
নিজস্ব প্রতিবেদক | সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

টোলবাবদ আদায়কৃত শত শত কোটি টাকা চুরি করছে ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ‘ঘনিষ্ঠজন’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ হোসাইন জনির প্রতিষ্ঠান ‘রেগনাম রিসোর্সেস লি:’। তাকে মেঘনা-গোমতী সেতুসহ অনেক সেতুর টোল আদায়ের ‘কার্যাদেশ’ দেয়া হয়। এজন্য হয়নি কোনো টেন্ডার। ধার ধারতে হয়নি কোনো সরকারি ক্রয়-নীতিমালার (পিপিআর)। আর ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) সিস্টেমের আওতায় শুধু মেঘনা-গোমতী টোলপ্লাজাই নয়, দেশের অন্তত ৬৭টি সেতুর অধিকাংশেরই টোল আদায় হচ্ছে তার সরবরাহকৃত ‘ইউনিফাইড টোল সিস্টেম’ সফটওয়্যার দিয়ে। সফটওয়্যার সিস্টেম থেকে গাড়ি পাসিংয়ের ডাটা মুছে দিয়ে চুরি ‘রেগনাম রিসোর্সেস লি:’ এ যাবত হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। অথচ টোল আদায়ের জন্য সরকারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কোনো চুক্তি নেই। রীতিমতো গায়ের জোরে আদায় করে চলেছে টোল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ যেন দিনে-দুপুরে ডাকাতি।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠজন মোহাম্মদ হোসাইন জনি কখনো পাতানো টেন্ডারে, কখনো বিনা টেন্ডারে কার্যাদেশ বাগিয়ে নিয়েছে টোল আদায়ের কার্যাদেশ।
আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সফটওয়্যারভিত্তিক এই দুর্নীতি শনাক্ত করা কঠিন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে রেগনাম রিসোর্সের জালিয়াতি, প্রতারণা ও আত্মসাতের ঘটনা আড়ালে রয়ে গেছে। হাসিনা সরকার গেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারও গত হয়েছে। এখন চলছে বিপুল ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকার। সরকার পরিবর্তন হলেও মোহাম্মদ হোসেন জনির ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার টোল চুরির কোনো পরিবর্তন নেই। কোথায়, কীভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেÑ সেই খবর সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের নেই। জানা গেছে, সড়ক ও সেতু দফতরের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে হাত করে রেগনাম চুরি করছে এই অর্থ। প্রক্রিয়াটির সঙ্গে পদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা সম্পৃক্ত থাকায় রেগনামের মতো প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই নির্বিঘেœ শত শত কোটি টাকার টোল চুরির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
সড়ক ও সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, হাসিনার শাসনামলের দেড় দশক তৎকালীন সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম আর্থিক ও সেবা খাত লুণ্ঠনের একচ্ছত্র সা¤্রাজ্য গড়ে তোলেন। জুলাই বিপ্লবের পর হাসিনা পালিয়ে গেলেও প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে আওয়ামী নেতারা অবৈধভাবে নিজেদের কোম্পানির মাধ্যমে টোল আদায় কার্যক্রম চালিয়ে আসছে নির্বিঘেœ। এসবের কয়েকটি হচ্ছেÑ অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ‘কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস), ওবায়দুল কাদেরের ‘ঘনিষ্ঠজন’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ হোসাইন জনির ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিডেট’, আমিনুল হক শামীমের ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ, মোহাম্মদ কালাম হোসেন মালিকানাধীন ‘ইউডিসি কোম্পানি লি:’, আওয়ামী শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক এবং প্রকৌশলী মেহবুব কবির মালিকানাধীন ‘এশিয়ান ট্রাফিক টেকনোলজি লিমিটেড (এটিটি)’ এবং হাসিনার পালিত কসাইখ্যাত (বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় বিচারের মুখোমুখি) জিয়াউল আহসানের ‘পেন্টা গ্লোবাল’। এ প্রতিষ্ঠানগুলোই ঘুরেফিরে দেশের ৬৭টি টোলপ্লাজা এবং সড়ক থেকে টোল কালেকশন কব্জায় রেখেছে। আনিসুল হক এবং জিয়াউল আহসান মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারের টোলবাবদ প্রাপ্য শত শত কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে। তবে এ প্রক্রিয়ার ব্যতিক্রম হচ্ছে ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’।
