সোমবার ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

যুক্তরাজ্যে হঠাৎ কী হলো, অভিবাসীরা কেন আতঙ্কে?

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৭ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

যুক্তরাজ্যে হঠাৎ কী হলো, অভিবাসীরা কেন আতঙ্কে?

নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের রাজধানী বেলফাস্ট থেকে শুরু করে ইংল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সাউদাম্পটন—সম্প্রতি উগ্র ডানপন্থিদের সহিংসতায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে যুক্তরাজ্য। একের পর এক দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ এবং অভিবাসীদের ওপর হামলার ঘটনায় দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী ও অভিবাসীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বেলফাস্ট ও সাউদাম্পটনে যা ঘটেছে
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে সহিংসতার সূত্রপাত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে। সেখানে এক কৃষ্ণাঙ্গ হামলাকারীকে এক শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির ওপর ছুরি নিয়ে চড়াও হতে দেখা যায়। পরে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি সুদান থেকে আসা একজন শরণার্থী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেলফাস্টে শুরু হয় আধুনিক যুগের ‘পোগ্রম’ বা জাতিগত নিধনযজ্ঞের মতো সহিংসতা। মুখোশধারী দাঙ্গাবাজরা ‘বিদেশিরা দূর হও’ স্লোগান দিয়ে অভিবাসীদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়, যার ফলে নারী ও শিশুরা এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।

অন্যদিকে, সাউদাম্পটনে দাঙ্গা শুরু হয় হেনরি নোয়াক নামের ১৮ বছর বয়সী এক শ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। হেনরিকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন ভিক্রুম দিগওয়া নামের এক ব্রিটিশ শিখ যুবক। তবে অভিযোগ ওঠে, পুলিশ ভুলবশত মুমূর্ষু হেনরিকেই হাতকড়া পরায় এবং তার বিরুদ্ধে বর্ণবাদের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়। এই ঘটনার বডি ক্যাম ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে ২ জুন সাউদাম্পটন সেন্ট্রাল পুলিশ স্টেশনের বাইরে হাজারখানেক মানুষ জড়ো হয়ে সহিংস বিক্ষোভ শুরু করে। উগ্র ডানপন্থি দলগুলো পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট, চেয়ার এবং ডাস্টবিন ছুড়ে মারে।

সাউদাম্পটনের সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে কয়েকজনকে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বিচারক মাউসলি কেসি রায় ঘোষণার সময় বলেন, এটি ছিল পুলিশ-বিদ্বেষ এবং বর্ণবাদী মনোভাব থেকে জন্ম নেওয়া একটি জঘন্য অপরাধ। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা গভীর ভয়, হতাশা এবং চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন।”

রাজনীতি বনাম বাস্তব চিত্র
অভিবাসন-বিরোধী দল রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ দাবি করেছেন, এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে যুক্তরাজ্যে শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, গ্রীষ্মের এই সময়ে মানুষের মনে আশা না জাগালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জনতুষ্টিবাদী (পপুলিস্ট) নেতারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এই পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিচ্ছেন। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য টাইমস এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে সরকারের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই বেলফাস্টের এই ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে।

অথচ পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষই শ্বেতাঙ্গ। মোট ১৯ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে মাত্র ২ হাজার ২৪৮ জন আশ্রয়প্রার্থী সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন। অর্থাৎ, সেখানে অভিবাসীদের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।

‘হোয়াইট ভিক্টিমহুড’
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের (LSE) অপরাধবিজ্ঞান ও সামাজিক নীতি বিষয়ের অধ্যাপক টিম নিউবার্ন বলেন, যুক্তরাজ্যে এ ধরনের গণ-সহিংসতা সাধারণত বিরল। জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট ও জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ থাকলেও, সাম্প্রতিক দাঙ্গাগুলোর মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতিগত পরিচয় ও অভিবাসন ইস্যু।

সাসেক্স ইউনিভার্সিটির সামাজিক মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক জন ডুরি এই সহিংসতাকে ‘সম্মিলিত বর্ণবাদী হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, শ্বেতাঙ্গদের মনে এই ধারণা গেঁথে দেওয়া হচ্ছে যে তারা বৈষম্যের শিকার (White Victimhood)। কিছু মানুষ একে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, আবার অনেকে সত্যি সত্যিই এই আধুনিক বর্ণবাদী আদর্শে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

অধ্যাপক ডুরি আরও উল্লেখ করেন, ব্রেক্সিট (Brexit) পরবর্তী সময়ে যেভাবে বর্ণবিদ্বেষী হামলা বেড়েছিল, ঠিক তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিছু রাজনীতিবিদের উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে বর্ণবাদীরা এখন নিজেদের আরও শক্তিশালী ভাবছে।

ইলন মাস্কের পোস্ট
যুক্তরাজ্যে এই অস্থিরতা ছড়িয়ে দিতে মস্কো সফরে থাকা উগ্র ডানপন্থি কর্মী টমি রবিনসন (প্রকৃত নাম স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেশবাসীকে জেগে ওঠার আহ্বান জানান। এই পোস্টটি টেক বিলিয়নেয়ার ইলন মাস্ক তার ২৪ কোটি ফলোয়ারের মাঝে শেয়ার করলেও বাস্তবে তা বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। বৃহস্পতিবার রাত থেকে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হয়ে আসে এবং বেলফাস্টে একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মাধ্যমে আপাতত সহিংসতার অবসান ঘটে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়