শনিবার ২৫শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

ঢাকায় প্রতিদিন চুরি হচ্ছে একটি গাড়ি-মোটরসাইকেল

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২৯ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ঢাকায় প্রতিদিন চুরি হচ্ছে একটি গাড়ি-মোটরসাইকেল

রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও চুরি হচ্ছে একটি করে গাড়ি বা মোটরসাইকেল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, বছরে গড়ে অন্তত ৩৬৬টি যানবাহন চুরির মামলা হচ্ছে। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি—কারণ অনেক ভুক্তভোগী থানায় যান না, মামলাও করেন না। সংগঠিত চক্র মাত্র ৫ থেকে ১০ সেকেন্ডে গাড়ি নিয়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

ঘটনা এক বছর আগের। ১২ মার্চ মধ্যরাত। ঘটনাস্থল রাজধানীর অন্যতম নিরাপদ এলাকা বারিধারা ডিওএইচএস। ১২ নম্বর সড়কে পার্কিং করা ছিল একটি প্রাইভেটকার। মাত্র এক মিনিটে ‘মাস্টার কি’ দিয়ে লক খুলে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায় চোর।

এবার একটি ভিন্নধর্মী ছিনতাইয়ের ঘটনা। টয়োটা হ্যারিয়ার (হাইব্রিড) ব্র্যান্ডের আনুমানিক ৮৫ লাখ টাকা দামের একটি গাড়ি টেস্ট ড্রাইভের কথা বলে মালিকের প্রতিনিধির মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গাড়িটি নিয়ে চম্পট দেয় ছিনতাইকারী চক্র। ঘটনা গত বছরের ৮ মার্চের। ২৫ মার্চ বিদেশি পিস্তলসহ আহসান আহমেদ ওরফে মাসুম নামে বুয়েটের সাবেক এক শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি গাড়ি ছিনতাইয়ের পর মালিককে গাড়ি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলে অর্থ দাবি করতেন।

শুধু সাধারণ মানুষের গাড়িই নয়। থানার ভেতর থেকে খোদ পুলিশের মোটরসাইকেলও চুরি হয়েছে। চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি রাজধানীর ভাটারা থানার ভেতর থেকে পুলিশের ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল চুরি হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুখোশধারী দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলটি নিয়ে যাচ্ছেন। মোটরসাইকেলের মালিক এএসআই মো. ফিরোজ জানান, মোটরসাইকেলে একটি জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো ছিল। থানার বাইরের একটি গলিতে নিয়ে সেই জিপিএস ট্র্যাকার খুলে ফেলে চোরেরা।

এভাবে রাজধানী ঢাকায় দিন দিন বাড়ছে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চুরির ঘটনা। থানায় মামলার পরিসংখ্যান বলছে, বছরে গড়ে ৩৬৬টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চুরি হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ঢাকার কোথাও না কোথাও চুরি হওয়ার এ প্রবণতা শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রশ্নই নয়, অনেক পরিবারের জন্য আর্থিক বিপর্যয়েরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অনেকে থানা পর্যন্ত যান না, মামলা করতেও আছে অনীহা।

যে সব স্থান থেকে বেশি চুরি

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, পিকআপ, সিএনজি অটোরিকশা, লেগুনা ও মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহনই চোরচক্রের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকা, শপিংমল সংলগ্ন পার্কিং ও অরক্ষিত রাস্তার পাশে রাখা গাড়িগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

