
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

রংপুর মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভেতরে রাকিবুল ইসলাম রাকিব নামে এক সেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার অভিযোগ উঠেছে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে।
বুধবার (৩ জুন) রাতে কোতয়ালি থানার ভেতরে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে ক্লোজড করার পাশাপাশি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মারধরের শিকার রাকিবুল ইসলাম রাকিব জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের রংপুর সদর উপজেলার সদস্যসচিব।
রাকিব দাবি করেছেন, এক প্রেমিক যুগলকে থানার ভেতরে মারধরের প্রতিবাদ করলে ওসি আজাদ রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করেন।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে নগরীর সিও বাজার এলাকার এক প্রেমিক যুগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) করা হয়েছিল। ওই যুগলকে উদ্ধারের পর বুধবার সন্ধ্যায় কোতোয়ালি থানায় আনা হয়। ওই যুগলের পরিবারের অনুরোধে বিষয়টি মীমাংসা করতে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতা থানায় যান। লাভলু নামে এক নেতার ডাকে থানায় যান রাকিবুল ইসলাম রাকিব।
অভিযোগ রয়েছে, থানায় গিয়ে রাকিবুল ইসলাম রাকিব দেখতে পান, এক পুলিশ সদস্য ওই যুগলকে মারধর করছেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানালে ওসি ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করেন। এতে তিনি রক্তাক্ত ও আহত হন।
ঘটনার খবর পেয়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা থানার সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে থানার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসময় গেটের ভেতর থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাকিবুল ইসলাম। তখন তার শরীরে রক্তের দাগ ও আঘাতে একটি চোখ ফুলে থাকতে দেখা যায়।
এসময় ওই প্রেমিক যুগলকেও চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, পুলিশ তাদেরকেও বেধড়ক মারধর করেছে।
রাকিবুল ইসলাম অভিযোগ করেন, উদ্ধার করা প্রেমিক যুগলকে থানার ভেতরে এক পুলিশ সদস্য মারধর করছিলেন। বিষয়টি দলের এক নেতাকে জানাতে পকেট থেকে তিনি ফোন বের করলে ওসি, এসআই ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য তার ওপর চড়াও হন। পরে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়।
এসময় কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘এখানে ওসি, এসআই আমাকে রাইফেল দিয়ে মারলো। বারবার তাদের অনুরোধ করেছি, পরিচয় দিয়েছি যে আমি স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব, বিএনপির একজন কর্মী। আমার নামে ১৩টা মামলা, আমি ১৭ বছর নির্যাতনের শিকার। তারপরও তারা আমাকে মেরে চোখটা কী রকম করলো, মাথায় দুই জায়গায় মারছে। বন্দুক দিয়ে মারছে। আমার ফোন দুইটা কেড়ে নিছে। পুলিশের চরিত্র এখনো ফ্যাসিবাদীর মতো রয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মারধরের পর পুলিশ সদস্যরা তাকে জোর করে নিয়ে গিয়ে শরীরে লেগে থাকা রক্ত ধুয়ে দেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের সামনে রক্তমাখা তুলা দেখান এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানের আঘাতের চিহ্ন দেখান।
খবর পেয়ে থানায় যান মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু। পরে মারধরের শিকার ওই নেতাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পরে রাত ১১টার দিকে থানা থেকে ওই যুগলকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ সময় থানার ভেতরে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সদর উপজেলার হরিদেবপুর ইউনিয়ন বিএনপির নেতা জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাকিবকে পুলিশ ধরে মারলো, আমারও মাথায় ঘুষি তুলছিল। শুধু বাচ্চা দুইটাকে ধরে মারতেছে, এটা দেখে নিষেধ করায় অপরাধ হয়ে গেছে।’
ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী অন্যরা জানান, ওসি নিজেই স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা রাকিবকে পিটিয়েছেন। এসময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলতে উপস্থিত নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেন সামসুজ্জামান সামু।
এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে রংপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব জাকারিয়া ইসলাম জিম বলেন, ‘পোশাক চেঞ্জ হয়েছে কিন্তু পুলিশের চরিত্র চেঞ্জ হয়নি। তাদের রক্তে এখনো আওয়ামী স্বৈরাচারী গন্ধ পাওয়া যায়। আমরা জানি পুলিশ মানবিক কিন্তু পুলিশের এই আচরণ আশা করিনি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। প্রয়োজনে থানা ঘেরাও করা হবে।’
এদিকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে কোতয়ালি থানা-পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমান বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া প্রেমিক যুগলের দুই পরিবারের মধ্যে হাতাহাতি হলে তারা থামান।’
তবে আহত স্বেচ্ছাসেবক দলনেতার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও কাপড়ে রক্তের দাগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আম ছিলতে গিয়েও তো রক্ত বের হয়।’
এদিকে বুধবার দিবাগত রাতে (২টা ২২ মিনিট) রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়, এ ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যকে পুলিশ লাইন্সে রিপোর্ট (ক্লোজড) করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তারা হলেন- ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা নারী কনস্টেবল লিমা সরেন, ডিউটি অফিসার মেহেরুন্নেসা ও সাব-ইন্সপেক্টর মাসুদ রানা।
একইসঙ্গে এ ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের লক্ষ্যে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমাকে সভাপতি, ডিসি (ক্রাইম) মো. মাহফুজুর রহমান এবং কোতোয়ালি জোনের এসি সুকুমার রায়কে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এজন্য সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
