নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে বিশ্ব। বাংলাদেশ সরকারও বিগত এক দশক ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে গুরুত্বারোপ করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে স্থাপিত হয় দেশের প্রথম অন-গ্রিড সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিগত অর্ধযুগের বেশি সময়ে ছয় কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দেশের বিদ্যুৎখাতে ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের মধ্যে দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের অন্তত পাঁচ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয় তৎকালীন সরকার। পাশাপাশি ২০২০ সালের মধ্যে অন্তত ১০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত কোনোটিই পূরণ হয়নি। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে আলোর মুখ দেখিয়েছে কাপ্তাইয়ের সোলার প্রজেক্ট।
২০১৭ সালের ৯ জুলাই রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সরকারিভাবে দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্পিলওয়ে সংলগ্ন এলাকায় কাপ্তাই বাঁধের দক্ষিণ পাশেই ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা কেন্দ্রটি চালু করা হয়। এটিই দেশের প্রথম অন-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র; যেখান থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়।
১১০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটিতে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাড়ে ১৯ একর পরিত্যক্ত জমি ব্যবহার হয়েছে। প্রকল্পের ডিপিপিতে (উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব) প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৮ পয়সা।
কাপ্তাই ৭ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ১১ সেপ্টেম্বর উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে মোট ছয় কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে যোগ হওয়া বিদ্যুতের বাণিজ্যিক মূল্য ৭২ কোটি টাকা। দৈনিক গড় উৎপাদন সক্ষমতা ২৭ হাজার ইউনিট।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাপ্তাই ৭ মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎকেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর সঙ্গে অতি সম্প্রতি আরও এক মেগাওয়াট যুক্ত হয়েছে। আলাদাভাবে ৩৩২ কিলোওয়াটের রুফটপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ খুব শিগগির শুরু হবে। পাশাপাশি ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াটের আরেকটি আলাদা সোলার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হবে।’
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহমুদ হাসান বলেন, ‘পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। তবে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়া-কমা আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। আমাদের সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলমান।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ষাটের দশকে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার প্রমত্তা কর্ণফুলী নদীর কাপ্তাই উপজেলা অংশে বাঁধ দেওয়ায় সৃষ্টি হয় কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ। শুরুর দিকে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৪০ মেগাওয়াট। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে উৎপাদন সক্ষমতা বর্ধিত করে বর্তমানে সর্বোচ্চ ২৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম কেন্দ্রটি।
২০১৯ সাল থেকে একমাত্র এই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকার ভেতরে প্রথম সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রও চালু হয়। বর্তমানে দুটি কেন্দ্রই নিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে রয়েছে। নতুন করে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরও সৌরশক্তি।
ন্যাচার অ্যান্ড বায়োডাইভারসিটি অব সিএইচটি’র সংগঠক প্রান্ত রনি বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ শতভাগ পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। বিপরীতে জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাস তৈরি করে এবং তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। এতে পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌর বিদ্যুতের বিস্তারের ফলে আমাদের জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা কমবে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
পাহাড়ে সৌর বিদ্যুতের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে বলে জানান উন্নয়নকর্মী নুকু চাকমা। তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে সৌর বিদ্যুতের নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। সরকার এই খাতে ভর্তুকি দিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এর ব্যবহারের প্রসার ঘটাতে পারে। এতে করে জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। পরিবেশের বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্তি মিলবে।’