চুরি করে যন্ত্রাংশ খুলে বিক্রি

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গাড়ি চুরি হওয়ার পর সেটি উদ্ধারে প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং জটিল। অনেক ক্ষেত্রেই চুরি হওয়া গাড়ির হদিস আর পাওয়া যায় না। চোরচক্র অনেক সময় দ্রুত ঢাকার বাইরে নিয়ে গাড়ির পার্টস খুলে ফেলে। ফলে ঋণ নিয়ে বা সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে কেনা গাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন অনেকেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, সংগঠিত চক্র এ ধরনের চুরির সঙ্গে জড়িত। চুরি হওয়া গাড়িগুলো দ্রুত নম্বরপ্লেট পরিবর্তন ও কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে সরিয়ে ফেলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে গাড়ির যন্ত্রাংশ খুলে আলাদাভাবে বিক্রিও করা হয়। আর চুরি করতে চোরচক্র সময় নেয় মাত্র ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুরি প্রতিরোধে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। জিপিএস ট্র্যাকার, সিসিটিভি নজরদারি এবং নিরাপদ পার্কিং ব্যবস্থার অভাব চোরদের সুযোগ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি সচেতনতার ঘাটতিও একটি বড় কারণ। এছাড়া অন্তত ঢাকার সব সড়কে উন্নতমানের সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যানবাহন চুরি প্রতিরোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন চক্রগুলো চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ৮ বিভাগের সদস্যরা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছেন।

যানবাহন চুরির যত মামলা

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় যানবাহন চুরির মামলা হয় ২৯টি। গ্রেফতার করা হয় ৩২ জনকে। গাড়ি উদ্ধার হয় ১৭টি। এর মধ্যে একটি কাভার্ডভ্যান, চারটি প্রাইভেটকার, একটি মাইক্রোবাস, একটি পিকআপ, দুটি সিএনজি অটোরিকশা, চারটি লেগুনা/অটোরিকশা ও চারটি মোটরসাইকেল উদ্ধার হয়।

মার্চে চুরির মামলা ৩৯টি। গ্রেফতার ২৭ জন। গাড়ি উদ্ধার ১৯টি। এর মধ্যে দুটি কাভার্ডভ্যান, চারটি প্রাইভেটকার, একটি মাইক্রোবাস, দুটি পিকআপ, একটি সিএনজি অটোরিকশা, চারটি লেগুনা/অটোরিকশা ও নয়টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

এপ্রিলে চুরির মামলা ২৬টি। গ্রেফতার ১৯ জন। উদ্ধার যানবাহন ১২টি। এর মধ্যে একটি কাভার্ডভ্যান, দুটি প্রাইভেটকার, দুটি মাইক্রোবাস, একটি লেগুনা/অটোরিকশা ও ছয়টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

মে মাসে মামলা ৩৭টি। গ্রেফতার ৩৬ জন। উদ্ধার যানবাহন ১৮টি। এর মধ্যে দুটি কাভার্ডভ্যান, একটি প্রাইভেটকার, দুটি সিএনজি অটোরিকশা, দুটি লেগুনা/অটোরিকশা ও ১২টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

জুনে মামলা ২৪টি। গ্রেফতার ১৮ জন। উদ্ধার যানবাহন ১১টি। এর মধ্যে দুটি কাভার্ডভ্যান, একটি প্রাইভেটকার, দুটি পিকআপ ও ছয়টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

জুলাই মাসে মামলা ২৮টি। গ্রেফতার ৩২ জন। উদ্ধার যানবাহন ৩৮টি। এর মধ্যে দুটি প্রাইভেটকার, একটি পিকআপ, ১৩টি সিএনজি অটোরিকশা, দুটি লেগুনা/অটোরিকশা ও ২০টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

আগস্টে মামলা ২৯টি। গ্রেফতার ২১ জন। উদ্ধার যানবাহন ১৭টি। এর মধ্যে একটি ট্রাক, চারটি প্রাইভেটকার, ছয়টি সিএনজি, তিনটি লেগুনা/অটোরিকশা ও তিনটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

সেপ্টেম্বরে গাড়ি চুরির মামলা ৩০টি। গ্রেফতার ২১ জন। উদ্ধার গাড়ি ১১টি। এর মধ্যে তিনটি প্রাইভেটকার, দুটি পিকআপ, একটি সিএনজি, দুটি লেগুনা/অটোরিকশা ও তিনটি মোটরসাইকেল উদ্ধার।

অক্টোবরে গাড়ি চুরির মামলা ৩২টি। গ্রেফতার ২৯ জন। উদ্ধার গাড়ি ২২টি। এর মধ্যে একটি কাভার্ড ভ্যান, একটি মাইক্রোবাস, একটি পিকআপ, দুটি লেগুনা/অটোরিকশা ও ১৭টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

