নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
এক দশক আগেও ঘড়ি পরা হতো কেবল সময় দেখার জন্য কিংবা ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হিসেবে। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তন সেই চেনা ঘড়িকে রূপান্তর করেছে এক মিনি-মেডিক্যাল ল্যাবে, যা এখন সার্বক্ষণিক জড়িয়ে থাকে আমাদের কবজিতে। বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশে যখন হৃদরোগের (কারডিওভাসকুলার ডিজিজ) ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, তখন ‘স্মার্টওয়াচ’ বা পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি অনেকের জন্য আক্ষরিক অর্থেই ‘লাইফ সেভার’ বা জীবনরক্ষাকারী কবজ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
কবজিতেই যখন ২৪ ঘণ্টার ডাক্তার
হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো ঘটনাগুলো সাধারণত হুট করে ঘটে না; শরীর আগে থেকেই কিছু মৃদু সংকেত দিতে শুরু করে, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে টের পাওয়া কঠিন। আধুনিক স্মার্টওয়াচগুলো মূলত এখানেই বিপ্লব ঘটিয়েছে।
অ্যাপল ওয়াচ, স্যামসাং গ্যালাক্সি ওয়াচ কিংবা ফিটবিটের মতো ডিভাইসে থাকা অপটিক্যাল হার্ট রেট সেন্সর এবং ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি) প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত ব্যবহারকারীর হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ করে। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা কিংবা স্বাভাবিকের চেয়ে হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে বা কমে গেলে এই ডিভাইসগুলো তাৎক্ষণিক নোটিফিকেশন পাঠায়। ফলে বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটার আগেই মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: হৃদরোগের নীরব মহামারি
বাংলাদেশে হৃদরোগের ঝুঁকি এখন আর কেবল বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; স্থূলতা, মানসিক চাপ, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং কায়িক শ্রমের অভাবে তরুণ প্রজন্মও এর শিকার হচ্ছে। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এবং বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জিনগত কারণেই হৃদরোগের ঝুঁকি পশ্চিমা বিশ্বের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশনে ভুগছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছেন, যার ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ।
এই বাস্তবতায় দেশের শহুরে কর্মজীবী এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে স্মার্টওয়াচের ব্যবহার কেবল ফ্যাশন নয়, একটি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা হয়ে উঠছে।
ফিচারগুলো কীভাবে জীবন বাঁচায়?
ইসিজি এবং অ্যারিথমিয়া ডিটেকশন: স্মার্টওয়াচের পেছনে থাকা ইলেকট্রোডগুলো হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক সংকেত নিখুঁতভাবে পড়তে পারে। এটি ‘অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন’ বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন শনাক্ত করে, যা স্ট্রোকের প্রধান কারণগুলোর একটি।
ফল ডিটেকশন: কোনও ব্যক্তি যদি হঠাৎ স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়ে মাটিতে পড়ে যান এবং ১ মিনিটের মধ্যে সাড়া না দেন, তবে স্মার্টওয়াচ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার অবস্থানসহ (জিপিএস লোকেশন) জরুরি যোগাযোগ নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে দেয়।
স্ট্রেস ও স্লিপ ট্র্যাকিং: হৃদরোগের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো মানসিক চাপ এবং অনিদ্রা। সারাদিনের স্ট্রেস লেভেল এবং রাতের ঘুমের গভীরতা পরিমাপ করে এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীকে লাইফস্টাইল পরিবর্তনের তাগিদ দেয়।
চিকিৎসকদের মতামত ও সীমাবদ্ধতা
প্রযুক্তি জীবন বাঁচাতে সাহায্য করলেও চিকিৎসকরা একে পুরোপুরি হাসপাতালের ইসিজি বা লাইফ সাপোর্ট মেশিনের বিকল্প হিসেবে দেখতে নারাজ। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্টওয়াচ আপনাকে কেবল ‘সতর্ক’ করতে পারে, কিন্তু এটি কোনও চূড়ান্ত রোগ নির্ণয়কারী যন্ত্র নয়।
স্মার্টওয়াচের কোনও রিডিংয়ে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে প্যানিক বা আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং ল্যাব টেস্ট করানোই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে প্রাথমিক সতর্কবার্তা হিসেবে এর কার্যকারিতা এখন স্বীকৃত।
অ্যাপল হার্ট স্টাডির একটি বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টওয়াচ প্রায় ৮৪% ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন) শনাক্ত করতে সক্ষম, যা স্ট্রোক প্রতিরোধের পথ সুগম করে।