মঙ্গলবার ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

ভোজ্যতেলের বাজারে ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৪ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

ভোজ্যতেলের বাজারে ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলা

‘চার দোকান ঘুরে কোথাও সয়াবিনের বোতল পাইনি। পরে ২০০ টাকা দরে দুই লিটার খোলা সয়াবিন কিনেছি ৪০০ টাকায়। বাজারে তেল নিয়ে যেন ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছে। বেশি দামে তেল কেনা লাগছে, দেখার কেউ নেই।’ গতকাল রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে এভাবেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানালেন বেসরকারি চাকরিজীবী মাহমুদ আলী।

সেগুনবাগিচার মাহমুদ আলী না পেলেও তেজকুনিপাড়ার মনিরা আক্তার বোতলজাত তেল পেয়েছেন। তবে গুনতে হয়েছে বাড়তি টাকা। পাঁচ লিটারের একটি বোতল কিনতে লেগেছে ৯৭০ টাকা। সমকালকে তিনি বলেন, ‘অনেক দোকানে চাইছি, বোতল নাই। এখানে পাইছি, কিন্তু বোতলের দামের থেকেও ১৫ ট্যাকা বেশি নিলো। না পাইলে তো বেশি ট্যাকা দেওন লাগবোই।’

তেল কিনতে গিয়ে মাহমুদ আলী আর মনিরা আক্তারের মতো এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা হচ্ছে অনেকেরই। শুধু ঢাকা নয়, এমন সংকট দেশজুড়ে। কোথাও বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও দাম বাড়তি। বোতলের সংকটে বাড়ছে খোলা তেলের চাহিদা। এতে দামও বেড়েছে। যদিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, আমদানিতে বড় কোনো ঘাটতি নেই। বরং নিয়মিত আমদানি হচ্ছে। ক্রেতার তরফে বাজারে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে।

লিটারে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ১৮-২২ টাকা

গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার, তেজকুনিপাড়া, মহাখালী ও সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ খুচরা দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। কারও কাছে থাকলেও লুকিয়ে পরিচিত ক্রেতার কাছে বেশি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। পাড়ামহল্লায় পাঁচ লিটারের বোতল কেউ ৯৬০, কেউ ৯৭০ টাকায় বিক্রি করছেন। এক-দুই লিটারের বোতলও নির্ধারিত দরের চেয়ে ১০ টাকার মতো বেশি নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া খোলা সয়াবিনের লিটার ১৯৫ থেকে ১৯৮ টাকা ও পামঅয়েলের লিটার ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ ৫ লিটারের বোতলের সরকার নির্ধারিত দর ৯৫৫ টাকা। আর খোলা সয়াবিন ও পামঅয়েলের দর যথাক্রমে ১৭৬ ও ১৬৬ টাকা। সেই হিসাবে খোলা সয়াবিন ও পামঅয়েলের লিটারে ভোক্তাকে অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ১৯ থেকে ২২ ও ১৮ থেকে ১৯ টাকা।

ভোজ্যতেলের এমন সংকট ও দাম নিয়ে ব্যবসায়ীরা একে অপরের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোম্পানিগুলোর দাবি অনুযায়ী সরকার দাম না বাড়ানোর কারণে তারা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, যা কৃত্রিম সংকটকে আরও উস্কে দিচ্ছে। কোনো কোনো কোম্পানি তেল দিলেও বোতলের মোড়কে থাকা দাম নিচ্ছে। পাশাপাশি ডিলার ও কোম্পানিগুলো খুচরা বিক্রেতাদের ওপর অনৈতিক শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। যেমন– সয়াবিন তেলের সঙ্গে গুঁড়া মসলা, হলুদ-মরিচের গুঁড়া, চা-পাতা বা আটা-ময়দা ও পোলাওর চাল নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এ জন্য ছোট ব্যবসায়ীদের বাড়তি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে সংকট ও দাম বাড়ার জন্য বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণকে দায়ী করছেন তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে সয়াবিন ও পামঅয়েলের দাম বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে তেল পরিশোধনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন দেশে দাম বাড়ানোর জন্য সর্বশেষ গত ৯ এপ্রিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। তবে সরকার তাতে সায় দেয়নি।

ভোক্তা-সংশ্লিষ্টরা বলেন, শুধু টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না, বাজারে তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কারসাজির সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের রুখতে সরকারকে কঠোর তদারকি করতে হবে। অন্যথায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের দুর্ভোগ বাড়তে থাকবে।

আমদানি পরিস্থিতি

এনবিআরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) দুই লাখ ৫৯ হাজার ৪৭৬ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৭৭ হাজার ৪৬০ টন, ফেব্রুয়ারিতে এক লাখ ৭ হাজার ৬৯৩ টন ও মার্চে ৭৪ হাজার ৩২৩ টন এসেছে। এই সময়ে পরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ১০ টন।

