
নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, নতুন করে এই রোগের সংক্রমণ ভাবিয়ে তুলছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলের মশা হিসেবে পরিচিত ‘অ্যানোফেলিস’ মশার উপস্থিতি খোদ রাজধানীতে মেলায় নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই দেশে ৪৬০ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে।
সাধারণত ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফেলিস মশা পাহাড়ি এলাকায় দেখা গেলেও সাম্প্রতিক এক জরিপ ভিন্ন চিত্র দিচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের তথ্যমতে, গত ৩ থেকে ৭ এপ্রিল ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ছয়টি জোনে এই মশার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৯৮টি এবং ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ওই এলাকাগুলোতে প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি অ্যানোফেলিস মশার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা ঢাকায় এ পর্যন্ত ৯ প্রজাতির অ্যানোফেলিস মশা পেয়েছি। যেহেতু বাহক মশার ঘনত্ব এখানে বেশ ভালো, তাই রাজধানীতে ম্যালেরিয়া ছড়ানোর আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৬২ জন, যার মধ্যে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আক্রান্ত ৪৬০ জনের প্রায় সবাই রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজারসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলার বাসিন্দা। তবে সম্প্রতি বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু এই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি বিদেশ সফরে থাকাকালীন নাকি দেশেই সংক্রমিত হয়েছেন, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও ঢাকায় বাহক মশার উপস্থিতি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বিএমইউ ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফজলে রাব্বী চৌধুরী সতর্ক করে জানান, সিভিয়ার ম্যালেরিয়া দ্রুত মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকেজো করে দেয়। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুকে আক্রান্ত করতে পারে, যা মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
দেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বাড়লেও সাধারণ ওষুধের দোকানে এর কোনো প্রতিষেধক বা ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারিভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরই কেবল আক্রান্তদের ওষুধ সরবরাহ করে থাকে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে জীবাণু বহনকারী মানুষের যাতায়াত এবং ঢাকায় অ্যানোফেলিসের উপস্থিতি বিবেচনায় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচি নতুন করে সাজানো প্রয়োজন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আশ্বস্ত করে জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, বর্তমানে দেশের পাহাড়ি অঞ্চল বা বিদেশ ফেরতদের মধ্যেই এই রোগ সীমাবদ্ধ। তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসার সরঞ্জাম আমাদের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
করোনা-পরবর্তী সময়ে পুরনো অনেক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে। এ অবস্থায় এডিস মশার পাশাপাশি অ্যানোফেলিস মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে ডেঙ্গুর মতো ম্যালেরিয়াও রাজধানীর বড় বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
