সচিব।
মৌখিক নির্দেশনা
ঢাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষক গতকাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি মাসে উপজেলা বা থানা পর্যায়ে প্রধান শিক্ষকদের সমন্বয় সভা হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন। গত রোববার এক সভায় মৌখিকভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষা ফি নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
ওই শিক্ষক বলেন, একসময় পরীক্ষার জন্য সামান্য ফি নেওয়ার প্রচলন ছিল। তবে করোনাকালের পর থেকে সরকারি বরাদ্দ থেকেই এ ব্যয় বহন করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (স্লিপ) ফান্ডের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
স্লিপ ফান্ড হলো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ক্ষুদ্র মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য দেওয়া বার্ষিক আর্থিক সহায়তা। প্রধান শিক্ষক ও স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির তত্ত্বাবধানে এ অর্থ ব্যয় করা হয়।
ওই প্রধান শিক্ষক বলেন, আগে কম শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয়ও বছরে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা পেত। কিন্তু চলতি অর্থবছরে অনেক ক্ষেত্রে তা কমিয়ে ১৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। অথচ একটি বিদ্যালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা পরিচালনা করতে প্রায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পত্রের মাধ্যমে পরীক্ষার ফি ধার্য করার জন্য অনলাইনে মতামত আহ্বান করা হয়েছিল। তাতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীপ্রতি ২০ টাকা করে এবং তৃতীয় শ্রেণির জন্য ৩০ টাকা, চতুর্থ শ্রেণির জন্য ৪০ টাকা ও পঞ্চম শ্রেণির ৫০ টাকা করে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে কোনো ছাত্রছাত্রী পরীক্ষা ফি দিতে অসমর্থ হলে তার পরীক্ষার ফি মওকুফের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছিল। এখন তিনটি শ্রেণিতে ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এ সিদ্ধান্ত এসেছে এমন সময়ে, যখন সরকার প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে বই ও উপবৃত্তি দিচ্ছে। ইউনিফর্ম, জুতা ও খাবার দেওয়ার কর্মসূচিও নেওয়া হচ্ছে। পাঠদান আধুনিক করতে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষের কাজও চলছে।
নতুন বাজেটেও পুরো শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১.৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষাবিষয়ক দুই মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ১ লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় বাজেটের মধ্যেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষার মতো ব্যয়ের জন্য কেন শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে?
এ ধরনের সিদ্ধান্ত শিক্ষায় বৈষম্য বাড়াবে
সরকার ইতিমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে ধাপে ধাপে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ স্তরের শিক্ষা অবৈতনিক রাখার নীতিগত অবস্থানও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা ফি নেওয়ার বর্তমান সিদ্ধান্তকে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অনেকেই ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও বিদ্যমান নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন।
দেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে জনগণের জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সব বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য…কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে রাষ্ট্র।’
প্রসঙ্গত, সাড়ে তিন দশক আগে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে আইন করা হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষায় কোনো ধরনের পরীক্ষা ফি আরোপ করা উচিত নয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষা ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত সত্যিই হতবাক ও ক্ষুব্ধ হওয়ার মতো। বর্তমান সরকারের ঘোষিত অঙ্গীকারের সঙ্গেও এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রাথমিক শিক্ষা সর্বজনীন ও অবৈতনিক—এটাই আইনের কথা। সেখানে পরীক্ষার জন্য আলাদা ফি নেওয়া হলে অবৈতনিক শিক্ষার মূল দর্শনই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত শিক্ষায় বৈষম্য আরও বাড়াবে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে এই ফি থেকে সরকারের যে আয় হবে, তা সামগ্রিক ব্যয়ের তুলনায় খুবই সামান্য। তাই এমন একটি মৌলিক ব্যয় শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
