
নিজস্ব প্রতিবেদক | শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

চট্টগ্রাম নগরে বন বিভাগের একটি পূর্ণাঙ্গ শহর রেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বনায়ন সম্প্রসারণ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা, সেই চট্টগ্রাম শহর রেঞ্জের কাছে নগরের বনভূমি কিংবা গাছপালারই কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। ৬০ বর্গমাইলের এ মহানগরে কতটুকু বনভূমি রয়েছে, কোন প্রজাতির কত গাছ আছে কিংবা গত দুই দশকে কতটা সবুজ হারিয়েছে–এসব প্রশ্নের উত্তরও নেই সরকারি কোনো নথিতে।
প্রশ্নের মুখে শহর রেঞ্জের কার্যকারিতা
২০০১ সালে গঠিত চট্টগ্রাম শহর রেঞ্জ বর্তমানে উত্তর বন বিভাগের ১৩টি রেঞ্জের একটি। কিন্তু বনভূমি নেই, নেই বনায়ন কর্মসূচিও। ফলে নগরবাসীর প্রশ্ন–শহর রেঞ্জের অস্তিত্ব থাকলেও নগরের পরিবেশ ও সবুজ রক্ষায় এর বাস্তব ভূমিকা কতটুকু? বন বিভাগের কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন, স্বাধীনতার পর থেকে চট্টগ্রাম শহরে বনসম্পদনিয়ে কোনো সমন্বিত জরিপ হয়নি। ফলে দ্রুত নগরায়ণ, পাহাড় কাটা ও সবুজ ধ্বংসের মধ্যেও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র অজানাই থেকে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা বাচ্চু মিয়া এ বিষয়ে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরে কতটুকু বনভূমি বা কী পরিমাণ গাছগাছালি রয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই। স্বাধীনতার
পর এ বিষয়ে কোনো জরিপও হয়নি। বর্তমানে শহর রেঞ্জের কাজ মূলত অবৈধ কাঠ পাচার প্রতিরোধ, করাতকল মনিটরিং ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ।’
তিনি জানান, এক সময় শহরে বন বিভাগের নিজস্ব কিছু পাহাড় ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেগুলো দখল হয়ে গেছে। ফলে বর্তমানে নগরে বন বিভাগের নিজস্ব কোনো ভূমিও নেই।
নগরের বনসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের পূর্ণাঙ্গ জরিপ, নিয়মিত মনিটরিং এবং নতুন নগর বনায়ন কর্মসূচি ছাড়া চট্টগ্রামের পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলেছেন পরিবেশবিদরা।
১৮ বছর ধরে বন্ধ নগর বনায়ন
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত নগর বনায়ন প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯৩ কিলোমিটার সড়ক বনায়ন করা হয়। পাশাপাশি সিআরবি, টাইগারপাস, পাহাড়তলী, ফয়’স লেক, চট্টগ্রাম সেনানিবাস, চিড়িয়াখানা, কাস্টম একাডেমি ও বিসিএসআইআরের বিভিন্ন এলাকায় শত শত হেক্টর জমিতে ব্লক বাগান গড়ে তোলা হয়। সর্বশেষ ২০০৮ সালে মতিঝর্ণা এলাকায় ১০ হেক্টর জমিতে ২৫ হাজার গাছ রোপণের পর নগরে আর কোনো বড় বনায়ন কর্মসূচি নেয়নি শহর রেঞ্জ বন বিভাগ।
পাহাড় কাটছে, বাড়ছে কংক্রিটের জঙ্গল
একদিকে বনায়ন বন্ধ, অন্যদিকে প্রতিনিয়ত কাটা হচ্ছে পাহাড়। পাহাড়ের ঢালে ও সবুজ এলাকায় গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। এতে নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘পাহাড়, নদী ও সাগরের অনন্য সমন্বয়ে চট্টগ্রাম পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ নগর। এমন নজির সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ও সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অভাবে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এই বৈচিত্র্য।’ তিনি বলেন, ‘বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিডিএর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নগরের পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়।’
গবেষণায় মিলেছে ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদ
সরকারি কোনো জরিপ না থাকলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেলের নেতৃত্বে ২০২১ সালে সিআরবি এলাকায় পরিচালিত এক গবেষণায় পাওয়া যায় ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান। এর মধ্যে রয়েছে ১৮৩ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ, ৯টি বিপন্ন প্রজাতি এবং ৬৬টি বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ। শতবর্ষী গর্জন, শিরীষসহ ৮৮টি বৃহৎ বৃক্ষও চিহ্নিত করা হয় গবেষণায়।
ওমর ফারুক রাসেল বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরে এখনও বৈচিত্র্যময় ও ঔষধি গুণসম্পন্ন বহু উদ্ভিদ রয়েছে। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণের কারণে এসব সম্পদ হুমকির মুখে। এখনই সংরক্ষণ না করলে অনেক প্রজাতি হারিয়ে যেতে পারে।’
বনায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (চসিক) মঈনুল হোসেন চৌধুরী জয় বলেন, সিটি করপোরেশন বরাদ্দ ছাড়াই শহরের সড়ক ডিভাইডার, পার্ক ও স্কুলগুলোতে সৌন্দর্যবর্ধক গাছ লাগিয়ে থাকে। এসব গাছ বিভিন্ন তামাক কোম্পানি ও সরকারি অনুদান থেকে প্রাপ্ত। নিজস্ব জনবল দিয়েই এই পাঁচ লক্ষাধিক গাছের রোপণ ও পরিচর্যা করা হয়।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে কোনো সরকারি প্রকল্প ও বরাদ্দ না থাকায় শহরে বন বিভাগের কোনো বনায়ন কার্যক্রম নেই। তবে সরকার উদ্যোগ ও বাজেট দিলে বন বিভাগ ফের এই কাজ করতে প্রস্তুত।
