
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ১২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার পর থেকেই উত্তপ্ত থাকা রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বহুগুণ বেড়ে যায়। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ৩ আগস্ট। এদিন শিক্ষার্থীদের সাথে সাধারণ মানুষও দলে দলে রাস্তায় নেমে আসেন। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ দাবি ও অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা আসার এ আন্দোলন সর্বস্তরের মানুষের গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
বৃষ্টিময় এ দিনটিতে রংপুরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নেমেছিল। পুলিশের সাথে ফুলেল শুভেচ্ছা বিনিময় আর আন্দোলনকারীদের উত্তাল ও বাঁধভাঙা গণজোয়ার মূলত ৪ ও ৫ আগস্ট চূড়ান্ত বিজয়ের পথ ত্বরান্বিত করে।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রংপুরে পুলিশের গুলিতে ৬ জন নিহত হন। এদের মধ্যে দু’জন শিক্ষার্থী, দু’জন ব্যবসায়ী, একজন অটোরিকশাচালক ও একজন স্বর্ণশ্রমিক। দু’বছর পার হলেও এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি মামলাতেও চার্জশিট দাখিল করেনি পুলিশ। গত দুই বছরে শনাক্ত হয়নি ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলি চালানো অস্ত্রধারীরা। ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোও উদ্ধার হয়নি।
৪ আগস্ট রংপুরে সড়কে পড়ে ছিল অস্ত্রধারীদের মরদেহ
পতনের ঠিক একদিন আগে শেখ হাসিনা সরকার কঠোর অবস্থানে যায়। সরকারপন্থি সংগঠনের কর্মী ও রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। এদিন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না করার নির্দেশনা চেয়ে করা রিটও খারিজ করে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ঢাকা থেকে ঘোষণা আসে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির। কর্মসূচি বাস্তবায়নে সারাদেশ থেকে ছাত্র-জনতাকে ঢাকায় আসার আহ্বান জানান সমন্বয়করা।
আন্দোলনকারীরা জানায়, ৩ আগস্ট ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশের নীরব ভূমিকা দেখে ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে সরকার দলীয় সংগঠনের নেতারা। আন্দোলনকারীদের কঠোরভাবে দমনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্টও দেন তারা। ৪ আগস্ট রংপুরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নগরীতে ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি পিস্তল নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়।
এর আগে, সকাল থেকে আন্দোলনকারীরা রংপুর টাউন হল চত্বরে সমবেত হতে থাকে। দুপুর ১২টার দিকে নগরীর জাহাজ কোম্পানি মোড় এলাকায় অবস্থান নেওয়া সরকারদলীয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা মিছিল নিয়ে টাউন হলের দিকে রওনা দেন। এ সময় সিটি বাজার ও সুপার মার্কেট এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পিস্তল, লাঠি, লোহার পাইপসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর সিটি করপোরেশনের সামনে, সুপার মার্কেট, জাহাজ কোম্পানি মোড় ও পায়রা চত্বরসহ বিভিন্ন এলাকা দখলে নেয় আন্দোলনকারীরা।
এ দিন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ আহত হয়েছিল অন্তত ৫০ জন। নিহতরা হলেন- রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের পরশুরাম থানা সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হারাধন রায় হারা এবং তার ভাগ্নে শ্যামল চন্দ্র রায়।
তাদের মরদেহ সিটি করপোরেশনের গেটের সামনে ফুটওভার ব্রিজের নিচে পড়েছিল বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। তারা আরও জানিয়েছে, ৪ আগস্ট প্রকাশ্যে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছুড়েছিলেন কাউন্সিলর হারাধন রায় হারাসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
এছাড়াও নিহত হন রংপুর মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য খাইরুল ইসলাম খসরু, পরশুরাম থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল সাত্তার সবুজ ও কাউনিয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক উপ-পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মাহমুদুল ইসলাম মুন্না।
সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল উপজেলা পর্যায়েও
আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ৪ আগস্ট জেলার বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেদিন রংপুর নগর থেকে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল উপজেলা পর্যায়েও। বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতাসহ সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। জেলার বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর, পীরগাছা, পীরগঞ্জ ও গঙ্গাচড়াসহ জেলার অন্য উপজেলাতে জ্বালাও পোড়াওয়ের ঘটনা ঘটেছিল।
১৬ থেকে ১৯ জুলাই, পুলিশের গুলি কেড়ে নেয় তাজা ৬ প্রাণ
দু’হাত প্রসারিত করে পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদ শহীদ হন ১৬ জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর মৃত্যু দেশ-বিদেশে নাড়া দেয়। সরকারের দমননীতি শিক্ষার্থীদের মনে দাগ কাটে। আবু সাঈদের আত্মত্যাগে জ্বলে ওঠা আন্দোলনের দাবানল শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
