
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দিঘিতে থাকা একমাত্র কুমিরকে সরিয়ে নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মাজারের ব্যবস্থাপনায় থাকা খাদেম। তিন দিন আগে কুমিরের আক্রমণে এক শিশুর মৃত্যুর পর গত মঙ্গলবার রাতে প্রাণীটিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর গতকাল বুধবার দুপুরে প্রশাসনের সহযোগিতায় দিঘি থেকে কুমিরটি সরিয়ে নেয় বন বিভাগ। বর্তমানে কুমিরটি বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
কুমিরটি নিয়ে যাওয়ার পর গতকাল বেলা পৌনে তিনটার দিকে মাজার প্রাঙ্গণে প্রধান খাদেম ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি ফকির তারিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘খানজাহান আলী (রহ.)–এর মাজার এবং এই দিঘি সাড়ে ৫০০ বছর ধরে আমাদের পরিবার এবং আমরা দেখভাল করে আসছি। হ্যাঁ, আমাদের ভুলত্রুটি থাকতে পারে। এটা (কুমির) বাগেরহাটের মানুষের একটা সম্পদ। দুর্ঘটনা যেকোনো জায়গায় হতে পারে। তাই বলে কুমিরটি নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাগেরহাট থানায় যদি কোনো লোক মারা যায়, তাহলে কি ওসির চাকরি চলে যাবে? থানা বন্ধ করে দিতে হবে, এমন কোনো নিয়ম আছে নাকি?’ কুমির দেখার জন্য এখানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘কুমিরকে অনতিবিলম্বে এখানে দেওয়া হোক। এর নিরাপত্তার জন্য যে ব্যবস্থা হোক, আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা নেব এবং আমরা তা করব। এর আগে কুমিরে কুকুরে খাওয়ার জন্য সমস্যা হয়েছিল, আপনারা জানেন। আমরা আটজন দারোয়ান এখানে রেখেছি। তারপরও এইভাবে এক দিনের মধ্যে পুলিশ নিয়ে আইসে আমাদের কুমিরটাকে নিয়ে যাওয়া, এটা ভালো কাজ হয় নাই। দুর্ঘটনা হয়েছে বলে আমরা একেবারে ঐতিহ্য-ইতিহাস নষ্ট করে দেব, এটা তো ঠিক না।’
তবে নিরাপত্তার স্বার্থে কুমির সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অনেক দর্শনার্থী। মোল্লাহাট থেকে পরিবার নিয়ে মাজারে আসা শাহিদা বেগম বলেন, ‘কোনো মৃত্যুই তো কাম্য নয়। নাতি-নাতনি নিয়ে আসছি। আজ আমার পরিবারে যদি এমন দুর্ঘটনা ঘটত, তবে কী হতো? কুমিরকে আপাতত সরিয়ে নেওয়া ঠিক আছে। তবে এখানে প্রয়োজনীয় বেড়া (বেষ্টনী) দিয়ে কুমিরটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হোক।’ তাঁর মতো আরও অনেক দর্শনার্থীর চাওয়া, বেষ্টনী দিয়ে হলেও এখানে কুমির রাখার ব্যবস্থা করা হোক।
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছিল, মিঠাপানির কুমির বাংলাদেশ থেকে একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মাজারের দিঘির কুমিরগুলো ছিল মিঠাপানির।
দিঘির কয়েক শ একর এলাকাজুড়ে সবাই আন্তরিক হলে খানজাহান (রহ.) মাজারের দিঘিতে মিঠাপানির কুমিরের প্রজনন ও সংরক্ষণ সম্ভব বলে মনে করেন সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী ও কুমির প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির। তিনি বলেন, ‘সুন্দরবনে এখানে আমরা তো কুমির থেকে বাচ্চা ফোটাচ্ছি। প্রশাসন যদি কঠোর হয়, বাইরের যদি কোনো হস্তক্ষেপ না থাকে, তবে ওই দিঘির এক পাড়ে একটি কুমির প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন নদ-নদী থেকে বেশ কয়েকটি মিঠাপানির কুমির উদ্ধার হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।’
মাজার থেকে নিয়ে যাওয়া কুমিরটি গতকাল দুপুরে খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাণীটি সুস্থ ও স্বাভাবিক আছে জানিয়ে বন বিভাগের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ খুলনা কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলেন, ‘মিঠাপানির কুমিরকে নিয়ে লোনাপানির সুন্দরবনে ছাড়া হলে এটি বাঁচবে না। তা করাও হবে না। আমরা চেষ্টা করি যে প্রাণী যে পরিবেশের, তেমন পরিবেশেই ফিরিয়ে দিতে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুমিরটি কোথায় ছাড়া হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।’
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, দিঘি থেকে সরিয়ে নেওয়া কুমিরটিকে কী করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে পরে জানানো হবে।