অনুসন্ধানের তথ্যমতে, হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার বছর (২০২৩-২৪) অর্থবছরে দেশের তিনটি সেতু (পদ্মা-যমুনা-মোক্তারপুর) টোল আদায় করেছে এক হাজার ৪৭২ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। মেঘনা-গোমতী সেতু থেকে বছরে টোল ওঠে ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এটি শুধু সরকারের কাছে প্রদর্শিত টোলের হিসাব। কিন্তু যে টোলের কোনো হিসাব নেই, অর্থাৎ টোলের যে পরিমাণ অর্থ চুরি হচ্ছে সেটি এই অঙ্কের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’ মেঘনা-গোমতী টোলপ্লাজার টোল ‘আদায়’ যতটা রেকর্ডপত্রে দেখাচ্ছে, আত্মসাৎ করছে এর কয়েকগুণ।
সীতাকু- (বড় দারোগাহাট), মানিকগঞ্জ (বাথুলি), নেত্রকোনা (জারিয়া), চরসিন্দুর, কুমারখালীর (ফরিদপুর) টোলপ্লাজায়ও রেগনাম রিসোর্স সফটওয়্যার থেকে রেকর্ড মুছে দিয়ে টোলের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র বলছে, রেগনাম অত্যন্ত চাতুর্যের সঙ্গে টোলপ্লাজার ‘ইউনিফাইড টোল সিস্টেম-ইউটিএস’ সার্ভার লগ, ডাটাবেজে এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য মুছে ফেলছে। তবে যত চাতুর্যের সঙ্গেই ভেহিকেল পাসিংয়ের ভিডিও ফুটেজ, টোল আদায়ের ডাটাবেজ মুছে ফেলুক না কেন, মুছে দেয়া শত শত পৃষ্ঠার ডাটাবেজ এবং ভিডিও ফুটেজ এখন এ প্রতিবেদকের হস্তগত। জালিয়াতির মাধ্যমে টোলের টাকা চুরির দু-একটি দৃষ্টান্ত দিলেই পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। এর দু-একটি নমুনা বিশ্লেষণ করলে ‘চুরি’ খোলাসা হয়ে যায়।
চলতি বছর ১৭ মার্চ। মেঘনা-গোমতী সেতু টোলপ্লাজার ৩ নম্বর লেন। এই লেনটির ক্যামেরা বন্ধ রেখে শত শত গাড়ির টোল আদায় করে ‘রেগনাম রিসোর্স লি:’। টোলপ্লাজা অতিক্রমকৃত বহু গাড়িরই ভেহিকেল রেজিস্ট্রেশন নম্বর (ভিআরএন), ভেহিকেল টাইপ (গাড়ির ধরন), গাড়ির সংখ্যা, লেনওয়ারি গাড়ির ইমেজ, ফুটেজ রয়েছে। অথচ নেই কোনো ট্রানজেকশন নম্বর। ওই দিন বেলা ১২টা ১০ মিনিট থেকে ১টা ৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের মধ্যে ৩২টি গাড়ি টোলপ্লাজা অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে মাত্র ১২টি গাড়ির থেকে টোল আদায় করা হয়েছে। ২০টি গাড়ির টোল আদায়ের কোনো ট্রানজেকশন নম্বর ইউটিসিএস রেকর্ডে নেই। অর্থাৎ মুছে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ নম্বর লেনে (সিরিয়াল নম্বর ১ ও ২) ‘আন-রেজিস্ট্রার্ড’ (টিএক্সএন-৭৯৪৬১৮, ৭৯৪৬১৯) দুটি টেম্পো (ইমেজ নং-৯০৯৩২০২৬০৩১১৭০০৯৫৬৪৪, ৯০৯৩২০২৬০৩১১৭০০৯৫৬৪৮) ১৫ টাকা করে টোল আদায় করা হয়। সিরিয়াল নং-৩ (টিএক্সএন-৭৯৪৬২০), মিডিয়াম ট্রাক (ভেহিকেল রেজিস্ট্রেশন নং-গাজীপুর-ম-১১-০০৪৮) থেকে ১৫০ টাকা টোল আদায় করা হয়েছে। (ইমেজ নং-লেন-৩ ৯০৯৩২০২৬০৩১১৭০০৯৫৬৪৭)। এর পরপরই দেখা যায়, বেলা ১২টা ১০ থেকে ১২টা ১০ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের মধ্যে ৮টি গাড়ি থেকে ১০০৯ টাকা করে টোল আদায় করেছে (মোট ৭০৬৩ টাকা)। ১২টা ১৮ মিনিট ১০ সেকেন্ড থেকে ১টা ৩ মিনিট ২৭ সেকেন্ড পর্যন্ত ১৩টি গাড়ি থেকে ৪৩৫ টাকা করে (মোট-৫৬৫৫ টাকা) টোল আদায় করা হয়েছে। সেগুলোর ইমেজ থাকলেও ট্রানজেকশন রেকর্ড মুছে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৫৩ মিনিটের মধ্যে আদায়কৃত টোল থেকে রেগনাম ১২ হাজার ৭১৮ টাকা ‘নাই’ করে দিয়েছে।
