শুক্রবার ২৬শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

মহাসড়কই এখন ময়লার ভাগাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ১৫ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

মহাসড়কই এখন ময়লার ভাগাড়

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড এলাকার প্রবেশমুখে মহাসড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে বিশাল বর্জ্যের স্তূপ। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে এনে এখানে ফেলা হচ্ছে ময়লা। পৌর এলাকায় পরিকল্পিত ও স্থায়ী কোনো ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় বর্জ্যের এই বোঝা স্থানীয়দের জন্য বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ না থাকায় পরিবেশ দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও যানজট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমস্যার কথা স্বীকার করলেও কার্যকর সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড কাঁচাবাজার সংলগ্ন এলাকায় কিশোরগঞ্জ-কটিয়াদী-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই গড়ে উঠেছে বিশাল ময়লার ভাগাড়। কটিয়াদী সদরের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই বাসস্ট্যান্ড এলাকা দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে। বিশাল ময়লার স্তূপ জমে থাকায় পথচারীরা দূর থেকেই নাকে ঢেকে চলাচল করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পৌর এলাকায় পরিকল্পিত ও স্থায়ী কোনো ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে সংগ্রহ করা বর্জ্য এনে এই স্থানে ফেলা হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ২০ টন বা তারও বেশি বর্জ্য এখানে জমা হচ্ছে। নিয়মিত অপসারণ কিংবা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনার অভাবে দিন দিন এই স্তূপ বড় হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকাল ও বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে।

কাঁচাবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুপুরের দিকে রোদ বাড়লে দুর্গন্ধ আরও তীব্র হয়ে যায়। অনেক ব্যবসায়ীকে নাক-মুখ ঢেকে দোকানে বসতে হয়। দুর্গন্ধের কারণে ক্রেতারাও বাজারে আসতে চান না। এতে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী তুষার বলেন, রাস্তার পাশে ময়লা ফেলার কারণে প্রতিদিন সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র যে পথচারীদের নাকে হাত দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। ময়লার কারণে রিকশা ও সিএনজি সড়কের মাঝখানে দাঁড়াতে বাধ্য হয়, এতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ব্যবসা করছি, কিন্তু দুর্গন্ধের কারণে গ্রাহক ও পথচারীরা বিরক্ত হচ্ছেন। এই পরিবেশে নানা ধরনের রোগব্যাধির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

প্রশাসনকে একাধিকবার জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি জানিয়ে ব্যবসায়ী তুষার বলেন, জনবসতি ও ব্যস্ত সড়কের পাশে নয়, নির্ধারিত খোলা বা নিম্নাঞ্চলে ময়লা ফেলা হোক। পাশাপাশি ময়লা পরিবহনের গাড়িগুলো যেন সঠিকভাবে ঢেকে আনা-নেওয়া করা হয়, যাতে দুর্গন্ধ ও যানজট কমে।

যাত্রী শহীদ মিয়া বলেন, আমরা প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি, কিন্তু এখন রাস্তার পাশটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। অসহ্য দুর্গন্ধে চলাচল করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্টের রোগীরা এই দূষিত বাতাসে আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। অনেক সময় নাক-মুখ চেপে বা শ্বাস আটকে রাস্তা পার হতে হয়। এত বড় সমস্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে না। আমরা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে অনুরোধ জানাই, দ্রুত এই ময়লা অপসারণ করে মানুষের দুর্ভোগের অবসান ঘটানো হোক।

রিকশাচালক মোহাম্মদ মাসুদ বলেন, রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ, প্রায় অর্ধেক রাস্তা ময়লার কারণে সংকুচিত হয়ে গেছে। এতে প্রতিনিয়ত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। দুর্গন্ধের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়, ফলে সবসময় মুখ ঢেকে চলাচল করতে হয়, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর।

তিনি আরও বলেন, এই এলাকায় প্রায়ই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। দুই-তিন দিন পরপরই কোনো না কোনো দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে এখানে চলাচল করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে।

স্থানীয়রা জানান, ময়লার স্তূপে মাছি, মশা ও বিভিন্ন রোগবাহী পোকামাকড়ের উপদ্রব ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আশপাশের বাড়িঘর ও দোকানপাটে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, যা শিশু ও বয়স্কদের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক।

বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি ময়লার স্তূপের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত তরল বর্জ্যে পরিণত হয়, যা মহাসড়ক ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মহাসড়কের প্রায় তিন ফুট জায়গা দখল করে এই ময়লা ফেলা হচ্ছে। ব্যস্ত এই আঞ্চলিক মহাসড়কের একাংশ বর্জ্যের দখলে চলে যাওয়ায় রাস্তার কার্যকর প্রস্থ কমে গেছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।

ট্রাকচালক হুমায়ুন বলেন, প্রতিদিন এখানে ময়লা-আবর্জনার কারণে যানজট সৃষ্টি হয়, ফলে সাধারণ মানুষসহ যানবাহন চলাচলে ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ময়লার কারণে এই পথে যাতায়াত করাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিশোরগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. নাজমুল করিম বলেন, এই ময়লার ভাগাড় থেকে অনেক রোগবালাই ছড়াতে পারে। বিশেষ করে মশা ও মাছির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ছড়াতে পারে। শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ হতে পারে এবং অনেক সময় এখান থেকে ডায়রিয়াও ছড়াতে পারে। এমনকি এই ময়লার ভাগাড়ের সংস্পর্শে আসা পশুপাখির মাধ্যমেও রোগবালাই ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মমিন ভুঁইয়া বলেন, মহাসড়কের পাশ থেকে ময়লার ভাগাড় সরাতে গত সপ্তাহেও চিঠি দিয়েছি। এগুলো ইউনিয়ন বা পৌরসভার কাজ, তারাই সাধারণত এই কাজগুলো করে থাকে।

কিশোরগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলার বিষয়টি নিয়ে আমি সম্প্রতি জেলা প্রশাসককে (ডিসি) সরাসরি অবহিত করেছি। এর আগেও এ বিষয়ে কয়েকবার লিখিতভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। মহাসড়কের পাশে এভাবে বর্জ্য ফেলা সড়কের জন্য ক্ষতিকর এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। জেলা প্রশাসক বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে স্থায়ী ডাম্পিং গ্রাউন্ড না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে পৌর প্রশাসক ও কটিয়াদী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাবনী আক্তার তারানা বলেন, পৌরসভা ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এত বছরেও স্থায়ী ডাম্পিং গ্রাউন্ডের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন হুট করে জায়গা চাইলে তা পাওয়া সহজ নয়।

তিনি আরও বলেন, এর আগে চুরিয়াকোনা এলাকায় খাস জমিতে ডাম্পিং গ্রাউন্ড স্থাপনের চেষ্টা করা হলেও স্থানীয়দের বাধায় তা করা যায়নি। পরবর্তীতে সেখানে সরকারি নির্দেশনায় স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা আসায় সেই জায়গাটি আর ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কারণে অধিকাংশ খাস জমি ব্যবহার হয়ে যাওয়ায় উপযুক্ত জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে জনবসতি থেকে দূরে এবং যাতায়াত সুবিধাজনক এমন নতুন স্থানের সন্ধান চালানো হচ্ছে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়