
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির মর্মান্তিক ঘটনায় ঝরে গেছে বহু প্রাণ। তাদেরই একজন আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান, যিনি একজন স্বপ্নবাজ তরুণ, মেধাবী শিক্ষার্থী ও সক্রিয় সংগঠক ছিলেন। মা, বোন ও ভাগ্নেকে নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে পদ্মার পানিতে নিভে গেছে তাদের প্রাণ।
আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ছিলেন দক্ষ বিতার্কিক। স্কুলজীবন থেকেই জাতীয় পর্যায়ে বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়েও যুক্ত ছিলেন বিতর্কচর্চায়। যুক্তি, বুদ্ধি আর সচেতনতার আলো ছড়ানোই ছিল তার স্বপ্ন।
রাইয়ান শুধু একজন শিক্ষার্থীই ছিলেন না, ছিলেন একজন সচেতন নাগরিক। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ নানা সামাজিক উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা আর সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখাই ছিল তার জীবনের লক্ষ্য।
ঈদের ছুটি কাটাতে বাড়ি এসেছিলেন রাইয়ান। পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটিয়ে আবার ঢাকায় ফিরছিলেন। মা রেহানা আক্তার, চিকিৎসক বোন ডা. নুসরাত জাহান খান এবং বোনের ৮ বছর বয়সী ছেলে তাজবিদকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলে তিনি।
বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে রাজবাড়ী থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে ওঠেছিলেন তারা। কিন্তু দৌলতদিয়া ঘাটে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। পন্টুনে ওঠার সময় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়।
সে সময় বাসের ভেতরেই ছিলেন রাইয়ান, তার মা, বোন ও বোনের ছেলে। সৌভাগ্যক্রমে রাইয়ানের বোন ডা. নুসরাত জাহান খান বের হতে পারলেও মা রেহানা আক্তার ও ছোট্ট তাজবিদের সঙ্গে সলিল সমাধি হয় রাইয়ানের।
দুর্ঘটনার রাতেই মরদেহগুলো বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পুরো বাড়িজুড়ে এখন শুধুই কান্না আর শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
পারিবারিক এই শোক যেন থামছেই না। গত ডিসেম্বরেই মারা যান রাইয়ানের বাবা। সেই শোক কাটতে না কাটতেই আবার এমন নির্মম আঘাতে ভেঙে পড়েছে পরিবারটি।
শিক্ষার্থী রাজিয়া বলেন, ‘রাইয়ান ভাইয়ের সঙ্গে আমি ক্লাস ফাইভ থেকে বিতর্ক সংগঠনে যুক্ত ছিলাম। তিনি খুব স্বপ্নবাজ মানুষ ছিলেন, সবসময় বড় কিছু করার কথা বলতেন। আজ তাকে হারিয়ে আমরা বাকরুদ্ধ। এই মৃত্যুর জন্য দেশের অব্যবস্থাপনাই দায়ী।’
রাজবাড়ী ডিবেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক উদ্দিন বলেন, ‘রাইয়ান একজন মেধাবী ও সম্ভাবনাময় তরুণ ছিল। সে অর্থনীতিবিদ হতে চেয়েছিল। জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত বিতর্ক করত। সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। তার এই মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না’
একটি সম্ভাবনাময় জীবন, একটি পরিবারের স্বপ্ন- সবকিছুই যেন মুহূর্তেই থেমে গেল দৌলতদিয়ার এই দুর্ঘটনায়। রাইয়ানের মতো আরও অনেকেই হারিয়ে গেছেন তাদের স্বপ্ন থেকে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকাকে শোকাহত করেছে। এখন প্রশ্ন- এমন মৃত্যু কি এড়ানো যেত না? সংশ্লিষ্টদের প্রতি স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত দায় নির্ধারণ করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যেন আর কোনো রাইয়ানের স্বপ্ন এভাবে নিভে না যায়।
