
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ২২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ঈদুল আজহাকে ঘিরেই সারাবছরের স্বপ্ন বুনেছিলেন খামারিরা। কোরবানির হাটে পশু বিক্রি করে কিছুটা লাভের আশা ছিল তাদের। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে অনেকের পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে। হাট থেকে ফেরত আসা এসব পশুর খাবার, ওষুধ ও পরিচর্যার খরচ এখনো বহন করতে হচ্ছে খামারিদের। একদিকে লোকসান, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয়ের চাপ; সবমিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন তারা। অবিক্রীত এসব পশুই এখন তাদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবছর কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ। চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার। আর কোরবানি হয়েছে প্রায় ৯২ লাখ। অর্থাৎ চাহিদার চেয়েও প্রায় নয় লাখ কম পশু কোরবানি হয়েছে। ফলে খামারিদের প্রায় ৩১ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে।
তবে গত বছরের চেয়ে কোরবানি সামান্য কিছুটা বেড়েছে। গত বছর কোরবানি হয়েছিল ৯১ লাখ পশু। যদিও গত বছর পশু কোরবানি হয়েছে তার আগের বছরের (২০২৪) চেয়ে ১৩ লাখ কম। ২০২৪ সালের ঈদুল আজহায় সারাদেশে ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবিক্রীত পশুর চাপে এবার শেষ সময় এসে লোকসানে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও খামারিরা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমে গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান বলেন, ‘কোরবানি প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা কম হয়েছে বলে আমরা তথ্য পাচ্ছি। মাঠপর্যায় থেকে এখনো তথ্য সংগ্রহ চলছে। বৃহস্পতিবারের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবার ঈদুল আজহার কোরবানির বাজারে। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছর পশুর দাম দ্রুত বেড়েছে, যা নিম্ন থেকে নিম্নমধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে এখন।
যে কারণে দ্রুত কোরবানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে ভাগে কোরবানির প্রবণতাও। আগে যারা একটি পশু কোরবানি করতেন তারা এখন কয়েকজন মিলে ভাগে কোরবানি করছেন। অন্যদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও কিছুটা বিরূপ প্রভাব ফেলেছে কোরবানির বাজারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘খামারিদের নানা খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার পশুর দাম বেড়েছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তারা প্রতিদিনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভালো মানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় পদের কর্মী ছাড়া ব্যবসায়ীদেরও মন্দাভাব চলছে। যে কারণে আগে যারা একা একটি পশু কোরবানি দিতেন, তারা এবার ভাগে কোরবানি দিয়েছেন। যারা ছোট গরু দিতেন, তারা ছাগল দিচ্ছেন। আর যারা অনেক কষ্টে দিতেন, তারা এবার আর দিতে পারেননি।’
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতা এখনো কাটেনি। এর মধ্যে দ্রুত পশুর দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই গরু কিনতে এক লাখ বা তার বেশি টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই। যে কারণে তারা ছাগল কিনছেন, অথবা উপায় না পেয়ে কেউ কোরবানি দিচ্ছেন না। আর্থিক দুর্বলতা এখন কোরবানি কমে যাওয়ার বড় কারণ।’
ঢাকার ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মকবুল হোসেন বলেন, ‘এবার ভাগে কোরবানি বেড়েছে। গতবার আমাদের খামার থেকে যে পরিমাণ ভাগে কোরবানি হয়েছিল, তার তুলনায় এবার হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। এছাড়া অনেকে কোরবানিও করেননি।’
তিনি বলেন, ‘খামার থেকে প্রতিবার গরু নেন কিংবা ভাগে কোরবানি করতেন এমন অনেক ক্রেতাকে পেয়েছি, যারা এবার কোরবানি করেননি।’
এদিকে খামারিরা বলছেন, কোরবানির হাট থেকে ফেরত আসা পশু ধকল সামলাতে গিয়ে প্রায় অসুস্থ হয়ে যায়। শরীর ভেঙে যায়। এরপর বিক্রির আগে পর্যন্ত এর খাওয়া, ওষুধসহ লালন-পালনে যে খরচ সেটা পুরোটাই বাড়তি। ঠিক এই সময় (কোরবানির পরে) এসব অবিক্রীত পশুর চাপে হাটে দাম পড়ে যায়। যে কারণে এসব গরু খামারিদের ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, ‘যদিও একটি খামারের সবগুলো গরু হাটে নেওয়া হয় না, তবে বাস্তবতা হচ্ছে একটি ৫-৬ মণ ওজনের গরু কোরবানিতে বিক্রি না হলে সেটা পরে ৫০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হারায়। কারণ এ গরুগুলো ঠিক কোরবানি কেন্দ্র করেই প্রস্তুত করা। যে কারণে যাদের গরু বিক্রি হয়নি তারা এখন প্রচুর লোকসানে পড়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘এমনিতেই গত কয়েক বছর পশুখাদ্য, ওষুধ ও খামার পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়ছে। বিষয়টি সরকারের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।’
ওই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘খামারিরা এবার কোরবানিতে যে পরিমাণ পশু বিক্রির জন্য বাজারে তুলেছিলেন, তার মধ্যে বড় একটি অংশ অবিক্রীত রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের শেষদিক থেকে কোরবানির আগ পর্যন্ত গো খাদ্যের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু খামারিরা গত বছরের দামে গরু বিক্রি করেছেন। ঈদের দুই/একদিন আগে দাম আরও কমে যায়। তখন অধিকাংশ খামারিকে লোকসানে গরু বিক্রি করতে হয়েছে, তারপরও যাদের রয়ে গেছে তাদের অবস্থা আরও খারাপ।’