একই তারিখ রাতে ‘লেন-২’ এর ক্যামেরা বন্ধ রেখে টোল আদায় করা হয়। এই লেনে রাত ১১টা ২০ মিনিট ১৪ সেকেন্ট থেকে রাত ১১টা ৫০ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড পর্যন্ত ৩৪টি গাড়ি থেকে টোল আদায় করা হয়। এ সময় প্রায় সব গাড়ি থেকে টোল আদায় করা হয় ৪৬৭ টাকা করে। এর মধ্যে ২২টি গাড়ির ইমেজ থাকলেও কোনো ট্রানজেকশন রিপোর্ট নেই। অর্থাৎ ২ নম্বর লেন থেকে আদায়কৃত টোলের ১০ হাজার ২৭৪ টাকা ‘হাওয়া’ করে দেয়া হয়েছে। হাওয়া করে দেয়া এই টাকার হিসাবে রেগনাম ইউটিসিএস সার্ভার থেকে মুছে ফেলেছে। এমন আরো বহুমাত্রিক জালিয়াতির হাজার হাজার প্রমাণ রয়েছে প্রতিবেদকের হাতে, যা সড়ক ও সেতু বিভাগে ওবায়দুল কাদের গংদের লুটতন্ত্রের এক অন্যন্য স্মারক।
বিশ্লেষজ্ঞরা মনে করেন, রেগনাম রিসোর্স এমন নিখুঁতভাবে টোলের টাকা চুরি করেছে যে, আইটি জ্ঞানসম্পন্ন ক্রেডিবল কোনো অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করালেই কেবল রেগনামের অর্থ চুরির প্রকৃত পরিমাণ নিরূপণ সম্ভব।
সীতাকু- (বড় দারোগাহাট), মানিকগঞ্জ (বাথুলি), নেত্রকোনা (জারিয়া), চরসিন্দুর, কুমারখালীর (ফরিদপুর) টোলপ্লাজায় একই দশা। একই হারে টোল চুরি করছে-মর্মে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেডের বিরুদ্ধে। এসব টোলপ্লাজা থেকে গত এক দশকে হাতিয়ে নেয়া শত শত কোটি টাকার প্রমাণাদি প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
সড়ক ও সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন সিস্টেমের মাধ্যমে ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’ ১২টি লেনের মধ্যে অন্তত ৬টি লেন থেকে টোল আদায় করছে। এর মধ্যে কয়েকটি লেনে রয়েছে বিশেষায়িত সার্ভিস। দ্রুত পাস হওয়ার জন্য ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ সুবিধার আওতায় বিকাশ, নেক্সাস-পে, রকেট, উপায়সহ স্মার্ট পেমেন্টের মাধ্যমে টোল আদায় করছে রেগনাম।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার তিন মাস আগে মেঘনা-গোমতী টোলপ্লাজায় টোল আদায়ের কার্যাদেশ পায় ওবায়দুল কাদের, শামীম ওসমান ও মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মোহাম্মদ হোসাইন জনির প্রতিষ্ঠান ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’। ওই বছর ৬ এপ্রিল রেগনামের ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা। মেঘনা-গোমতীর দ্বিতীয় টোলপ্লাজার ১২টি বুথ থেকে টোল আদায় শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ৬টি বুথের টোল আদায় শুরু হয় ইটিসি পদ্ধতিতে। একেকটি টোল আদায়ে সময় নেয়ার কথা তিন সেকেন্ডে।
ওই অনুষ্ঠানে ‘রেগনাম রিসোর্সেস লি:-এর মালিক মোহাম্মদ হোসেন জনি ছাড়াও ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন ওবায়দুল কাদের, অনুষ্ঠানস্থলে ছিলেন সওজ-এর তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান, ঢাকা জোনের তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুজ উদ্দিন খান, নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ নাজমুল হক, প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানা ফেরদৌস বিথীসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে।
জানা গেছে, ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেডকে মেঘনা-গোমতীর টোল আদায়ের জন্য কোনো কার্যাদেশই দেয়া হয়নি। ওবায়দুল কাদের, মির্জা আজম গংয়ের মুখের কথায় ‘কাজে লেগে’ পড়ে রেগনাম। মৌখিক নির্দেশে ২০২৪ সালের ৬ এপ্রিল থেকে অদ্যাবধি টোল আদায় করছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র বলছে, ‘রেগনাম রিসোর্সেস লি:-এর জয়েন্ট স্টকে নিবন্ধিত একটি কোম্পানি বটে। তবে এটি মোহাম্মদ হোসেন জনির মালিকানাধীন একটি বেনামি প্রতিষ্ঠান। রেকর্ডপত্রে কখনো প্রতিষ্ঠানটির ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ দেখানো হয়েছে স্ত্রী শাহনাজ বেগম মিতুকে। কখনো তাকে রাখা হয়েছে