১৮ জুলাই বিকেলে রংপুর নগরীর মডার্ন মোড়ে ছাত্র-জনতার সাথে পুলিশের তুমুল সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে অটোরিকশা চালক ঘাঘট পূর্ব পাড়ার মানিক মিয়া শহীদ হন। ওইদিন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ অফিস, জাতীয় শ্রমিক লীগ অফিস, মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিবি কার্যালয়, তাজহাট থানা, নবাবগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা।
১৯ জুলাই বিকেল ৩টায় নগরীর গ্র্যান্ড হোটেল মোড়স্থ বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে জেলা ও মহানগর বিএনপি। এরপর কয়েক হাজার নেতাকর্মী মিছিলে যোগ দেন। তাদের মিছিলের সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার ছাত্র-জনতা অংশ নেন।
বিকেলে মিছিলটি সিটি করপোরেশনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে সেখানে পুলিশের সাথে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। পুলিশ ও বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেদিন ছিল বেশ ক্ষুধার্ত। তাদের ছোড়া রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেলে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পুলিশের অস্ত্রের সামনে ইটপাটকেল নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছাত্র-জনতা। এরই একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা মারমুখী হয়ে দফায় দফায় গুলি ছোড়ে।
এতে ঘটনাস্থলে নগরীর পূর্বশালবন এলাকার সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, পূর্ব গণেশপুরের স্বর্ণশ্রমিক মোসলেম উদ্দিন মিলন, নিউ জুম্মাপাড়ার ফল বিক্রেতা মেরাজুল ইসলাম ও পূর্ব শালবনের বাসিন্দা ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র আব্দুল্লাহ-আল তাহিরের মৃত্যু হয়।
কেউ হারিয়েছে পা, কারো নিভে গেছে চোখের আলো
৪ আগস্টের সংঘর্ষে শতাধিক আহতকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাদের অনেকে পুলিশি ঝামেলা এড়াতে হাসপাতালে না থেকে বাড়ি ফিরে যান। এ সংঘর্ষে নগরীর জুম্মপাড়ার আবেদ আলী চোখ হারান। আলমনগর খামারপাড়া এলাকার বাসিন্দা মমদেল হোসেন ও গণেশপুরের পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী পুলিশের গুলিতে পা হারান। সেই সাথে অসংখ্য ছাত্র-জনতার শরীরে গুলি লাগে।
পা হারানোর যন্ত্রণায় এখনো ছটফট করেন পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী। তার আক্ষেপ আন্দোলনের সময় কোনো কারণ ছাড়াই পুলিশ তার চেম্বারের সাটার ভেঙে গুলি ছুড়েছিল। আর এতেই তার বাম পা ক্ষতবিক্ষত হয়। সেরকম দিন যেন আর ফিরে না আসে— এটাই চাওয়া জাহাঙ্গীর আলমের।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে রূপ দিতে সবচেয়ে ভূমিকা রেখেছে হাসিনা সরকারের দমননীতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বর্বোরোচিত হত্যাযজ্ঞ। ক্ষমতা আকড়ে ধরে রাখতে যেভাবে লাশের তালিকা দীর্ঘ করেও হাসিনার দুঃশাসন টিকে থাকেনি। একাত্তরের স্বাধীনতা পরবর্তী এটা বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক ঘটনা। জনবিরোধী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশের জনগণের জ্বলে ওঠাটা যেকোনো সরকারের জন্য ‘নতুন বিপদ সংকেত’ও বটে। কারণ জনগণই ক্ষমতার উৎস এটা মনে রাখতে হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ বলেন, পুলিশের বন্ধুকের নলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদ যখন দু’হাত প্রসারিত করেছিল, তখনই শেখ হাসিনার দমননীতির পতন ঘণ্টা বেজে উঠেছিল। আমরা আবু সাঈদের সেদিনের দুঃসাহসিক আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণাকে কোনো দিনও ভুলব না। তার প্রসারিত দু’হাত দেশের মানুষকে শিক্ষার্থীদের কাছে টেনেছে, রাজপথে নামতে আহ্বান করেছিল। আবু সাঈদের প্রসারিত দু’হাতের কাছেই হাসিনার পতন ঘটে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের আন্দোলনে হামলা করা অস্ত্রধারীরা চিহ্নিত। গত দুই বছরে তারা গ্রেপ্তার না হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো নিয়ে পুলিশের আগ্রহ নেই। এখন পর্যন্ত মামলার কোনো অগ্রগতি দেখছি না। আওয়ামী লীগের যেসব সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে গুলি চালিয়েছে তাদের চিহ্নিত করতে না পারার পেছনে কী কারণ আছে, সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই জবাবদিহি করতে হবে।
শহীদ পরিবারের চাওয়া একটাই ‘গণহত্যার বিচার’
সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আকুতি জানিয়ে শহীদ সাজ্জাদের মা ময়না বেগম বলেন, মামলা করেছি, দুই বছর পার হচ্ছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ বড় বড় আসামিদের কাউকে ধরল না। সরকার আমার সাজ্জাদ হত্যার বিচারটা করলে আমি মরেও শান্তি পাব। আমার নাতনি আর ছেলের বউয়ের জন্য সরকার কিছু করে দেয়। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি খুব চিন্তিত, কী করব কী হবে? সরকার যেন শহীদ পরিবারের কথা ভুলে না যায়।
