নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ, রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ সুদ পরিশোধ এবং সীমিত উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবতা মিলিয়ে অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে এক ধরনের চাপ— যা অনেক অর্থনীতিবিদের ভাষায় ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও নীতিগত প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
৯ মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ দাঁড়ালো একলাখ কোটি টাকা
দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে ক্রমেই ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে সরকার। প্রত্যাশিত রাজস্ব আয় না হওয়ায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকেই ব্যাপক ঋণ নিতে হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়কে। চলতি অর্থবছরের পুরো ১২ মাসে যে পরিমাণ ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার প্রায় পুরোটা অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই নেওয়া হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের (জুলাই-মার্চ) প্রথম ৯ মাসে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে মোট ১ লাখ ৮ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বাজেট অনুযায়ী, পুরো অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল একলাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
ঋণের এই বিপুল অংশের মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ৭৮ হাজার ৪৯ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে কিছু ঋণ পরিশোধ করায় বর্তমানে নিট ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব আয়ের ঘাটতি ও ব্যয়চাপ সামাল দিতে গিয়ে সরকার নির্ধারিত মাসিক ঋণসীমাও অতিক্রম করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ, ভর্তুকি ও অন্যান্য জরুরি ব্যয় মেটাতে সাময়িকভাবে টাকা ছাপিয়ে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার পথেও হাঁটতে হয়েছে। তাদের মতে, ঋণনির্ভরতা বাড়তে থাকলে তা সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দ্রুত বাড়ছে ঋণের বোঝা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ঋণ বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪ সালের জুন শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২২ সালের জুনে ছিল ১৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, গত কয়েক বছরে ঋণের প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত হয়েছে— যা অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা।
২ লাখ কোটি থেকে ২২ লাখ কোটি
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে বাড়তে ২০২৪ সালের ৩০ জুনে, অর্থাৎ সরকার পতনের ঠিক আগে— মোট ঋণ দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৮৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকায়।
পরবর্তীকালে সরকার পরিবর্তনের পর প্রকাশিত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ঋণ বুলেটিনে মোট ঋণের পরিমাণ উল্লেখ করা হয় ১৮ লাখ ৩২ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। তবে বৈদেশিক ঋণকে নতুন বিনিময় হারে পুনর্মূল্যায়নের ফলে এ অঙ্ক আরও বেড়ে ৫৬ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা যুক্ত হয়।
সরকারের ঋণ কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎসের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণের কিস্তি প্রাপ্তির পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকেও ঋণ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে সরকার বাজেট সহায়তা হিসেবে ৩৪৪ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ২০০ কোটি ডলারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
দেড় বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণও বেড়েছে। আগের সরকারের পতনের এক মাস আগে যেখানে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, তা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকায়।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের ঋণ কাঠামোয় বৈদেশিক উৎসের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হলেও, অভ্যন্তরীণ ঋণও সমান্তরালভাবে বাড়ছে— যা সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ ও ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
৩০ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা
৩০ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা নিয়েই সরকার কাজ শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্বল অর্থনীতির সময় দায়িত্ব নিয়েছে বর্তমান সরকার। আড়াই মাসে কিছুটা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও তা এখনও সন্তোষজনক না। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া ৩০ লাখ কোটি টাকা ঋণের বোঝা নিয়েই সরকার কাজ শুরু করেছে। রবিবার (৩ মে) দুপুরে রাজধানীর ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে চারদিনব্যাপী ‘‘জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬’’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ তথ্য জানান।
অভ্যন্তরীণ ঋণের দিকে ঝুঁকছে সরকার
ঋণ গ্রহণের কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় ৫৭ শতাংশই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া, যেখানে বৈদেশিক ঋণের অংশ ৪৩ শতাংশ। সরকার বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কমাতে এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
কিন্তু এই কৌশলের একটি বড় ঝুঁকিও রয়েছে। ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যয় চাপ
বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম মূল কারণ রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অথচ বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন।
ফলে সরকার বাধ্য হয়ে ঋণের ওপর নির্ভর করছে— শুধু উন্নয়ন ব্যয় নয়, অনেক ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ঋণ নিতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি একটি অস্বাভাবিক এবং উদ্বেগজনক প্রবণতা।
সুদ পরিশোধই বড় বোঝা
ঋণের সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হচ্ছে সুদ পরিশোধে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ২৬ শতাংশ ব্যয় হয়েছে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে।
এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়— অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ দ্রুত বাড়ছে। বাজেটের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হয়েছে সুদ ব্যয়। শিক্ষা ও উন্নয়ন খাতকে পেছনে ফেলছে ঋণ পরিষেবা। এতে করে সামাজিক খাতে ব্যয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
উন্নয়ন ব্যয় কমলেও ঋণ কমেনি
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছে গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। তবুও ঋণের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এর কারণ হলো— পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ, পরিচালন ব্যয়ের উচ্চ মাত্রা, রাজস্ব আদায়ের ব্যর্থতা। অর্থাৎ নতুন উন্নয়ন প্রকল্প কমানো হলেও অতীতের দায় এখনও অর্থনীতিকে চাপে রাখছে।
টাকা ছাপিয়ে ঋণ— মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি
সরকার যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে নতুন টাকা ছাপিয়ে তা সরবরাহ করা হয়। অর্থনীতিতে এটি ‘হাই-পাওয়ারড মানি’ হিসেবে পরিচিত। এর ফলে বাজারে অর্থ সরবরাহ বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অপরদিকে, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়— যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমিয়ে দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা দিলেন সতর্কবার্তা
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ এখনও সরাসরি ঋণ সংকটে পড়েনি, তবে বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ‘ঋণের ফাঁদে’ পড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, সুদ ব্যয়ের চাপ এবং দুর্বল রাজস্ব কাঠামো— এই তিনের সমন্বয় অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে একটি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তারা বলছেন. সময় থাকতেই যদি কাঠামোগত সংস্কার ও আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তাহলে এই ঋণই ভবিষ্যতে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ঋণের ফাঁদের দিকে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের দেশি ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়ছে এবং এর সুদ পরিশোধ এখন জাতীয় বাজেটের অন্যতম প্রধান ব্যয়খাতে পরিণত হয়েছে। ফলে অর্থনীতির ওপর চাপও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।’’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘‘ঋণের এই ক্রমবর্ধমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণের চাপও সমানতালে বাড়ছে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।’’
কেন তৈরি হচ্ছে ‘ঋণের ফাঁদ’?
বিশ্লেষণে দেখা যায়, কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী— করজাল সীমিত ও কর ফাঁকি বেশি। ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলার অভাব। লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকির চাপ। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা। এসব কারণে রাজস্ব বাড়ছে না, কিন্তু ব্যয় কমছে না— ফলে ঋণই হয়ে উঠছে প্রধান ভরসা।
উত্তরণের পথ কী
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি— করজাল সম্প্রসারণ ও এনবিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি।অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো। সাশ্রয়ী বৈদেশিক ঋণ ও বিকল্প অর্থায়ন বাড়ানো। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি।