সোমবার ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

ইউরোপে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় কমেছে ১৯.২৬ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   রবিবার, ২৪ মে ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ইউরোপে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় কমেছে ১৯.২৬ শতাংশ

২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ইউরোতে। এ সময়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দুর্বল ছিল।

এ তথ্য প্রকাশ করেছে ইউরোস্ট্যাট। আলোচ্য সময়ে রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের পোশাক পণ্যের ইউনিট মূল্যও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইইউতে বাংলাদেশি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে প্রতি কেজিতে ১৪ দশমিক ৪ ইউরোতে নেমে এসেছে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ছিল ১৫ দশমিক ৪৫ ইউরো।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। এ পতনের পেছনে পোশাক আমদানির পরিমাণ (মিলিয়ন কেজি) ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য (ইউরো/কেজি) ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমে যাওয়ার প্রভাব রয়েছে।

প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি পতন হয়েছে শুধু তুরস্ক ও কম্বোডিয়ার। তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ২২ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ২১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানিও ১৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ কমেছে।

বিপরীতে, চীন তাদের পতন সীমিত রাখতে সক্ষম হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ১ শতাংশে। আর প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল ভিয়েতনাম, যেখানে রপ্তানি কমেছে মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে ইইউ বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক দেশের তুলনায় দ্রুত কমেছে।

রপ্তানির পরিমাণের তথ্যেও বাংলাদেশের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ কমেছে, যেখানে বৈশ্বিক গড় পতন ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশ শুধু কম দামে পণ্য রপ্তানি করেনি, একই সঙ্গে ইউরোপীয় ক্রেতাদের কাছ থেকে কম ক্রয়াদেশও পেয়েছে।

তৈরি পোশাকের দামও কমেছে

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও চীন তাদের রপ্তানির পরিমাণ ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশটির বাজার স্থিতিশীলতা ও ক্রেতা চাহিদার শক্ত অবস্থান নির্দেশ করে। অন্যদিকে, পাকিস্তান কম দামে পণ্য বিক্রি করে রপ্তানির পরিমাণ ২২ দশমিক ৩৯ শতাংশ বাড়িয়েছে।

একই সময়ে বাংলাদেশের ইউনিট মূল্য পরিস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে পতন হয়েছে। ইইউতে বাংলাদেশি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্য ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ কমে প্রতি কেজিতে ১৪ দশমিক ৪ ইউরোতে নেমে এসেছে।

এ পতন বৈশ্বিক গড় মূল্য হ্রাসের তুলনায় অনেক বেশি। চীনের ইউনিট মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ, ভারতের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মরক্কোর মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ, এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মূল্য পতন ছিল বেশি।

বাংলাদেশের তুলনায় বেশি বা প্রায় সমপর্যায়ের মূল্য পতন দেখা গেছে শুধু পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায়। পাকিস্তানের ইউনিট মূল্য ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমেছে।

দুর্বল ইইউ চাহিদার মধ্যেও কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ রপ্তানি মূল্য বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। ভিয়েতনামের ইউনিট মূল্য বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ, তুরস্কের ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ।

বাংলাদেশের গড় রপ্তানি মূল্য প্রতি কেজিতে ১৪ দশমিক ৪ ইউরো, যা ভিয়েতনাম (২৯ দশমিক ৮২ ইউরো), তুরস্ক (২৮ দশমিক ১৯ ইউরো), মরক্কো (৩০ দশমিক ২৮ ইউরো) ও শ্রীলঙ্কার (২৪ দশমিক ৪৪ ইউরো) তুলনায় অনেক কম।

যে কারণে পতন

দেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ও রপ্তানির পরিমাণ—দুই ক্ষেত্রেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে পতনকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা। তাদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নানা কাঠামোগত দুর্বলতাও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য ও পরিমাণ উভয়ই কমার পেছনে দুর্বল ইউরোপীয় চাহিদা, দেশীয় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাকে দায়ী করেছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের শুল্কের প্রভাব এড়াতে একাধিক প্রতিযোগী দেশ ও সরবরাহকারী এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নমুখী হয়েছে। এতে ইইউ বাজারে সরবরাহের চাপ ও প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে।’

হাতেম বলেন, ‘একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপে ইইউ ক্রেতারা অর্ডার কমাচ্ছে। অন্যদিকে দেশে উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ও নীতিগত অস্থিরতা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল করেছে। ফলে রপ্তানির পরিমাণ ও মূল্য উভয়ই কমে যাচ্ছে। হ্রাস পাচ্ছে মূল্য নির্ধারণের সক্ষমতাও।’

‘ইউরোপে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের কারণে পোশাকের চাহিদা কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা আগের তুলনায় কম অর্ডার দিচ্ছেন এবং কম দামে পণ্য কিনতে চাপ সৃষ্টি করছেন। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশের ওপর।’ এ মন্তব্য করেন বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রপ্তানি আয় শুধু কমেনি, রপ্তানির পরিমাণও কমেছে। বাংলাদেশ কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করেও বাজার ধরে রাখতে পারেনি। এটি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।’

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনো তুলনামূলক কম দামের বেসিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, তুরস্ক বা ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলো উচ্চমূল্য ও বৈচিত্র্যময় পোশাক পণ্যে জোর দিচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে চাপের মধ্যেও তারা ইউনিট মূল্য বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের অস্থিরতা, দীর্ঘসূত্রতা ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ক্রেতাদের আস্থা কমিয়েছে। অনেক ক্রেতা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছেন।’

ড. জাহিদ মনে করেন, ‘শুধু কম শ্রমমূল্যের সুবিধার ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। এজন্য বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যের পোশাক, ম্যানমেড ফাইবারভিত্তিক পণ্য, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়