শহীদ মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সিটি বাজারের সামনে পুলিশের গুলিতে আমার স্বামী মারা যান। আমার ছেলেরা তাদের বাবা হারিয়েছে, আমি স্বামী হারিয়েছি। এখন এই সংসারে দুটি সন্তান নিয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে আমাকে লড়াই করতে হচ্ছে। সন্তানদের লেখাপড়া ও নিয়মিত খরচাপাতি সবই আমাকে সামলাতে হচ্ছে। সরকারিভাবে যে ভাতা পাচ্ছি, তা দিয়ে সংসার চালানো কষ্টকর।
তিনি আরও বলেন, আমাদের চাওয়া তো একটাই ‘গণহত্যার বিচার’ হোক। প্রথমে ভেবেছিলাম ইউনূস সরকার এসব হত্যার বিচার করবে। কিন্তু বিলম্বিত প্রক্রিয়া আর মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি না হওয়াতে মনে হয়, স্বামী হারানোর বিচার পাব না।
একটি মামলাতেও চার্জশিট দাখিল করেনি পুলিশ
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রংপুরে পুলিশের গুলিতে ৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দু’বছর পার হলেও একটি মামলাতেও চার্জশিট দাখিল করেনি পুলিশ। এদিকে ৬টি হত্যা মামলা ঘিরে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
এসব মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, শীর্ষ নেতা ও রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশের সাবেক ডিআইজি, এসপি, পুলিশ কমিশনার, সহকারী কমিশনার, ওসি, এসআইসহ মোট ২ হাজার ৬৩৬ জনকে আসামি করা হয়। এখন পর্যন্ত সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, সাবেক সংসদ সদস্য আফতাব আহমেদ, মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডলসহ প্রায় ১২৫ জন গ্রেপ্তার হলেও গুলি চালানোর অভিযোগ থাকা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা নির্দেশদাতাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ও প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে মামলার বাদীকে ম্যানেজ করে আদালতে এফিডেভিট করে নিয়েছেন। যেখানে বলা হয়েছে- ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই। বাদীরাও স্বীকার করেছেন, তারা জানেন না কাদের আসামি করা হয়েছে। তাদের অনেককে এফিডেভিট করতে বলা হয়েছে, যেখানে আসামিদের ঘটনার সময় উপস্থিত না থাকার কথা বলা হয়েছে।
সিনিয়র আইনজীবী রইছ উদ্দিন বাদশা বলেন, মামলা দায়েরের পর ‘চিনি না, আসামি করিনি’ বলে এফিডেভিট করলে আইনগত কোনো মূল্য নেই। তবে এতে মামলা দুর্বল হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, এভাবে মামলার নামে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। অনেক নিরীহ মানুষকে ফাঁসানো হয়েছে। চার্জশিট দাখিল করলেও বিচারের সময় বাদীরা সাক্ষ্য দেবেন না, ফলে মামলা প্রমাণ করা কঠিন হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর মহানগরের সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক নাহিদ হাসান খন্দকার বলেন, নিহতদের মামলায় ৮০ শতাংশ আসামি নিরপরাধ। তিনি অভিযোগ করেন, ৬টি হত্যা মামলার আসামি কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, অথচ তারাই গুলি করেছে, হুকুম দিয়েছে ও ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসন রক্ষায় কাজ করেছে।
তবে রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানান, মামলায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ১৯ জুলাই ও ৪ আগস্টের মামলাগুলোর চার্জশিট গত ডিসেম্বরে প্রস্তুত করা হয়েছে। এক পুলিশ সদস্য আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি পেয়েছেন তারা।
হাসিনার পতনে ছাত্র-জনতার বিজয় উল্লাস
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে মুখে ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে নিরাপদ পলায়নের খবরে রংপুরের রাজপথে বিজয় উল্লাস করেছিল সর্বস্তরের মানুষ সেদিন শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, যুবক, বৃদ্ধসহ সববয়সী মানুষের ঢল নামে পথে পথে।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নগরীর শাপলা চত্বর, পায়রা চত্বর, লালবাগ চত্বর, পার্ক মোড়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) সংলগ্ন শহীদ আবু সাঈদ চত্বর, মর্ডাণ মোড়, প্রেসক্লাব চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড়, পায়রা চত্বর, টাউন হল চত্বর, জিলা স্কুল মোড়সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আনন্দ মিছিল বের করে সাধারণ মানুষজন। এ সময় তাদেরকে হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এ ছাড়া নগরীতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আনন্দ মিছিল নিয়ে বেরোবির প্রধান ফটকের সামনে শহীদ আবু সাঈদ চত্বরে যান। সেখানে তারা বিজয় মিছিল করেন।
পাশাপাশি বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী, গণসংহতি আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদসহ তৎকালীন সরকারিবিরোধী সংগঠন ও তাদের অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও মিছিল বের হয়। বিভিন্ন স্থানে মিছিল থেকে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছিল। কোথাও কোথাও শুকরিয়া আদায় করে নামাজও পড়েন ছাত্র-জনতা।
এদিন রংপুর জিলা স্কুল মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করাসহ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয় ও বিভিন্ন নেতার বাড়িঘর ভাঙচুর করেছিল বিক্ষুদ্ধ জনতা।
