নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ০৯ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
‘আমি যখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা তখন আমাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সৌদি আরবে চলে যান মুরাদ। এর কয়েক মাস পর ছেলের জন্ম হয়। শুনে অনেক খুশি হয়েছিল। বলেছিল, ইকামার (বৈধ আবাসিক অনুমতিপত্র) কাজ সম্পন্ন করে দ্রুত দেশে ফিরবেন। ঠিকই এলেন, তবে কফিনবন্দি হয়ে। জন্মের পর ছেলেকে একটু কোলেও নিতে পারেননি। ১০ মাসের শিশুটিও বাবাকে দেখলো না। আমাদের একা করে চলে গেলো। এখন আমরা কীভাবে বাঁচবো।’
শনিবার (০৯ মে) দুপুরে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলেছেন সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত রাজবাড়ীর মুরাদ শেখের স্ত্রী আঞ্জুয়ারা খাতুন। গত ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের জুবাইল এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মুরাদ শেখ (৩৬) নিহত হন। ১৬ দিন পর কফিনবন্দি হয়ে দেশে এলো তার লাশ। মুরাদ গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দরাপের ডাঙ্গী গ্রামের আব্দুল খালেক শেখের ছেলে।
মুরাদের লাশ বাড়িতে আসার পর স্ত্রী আঞ্জুয়ারা খাতুন আহাজারি করছেন। এ সময় স্বজনদের কাঁদতে দেখা যায়। কাঁদতে কাঁদতে আঞ্জুয়ারা খাতুন বলছিলেন, ‘ফোন দিলেই শুধু বলতো, তাড়াতাড়ি বাড়ি আসবো, আমার বাবাকে কোলে নেবো। এখন সব শেষ হয়ে গেলো আমাদের।’
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাড়িতে মুরাদের বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, দুই কন্যাসন্তান ও ১০ মাসের এক ছেলেসন্তান রয়েছে। ১০ মাসের ছেলেসন্তান যখন মাতৃগর্ভে ছিল, তখন বিদেশে যান মুরাদ। জন্মের পর থেকে ওই ছেলেসন্তানকে কাছ থেকে দেখেননি, এমনকি কোলেও নিতে পারেননি।
মুরাদের বড় মেয়ে মাইশা খাতুন জানায়, ‘দুর্ঘটনার দুই ঘণ্টা আগে বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়েছিল। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে কথা ভালোমতো শোনা যাচ্ছিল না। বাবা বলেছিলেন, পরে ফোনে কথা বলবে। সেই কথা আর বলা হয়নি। আমরা এখন কাকে বাবা বলে ডাকবো।’
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৬ দিন পর শনিবার ভোর সাড়ে ৪টায় হয়রত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায় মুরাদের লাশ। সকাল ৯টায় লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। এরপর বেলা ১১টায় উজানচর দুদুখান পাড়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে দুপুরে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
স্বজনরা জানিয়েছেন, সৌদি আরবে থাকা গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার তোরাপ শেখের পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসাইন সৌদি মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে মুরাদের লাশ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। এ ছাড়া অনেক প্রবাসী লাশ দেশে পাঠাতে আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। এজন্য পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন স্বজনরা।
মুরাদের বড় ভাই গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিল মুরাদ। তার মৃত্যুতে স্ত্রী ও তিন সন্তান এতিম ও অসহায় হয়ে পড়েছে। কীভাবে তাদের সংসার চলবে, তা নিয়ে চিন্তিত আমরাও। কারণ আমাদেরও আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। যদি মানুষজন সহযোগিতা করে তাহলে মুরাদের স্ত্রী-সন্তানের উপকার হবে।’