
নিজস্ব প্রতিবেদক | শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

গত এক মাসে (মে) সারাদেশে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৬৬টি ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩০৫ জন এবং নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৭৮ জন সাংবাদিক।
শুক্রবার (৫ জুন) মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত মে-২০২৬-এর মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সংগঠনটি জানায়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, সংগৃহীত তথ্য এবং ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা এপ্রিলের তুলনায় কমেছে। মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হলেও, এপ্রিলে ৯৮টি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ৬ জন এবং আহত হয়েছিলেন ৫৩৩ জন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনা আধিপত্য বিস্তার, দলীয় কোন্দল, রাজনৈতিক বিরোধ এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। এছাড়া রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও সহিংসতার অন্তত আটটি ঘটনায় ১৩৪টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এইচআরএসএস জানায়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননা ও আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অভিযোগে সংঘটিত ৬৬টি গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৮ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। একজন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে এবং দুটি মামলায় আট সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। মে মাসে ১০টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি বা পরোক্ষ বাধার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ৪১ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। একই সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে ১১টি ঘটনায় ছয়জনকে আটক এবং সাতটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে কারাগারে অন্তত সাতজন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সীমান্ত পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক ছিল। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ছয়টি ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। বিএসএফের হাতে আটক হয়েছেন ১৪ জন। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিনজন নিহত এবং একজন আহত হয়েছেন।
শ্রমিক অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ৫৭টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ১৩০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা ও সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় আরও ৪১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে এইচআরএসএস জানায়, মে মাসে ৩০৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার, যাদের ৫৭ জনই শিশু ও কিশোরী। ১৭ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৭৬ জন নারী ও শিশু।
এছাড়া পারিবারিক সহিংসতায় ৬৩ জন নারী নিহত, ৩১ জন আহত এবং ৪৫ জন আত্মহত্যা করেছেন। এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন একজন নারী।
শিশু নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ২১৫ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদনের সার্বিক মূল্যায়নে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্ত সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।”
তিনি মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারের আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ারও আহ্বান জানান।