নভেম্বরে মামলা ২৮টি। গ্রেফতার ১৬ জন। উদ্ধার যানবাহন ১০টি। এর মধ্যে পাঁচটি সিএনজি অটোরিকশা, একটি অটোরিকশা ও চারটি মোটরসাইকেল।

ডিসেম্বরে মামলা ২৮টি। গ্রেফতার ২৪ জন। উদ্ধার যানবাহন ১৫টি। এর মধ্যে একটি ট্রাক, দুটি প্রাইভেটকার, দুটি সিএনজি অটোরিকশা, দুটি অটোরিকশা ও আটটি মোটরসাইকেল।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে যানবাহন চুরির মামলা ৩৬টি। গ্রেফতার ২১ জন। উদ্ধার যানবাহন ২৮টি। এর মধ্যে একটি ট্রাক, তিনটি প্রাইভেটকার, একটি পিকআপ, তিনটি সিএনজি অটোরিকশা, তিনটি লেগুনা/অটোরিকশা ও ১৭টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

সবচেয়ে বেশি চুরি মোটরসাইকেল

গত ১৩ মাসে ঢাকায় ১১৩টি মোটরসাইকেল চুরির মামলা হয়েছে। এ সময় মোটরসাইকেলসহ অন্য যানবাহন চুরির মামলা হয়েছে প্রায় ৪০০টি। এসব মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৩২ জনকে। উদ্ধার করা হয়েছে ২২৮টি যানবাহন।

তবে পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, মোটরসাইকেল চুরির সব ঘটনায় মামলা হয় না। সে কারণে মামলার তথ্য দিয়ে চুরির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না।

মোটরসাইকেল চুরি করে এমন কয়েকটি চক্রের খোঁজ পাওয়া যায় পুলিশ কর্মকর্তাদের কথায়। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ দলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঢাকায় অন্তত ১০টি চক্র সক্রিয় রয়েছে। সাধারণত প্রতিটি চক্রে সদস্য ৫ থেকে ১০ জন।

তাদের ভাষ্যে, আবুল কালাম আজাদ নামে একজন একটি চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রায় ২০ বছর ধরে ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরি করে এ চক্র। এই দলে আছেন ৩০ থেকে ৩৫ জন।

শুধু ঢাকায় নয়, আবুল কালাম আজাদের নেটওয়ার্ক সারা দেশেই বিস্তৃত বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা। বরিশালের বাকেরগঞ্জের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় ৫০টি চুরির মামলা থাকার তথ্যও দেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

ঢাকায় মোটরসাইকেল চুরির আরেকটি চক্রের নেতা হিসেবে মাদারীপুর জেলার শিবচরের বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের নাম জানা যায়।

চুরির মোটরসাইকেল পানির দামে বিক্রি

চুরির মোটরসাইকেল কম উদ্ধার হওয়া প্রসঙ্গে ডিবির কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে নিয়ে সেগুলো বিক্রি করা হয়। এসব মোটরসাইকেল বিক্রি হয় ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায়।

ডিবি কর্মকর্তারা বলেন, অনেক সময় চুরির মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর পরিবর্তন করে ফেলা হয়। যে কারণে চুরি হওয়া মোটরসাইকেল খুব বেশি উদ্ধার করা যায় না।

জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এন এম নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘গাড়ি চুরির যে বিষয়গুলো পুলিশের কাছে রিপোর্ট হয়েছে, তার অনেকগুলো ইতোমধ্যে উদ্ধার হয়েছে এবং বাকিগুলো উদ্ধারে পুলিশ কাজ করছে।’

ব্যক্তিগতভাবে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে যতটুকু দায়িত্ব পালন ও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা আমরা করছি। পাশাপাশি জনগণের সম্পদ রক্ষায় তাদের নিজেদেরও একটু সতর্ক ও সচেতনভাবে গাড়ি হেফাজতে রাখতে হবে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গাড়ি চুরির মামলা অথবা জিডির পরিপ্রেক্ষিতে ডিবি ইতোমধ্যে বেশকিছু চোরাই গাড়ি উদ্ধার করেছে। একই সঙ্গে চুরির সঙ্গে জড়িতদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি যে চুরি হওয়া গাড়িগুলো রয়েছে সেগুলো উদ্ধারে ডিবির সব টিম কাজ করছে।’

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়