শনিবার ২৫শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

ফোনে অভিযোগ পেয়ে রাস্তার কাজে অনিয়ম ঠেকাতে ঘটনাস্থলে ডিসি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ২ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ফোনে অভিযোগ পেয়ে রাস্তার কাজে অনিয়ম ঠেকাতে ঘটনাস্থলে ডিসি

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের ভেলাজান এলাকায় রাস্তা সংস্কার কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে সরব হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনতা। আর সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে সরাসরি ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে প্রশংসায় ভাসছেন ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল হক।

বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এলাকাবাসীর মোবাইল ফোনে অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং চলমান রাস্তা সংস্কারের কাজ পরিদর্শন করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভেলাজান বাজার থেকে ফাজিল মাদরাসা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তার সংস্কার কাজ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শুরু হয়। মাঝখানে প্রায় দুই মাস কাজ বন্ধ থাকার পর গত ১৮ এপ্রিল পুনরায় কাজ শুরু করে হুমায়ুন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। শুরু থেকেই কাজে নিম্নমানের বালু, ইট ও বিটুমিন ব্যবহারের অভিযোগ তুলছিলেন এলাকাবাসী। তবে কাজের মান নিয়ে কথা বলতে গেলে ঠিকাদারের লোকজন স্থানীয়দের ওপর চড়াও হয়। বিষয়টি উপজেলা ও জেলা এলজিইডির প্রকৌশলীদের জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে এলাকাবাসী জেলা প্রশাসকের কাছে সরাসরি মোবাইল ফোনে অভিযোগ করেন। এলাকাবাসীর ফোন পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিজেই কাজের বিভিন্ন ত্রুটি দেখতে পান।

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিভিন্নস্থানে রাস্তার অংশ খসে পড়ছে। কার্পেটিংয়ের পাথর উঠে যাচ্ছে এবং আরসিসি ঢালাই সিডিউল অনুযায়ী না হওয়ায় পুকুরপাড়ের স্লোপিং যথাযথভাবে করা হয়নি। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া সিডিউল অনুযায়ী রাস্তার প্রস্থ ও উচ্চতা না রাখার অভিযোগও উঠেছে। তদারকির অভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দায়সারা কাজ করেছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

স্থানীয় বাসিন্দা আল মোমিন অভিযোগ করে বলেন, সরকারি অর্থ লুটপাটের এই মহোৎসব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় উন্নয়নের নামে এমন নিম্নমানের কাজ করা আসলে সরাসরি দুর্নীতির শামিল। চোখের সামনে রাস্তার কাজের এই অবস্থা দেখে আমরা হতবাক ও ক্ষুব্ধ। সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা আর দায়িত্বহীনতার কারণেই আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ডিসি স্যার নিজে ঘটনাস্থলে এসে সবকিছু দেখেছেন এবং আমাদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলেছেন। এটা আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। আমরা বলতে চাই, শুধু তদন্ত করলেই হবে না, দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যারা জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া উচিত নয়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা এলাকাবাসী ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব।

মশিউর রহমান, নাজমুল হক ও সুলতান মাহমুদ পাভেলসহ কয়েকজন যুবক জানান, শুরু থেকেই রাস্তার কাজে নানা ধরনের অনিয়ম তাদের চোখে পড়ছিল। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তারা একাধিকবার সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মাবুদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং কাজের নিম্নমান, সিডিউল বহির্ভূত নির্মাণ ও তদারকির অভাবের বিষয়গুলো তুলে ধরি। কিন্তু বারবার জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী আমাদের অভিযোগকে গুরুত্ব দেননি, বরং বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

তারা আরও বলেন, যখনই আমরা কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন করি তখন ঠিকাদারের লোকজন উল্টো আমাদের ওপর চড়াও হয়েছে। এমনকি অভিযোগ করে কোনো লাভ হবে না বলেও হুমকি দেয়। একপর্যায়ে আমরা বাধ্য হয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে সরাসরি মোবাইল ফোনে অভিযোগ করি। আমরা যখন ডিসি স্যারকে ফোন করি, তখনও ভাবিনি তিনি বিষয়টি এত গুরুত্ব সহকারে নেবেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজে ঘটনাস্থলে চলে আসেন, যা আমাদের জন্য সত্যিই বিস্ময়কর ছিল। একজন জেলা প্রশাসক এভাবে সাধারণ মানুষের ফোন পেয়ে সরাসরি মাঠে চলে আসবেন এটা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। তার এই উদ্যোগে আমরা আশাবাদী যে, অনিয়মের সঠিক তদন্ত হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে অভিযোগ প্রসঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কেউ গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি। সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মাবুদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ঠাকুরগাঁও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মামুন বিশ্বাস বলেন, ভেলাজান এলাকার রাস্তা সংস্কার কাজ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। জেলা প্রশাসক মহোদয় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিকভাবে কিছু জায়গায় কাজের মান নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থাকতে পারে বলে মনে হয়েছে। তবে পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে আমাদের টেকনিক্যাল টিম দিয়ে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করা হবে। সিডিউল অনুযায়ী কাজ হয়েছে কিনা, ব্যবহৃত উপকরণের মান ঠিক আছে কিনা এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, স্থানীয় লোকজন আমার কাছে সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে তাদের এলাকার রাস্তার সংস্কার কাজে অনিয়ম হচ্ছে। অভিযোগ পাওয়ার পর আমি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সঙ্গে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে যাই। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, স্থানীয়দের বক্তব্য এক রকম, আর সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বক্তব্য আরেক রকম। এতে বিষয়টি নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। তাই প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে আমরা বিস্তারিতভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে স্থানীয়দের লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তে যদি কোনো ধরনের অনিয়ম বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us
সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়