
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

পহেলা বৈশাখ এলেই ইলিশের চাহিদা, কদর ও দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। বাঙালির নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার আধুনিক প্রচলন, সরবরাহ কম থাকা এবং বাণিজ্যিক মুনাফাখোরির কারণে বাজারে ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। বাজারে বড় সাইজের প্রতি কেজি ইলিশের দাম বর্তমানে ৩১ থেকে ৩৫শ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
সরকার প্রতিবছর ইলিশ সংরক্ষণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়। এ বছরের জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ-২০২৬ মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) থেকে শুরু হয়েছে এবং চলবে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত। এছাড়া ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন নদীতে সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ থাকবে। জাটকা সংরক্ষণ ইলিশের প্রজনন ও ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অনুপ কুমার রায় জানান, পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার চলটি প্রাচীন কোনও বাঙালি ঐতিহ্য নয়। তার মতে, গ্রামীণ বাংলার নববর্ষ উদযাপন সাধারণত সাদামাটা হলেও শহরে ১৯৮০-এর শেষ থেকে ৯০-এর দশকে পান্তা-ইলিশের প্রথা জনপ্রিয় হয়। এটি মূলত নগর কেন্দ্রিক, বাণিজ্যিক উদ্যোগের মাধ্যমে গড়ে ওঠা।
বাজারের পরিস্থিতি তদারকি করে দেখা যায়, তুলনামূলক ছোট ইলিশও এখন ৮০০ থেকে ১১শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বড় ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বরগুনা, ভোলা, চাঁদপুর ও কাওরান বাজারে বড় ইলিশের সরবরাহ কম, জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং সিন্ডিকেটের কারণে দাম চড়া।
মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১০ ইঞ্চির কম দৈর্ঘ্যের ইলিশকে জাটকা বলা হয়। এই জাটকা ইলিশগুলো বড় হয়ে পূর্ণাঙ্গ ইলিশে পরিণত হয়। বৈশাখ মাসে বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় মুনাফাখোররা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। এতে সাধারণ মানুষ পান্তা-ইলিশ থেকে বঞ্চিত হয়।
বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আনিসুর রহমান জানান, যদি জাটকা সংরক্ষণ কার্যকরভাবে চলে, তাহলে দেশের মানুষ কমপক্ষে চার লাখ মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ পেতো।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সরকারের উদ্যোগে বর্তমানে বছরে ৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ উৎপাদন হচ্ছে। জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ চলাকালে সাগর থেকে বাজার পর্যন্ত নজরদারি থাকবে। এর ফলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এবং দাম কমে সাধারণ মানুষের নাগালে আসবে।
রাজধানীর কাওরান বাজারের বিক্রেতা তোফাজ্জেল হোসেন জানান, সরবরাহ কম থাকায় ছোট ইলিশও ৮০০-১১শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। পিরোজপুর, বরগুনা ও ভোলার বাজারে এই চড়া দাম সাধারণ নিয়ম, কারণ বড় ইলিশ সবই সংরক্ষিত থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে এবছর বড় ইলিশের দাম রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি, জ্বালানি তেল ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি সিন্ডিকেটের কারসাজি দাম বাড়ার মূল কারণ। সাগরের ইলিশের স্বাদ ও চাহিদা থাকায় তা ককশিটে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চড়া দামে সরবরাহ করা হচ্ছে।
ভোলার ইলিশ ব্যবসায়ী মামুন হোসেন জানান, এ বছরও ইলিশের চাহিদা প্রচুর। কিন্তু নদীতে বড় সাইজের ইলিশ কম ধরা পড়েছে। বাজারে বড় ইলিশ সবই আগের সংরক্ষিত। তারপরও পহেলা বৈশাখে ইলিশ কেনা চলে।
পিরোজপুরের পাড়ের হাটের ইলিশ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার বলেন, পহেলা বৈশাখের জন্য কিছু মানুষ ইলিশ কেনার জন্য পাগল হয়ে যায়। তাদের কাছে দাম কোনও বিষয় নয়। এরা মাঝ নদী পর্যন্ত ইলিশ কেনার জন্য চলে আসে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রচলন একটি আধুনিক, বাণিজ্যিক উদ্যোগ। ইলিশ সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যতে এই মাছের উৎপাদন হুমকির মুখে পড়বে। তাই নাগরিক ও গ্রামীণ উভয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