অন্যদিকে একই সময়ে অপরিশোধিত পামঅয়েল আমদানি হয়েছে চার লাখ ২২ হাজার ১৭৭ টন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে এক লাখ ৩০ হাজার ৭০০ টন, ফেব্রুয়ারিতে এক লাখ ৬৯ হাজার ৩৮৪ টন এবং মার্চে এক লাখ ২২ হাজার ৯২ টন। একই সময়ে পরিশোধিত সানফ্লাওয়ার অয়েল আমদানি হয়েছে প্রায় সাত লাখ কেজি।

ডিলারদের অভিযোগ, কোম্পানি তেল কম দিচ্ছে

কারওয়ান বাজারের তীর ব্র্যান্ডের ডিলার এ টি এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মো. সেলিম বলেন, কোম্পানি আগের তুলনায় তেল অনেক কম দিচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে দেড়-দুইশ কার্টন তেল দিত। এখন দিচ্ছে ১০০ কার্টন বা এর চেয়েও কম। পাশাপাশি কমিশনও কমিয়ে দিয়েছে। আগে লিটারে কমিশন পাওয়া যেত চার টাকা। এখন দিচ্ছে দুই থেকে আড়াই টাকা। তেল ও কমিশন কম দেওয়ার কারণ কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোম্পানির লোকের সঙ্গে কথা বলা যায় না।

খোলা তেলের ব্যাপারে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, বোতলজাত তেলের সংকট চলছে কয়েকদিন ধরে। খোলাবাজারেও টান রয়েছে। এ কারণে বাজার বাড়তি।

কোম্পানিগুলোর দাবি, সরবরাহ স্বাভাবিক

বাজারে পুষ্টি ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল সরবরাহ করে টি কে গ্রুপ। এই গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তাসলিম বলেন, গত দুই মাসে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম টনপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলার বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি টন সয়াবিনের দাম প্রায় ১৩৩০ ডলার এবং পামঅয়েলের দাম ১২১০ ডলার। যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম ও জাহাজভাড়া কিছুটা বেড়েছে। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বর্তমানে উৎপাদন খরচের চেয়ে লিটারে অন্তত ১৫ টাকা কম দামে বিক্রি করছে কোম্পানিগুলো। লোকসান হলেও সরবরাহ সচল রাখা হচ্ছে। মিল গেটে তেলের জন্য ট্রাকের কোনো সিরিয়াল নেই। ট্রাক এসে সঙ্গে সঙ্গে তেল বোঝাই করে চলে যাচ্ছে।

তবে বাজারে বোতলজাত তেলের সংকটের পেছনে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীদের মজুত করার প্রবণতা থাকতে পারে বলে মনে করেন টি কে গ্রুপের এই কর্মকর্তা। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় মধ্যস্তরের ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করে রাখতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর নজরদারি করার সুযোগ নেই।

ফ্রেশ ও নাম্বার ওয়ান ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল বাজারজাত করে মেঘনা গ্রুপ। গ্রুপটির মহাব্যবস্থাপক মুজিবুর রহমান বলেন, দুই-তিন মাস ধরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেশি। দেশের দাম সমন্বয় করার জন্য অনেক দিন ধরে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারীরা আবেদন করলেও সরকার সাড়া দিচ্ছে না। মেঘনা গ্রুপ প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০ টন সয়াবিন তেল (বোতল ও খোলা) এবং প্রায় ৪০০ টন পামঅয়েল বাজারে সরবরাহ করছে– এমন তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, মিল থেকে সরবরাহ কমানো হয়নি। ডিলার বা খুচরা কোনো পর্যায়ে গরমিল থাকতে পারে। তাঁর ভাষ্য, খোলা তেলের দাম বেশি হওয়ায় কেউ কেউ বড় বোতল (পাঁচ লিটার) খুলে বিক্রি করছে।

সিটি গ্রুপের পরিচালক লুতফুল কবির শাহীনও জানিয়েছেন বাজারে তাদের তীর ব্র্যান্ডের তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক নিয়মে চলছে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ভোজ্যতেলের এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাজারে যে ধরনের তদারকি জোরদার থাকার কথা বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিচ্ছেন। নিম্ন আয়ের ভোক্তার স্বার্থে সরকারকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরবরাহ বেড়েছে দাবি ভোক্তা অধিদপ্তরের

বাজারে তেলের সংকট বাড়তে থাকলেও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দাবি গত সপ্তাহের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে। অধিদপ্তরের পরিচালক আব্দুল জলিল বলেন, বাজার নিয়মিত তদারকি হচ্ছে। অর্থাৎ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে বাজার। আগের তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে। দুই-তিন দিনের মধ্যেই সরকার শুল্ক কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এতে বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us
সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়