
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ১০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

এক সময়ের আতঙ্কের জনপদ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এখন শান্ত। আতঙ্ক কাটিয়ে ওই জনপদকে আস্থার জায়গায় নিয়ে আসতে কাজ করছে প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্থাপন করেছেন দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প। বিগত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিক অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হলেও গত ২ মার্চ ৩ হাজার ১৮৩ জনের যৌথ অভিযানে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। অভিযানে বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার ও ২২ জনকে গ্রেফতার করলেও জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণ করা সন্ত্রাসীদের গডফাদার কেউ গ্রেফতার হয়নি। অভিযানের খবর পেয়ে আগের রাতে নিরাপদে পালিয়ে যায় তারা।
জানা গেছে, যৌথ অভিযানের পর কোনো ধরনের রক্তপাত ছাড়াই পাল্টে গেছে জঙ্গল সলিমপুরের দৃশ্যপট। ওই এলাকার ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে পুলিশের দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প। নিয়মিত টহল চলছে এলাকায়। মানুষের মধ্যে আগের মতো আতঙ্ক-উৎকণ্ঠা নেই, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে সবাই। প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের কোনো আনাগোনা নেই।
সলিমপুরের বাসিন্দা বৃদ্ধ জহুরুল হক বলেন, এলাকা আগের চেয়ে শান্ত রয়েছে। কোনো ঝগড়া-বিবাদ নেই। মারামারি নেই। সবাই যার যার মতো কাজ-কর্ম করছে। আগে তো দু-একদিন পরপর মারামারি হতো। একই বক্তব্য ওই এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুল আউয়াল, মেজবা উদ্দিনের। তারা বলেন, আমরা আর আতঙ্ক চাই না। নিরাপদে বসবাস করতে চাই। এখন এলাকা যে অবস্থায় রয়েছে, সব সময় যেন এমন থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলার পাহাড়ি এ জনপদ ২০০০ সাল থেকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে সন্ত্রাসীরা। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে এলাকাটিতে গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও দখলদারির সাম্রাজ্য। এ যেন দেশের মধ্যে আরেক দেশ ছিল। সেখানে গড়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী। ওই বাহিনীর প্রধানদের নির্দেশনা ছিল সেখানকার ‘অলিখিত আইন’। বাইরে কোনো মানুষ ওই এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। পরিচয় দিয়ে প্রবেশ করতে হতো। জঙ্গল সলিমপুরে বসে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন জায়গায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতো সন্ত্রাসীরা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন কয়েকবার চেষ্টা করেও জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীদের গ্রাস থেকে উদ্ধার করতে পারেনি।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকার এস এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভেতরে বসেছে পুলিশের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প। এখানে প্রায় ১৩০ জন পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। আলীনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে আরেকটি অস্থায়ী ক্যাম্প। এখানে প্রায় ২৩০ জন র্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য রয়েছেন।
বিগত সময়ে জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী, যারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন এই জনপদে। ‘ইয়াছিন বাহিনীর’ প্রধান ইয়াছিন মিয়ার বিরুদ্ধে হত্যাসহ ২১টি মামলা রয়েছে। ইয়াছিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন রোকন উদ্দিন। তিনি গঠন করেছেন ‘রোকন বাহিনী’। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ ২৮টি মামলা রয়েছে। এই দুই সন্ত্রাসীর সহযোগী হিসেবে রয়েছে কাজী মশিউর রহমান ও নুরুল ভাণ্ডারি। মশিউরের বিরুদ্ধে ২৭টি ও নুরুল ভাণ্ডারির বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা রয়েছে। তাদের সহযোগী গাজি সাদেকুর রহমান ও গোলাম গফুরের বিরুদ্ধেও ৯টি করে মামলা রয়েছে।
ওই এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে দল সরকার গঠন করে সন্ত্রাসীরা তখন ওই দলের আশ্রয়ে চলে যায়। এজন্য প্রশাসন চাইলেও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে পারে না। কিছু গ্রেফতার হলেও তাদের দ্রুত জামিনের ব্যবস্থা করা হয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে। সে কারণে গত ২৬ বছর ধরে জঙ্গল সলিমপুরে শক্ত কোনো অবস্থা তৈরি করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান ইয়াছিন মিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তখনকার আওয়ামী লীগের এমপি এস এম আল মামুনের সঙ্গে। এখন বিএনপির সঙ্গেও তার সম্পর্ক রয়েছে বলে লোকমুখে প্রচার রয়েছে। রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৩ জুন তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে ১১টি ভাগে বিভক্ত করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটারসহ বিভিন্ন প্রকল্পের পরিকল্পনার কথা জানান। ধারণক্ষমতার তিনগুণের বেশি বন্দি থাকায় নতুন কারাগার তৈরির জন্য সলিমপুরে ৫০ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়। পরে জেলা প্রশাসন ও কারা অধিদপ্তরের মধ্যে এ বিষয়ে চিঠি চালাচালিও হয়। গত বছরের মার্চে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের জমিগুলো দখলে আছে। উদ্ধার না হওয়ায় তা কারা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া যাচ্ছে না।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে স্থাপনা নির্মাণের জন্য সামরিক-বেসামরিক, সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অন্তত ৪৮টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে। চট্টগ্রাম সেনানিবাস, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা, বাংলাদেশ বেতার, র্যাব-৭, সিডিএ, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিসসহ বহু প্রতিষ্ঠান সেখানে জমি চেয়ে আবেদন করেছে।
ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সোহেল রানা বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের মানুষ এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। এলাকায় কোনো সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ নেই। আগে প্রতিদিন মানুষ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে আসতো। ওই এলাকায় দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি আমরা নিয়মিত টহল দিচ্ছি।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘ ২০ বছর পুলিশের কোনো কমান্ড ছিল না। তবে সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সেই কমান্ড প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি আমরা। এখন নিয়মিত চেকপোস্ট থাকছে, টহল টিমও যাচ্ছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, একটি মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। জঙ্গল সলিমপুরের প্রাণপ্রকৃতি রক্ষা করে কীভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে, সে বিষয়টিই কমিটি বিবেচনায় আনবে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, এক সময়কার অপরাধীদের আয়ত্তে থাকা জঙ্গল সলিমপুর এখন পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এরপর বেদখলে থাকা জমিগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কাজ শুরু হবে। এলাকাটিতে বিভিন্ন ধরনের সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে ইতোমধ্যে ২৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জমি, পরিবেশ ও বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে সুপারিশ দেবে কমিটি।