রেগনামের ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে। যেখানে শাহনাজ বেগম মিতু এটির ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ সেখানে মোহাম্মদ হোসেন জনির নাম উল্লেখ রয়েছে ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে। আর যেখানে স্ত্রী ‘চেয়ারম্যান’ সেখানে মোহাম্মদ হোসেন জনি নিজেকে দাবি করেছেন ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’। তবে প্রতিটি সংশোধনীতে পুত্র সাদমান সাকিফকে রাখা হয়েছে ‘ডিরেক্টর’ হিসেবে। নিবন্ধিত ‘রেগনাম রিসোর্স লিমিটেড’-এর ঠিকানা দেখানো হয়েছে, ‘রহমানস রেগনাম সেন্টার’, ১৯১/বি, তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোড, ঢাকা-১২০৮। যাতে শাহনাজ বেগম মিতুর টিআইএন নম্বর-০৭৭-১০৬-৬২৬১, সার্কেল-২৩ উল্লেখ রযেছে। তার এনআইডি নম্বর: ২৬১১৮৮৪৫৩৫৭৬৭। পেশা উল্লেখ করা হয়েছে ‘ব্যবসায়ী’।
রেগনামের ১৫ হাজার শেয়ারের মধ্যে ৯ হাজার শেয়ার রয়েছে শাহনাজ বেগম মিতুর নামে। পুত্র সাদমান সাকিফের রয়েছে ছয় হাজার শেয়ার। সাদমানের টিআইএন নম্বর-০৭৭-১১০-৪৯৭৫। করাঞ্চল-২৩। তার কোনো এনআইডি নেই। পাসপোর্ট নম্বর-কিউ-০১৫১৪৯২। মোহাম্মদ হোসেন জনির পুত্র সাদমান সাকিফের ‘পেশা’র ঘরটি ফাঁকা। প্রতিষ্ঠানটির অথোরাইজ ক্যাপিটাল ধরা হয়েছে তিন কোটি টাকা। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছেÑ সর্বত্রই মোহাম্মদ হোসেন জনির টিআইএন নম্বর, ফোন নম্বর, এনআইডি নম্বর গোপন রাখা হয়েছে।
‘রেগনাম রিসোর্স লিমিটেড’-এর অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ হোসেন জনির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার ব্যবহৃত ফোন নম্বরগুলোতে কল করেও পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ তার অফিশিয়াল ই-মেইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রতিউত্তর পাওয়া যায়নি। পরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জনাব তানভীর জানান, এ বিষয়ে আমি এখন কথা বলতে পারব না। আপনি বরং অফিসে আসুন।
কী বলছে দুদক : মেঘনা-গোমতী টোলপ্লাজায় দুর্নীতির দায়ে গত বছর ১২ অক্টোবর শেখ হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। তাতে ২০১৬ সালে আনিসুল হকের পরোক্ষ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম লিমিটেডকে (সিএনএস লিমিটেড) সরকারি ক্রয়বিধি উপেক্ষা করে একক উৎসভিত্তিক পদ্ধতিতে পাঁচ বছরের জন্য টোল আদায়ের কাজ দেয়া হয়। সিএনএস পাঁচ বছরে ৪৮৯ কোটি ৪৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা বিল গ্রহণ করে। সব মিলিয়ে সিএনএস লিমিটেডকে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যাদেশ দেয়ার ফলে সরকারের ৩০৯ কোটি ৪২ লাখ ৪৫ হাজার ৮৯০ টাকা ক্ষতি হয়। দ-বিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭– এর ৫(২) ধারায় দায়েরকৃত মামলায় শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হয়। আসামির তালিকায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তৎকালীন গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খান, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব এম এ এন ছিদ্দিক, সওজের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী, সিএনএস লি:-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনীর-উজ-জামান চৌধুরী, প্রতিষ্ঠানটির দুই পরিচালক সেলিনা চৌধুরী ও ইকরাম ইকবালের নাম রয়েছে।
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হয় দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আকতার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, মামলাটির তদন্ত চলছে। নতুন কমিশন এলেই আমরা চার্জশিটের অনুমোদন চাইব। রেগনাম রিসোর্স সম্পর্কে বলেন, বিভিন্ন দফতর থেকে রেগনাম রিসোর্সের বিষয়ে অভিযোগ জমা পড়েছে। কমিশন নিযুক্ত হলে আমরা অনুসন্ধানের অনুমোদন চাইব।
