মঙ্গলবার ২৩শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Advertise with us

অন্য দেশ থেকে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশিদের পাচার ও বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ২২ জুন ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

অন্য দেশ থেকে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশিদের পাচার ও বিক্রি

ভালো বেতনের চাকরির দেওয়ার কথা বলে আমাকে বৈধ কোনও কাজ না দিয়ে একটি চাইনিজ স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। সেখানে চাইনিজ নাগরিক ঝো ওয়াং আমাকে দিয়ে ময়লার ড্রেন ক্লিনারের কাজ করাতে বাধ্য করে। আমি কাজ করতে না চাইলে সে আমাকে মারধর করে বলে যে, তোকে আমি ৩ হাজার ডলার দিয়ে কিনে এনেছি। কাজ না করলে সেই টাকা ফেরত দিতে হবে। না হলে আমাকে মেরে ফেলবে। টাকার জন্য আমাকে বেঁধে ভিডিও কলে দেশে পরিবারকে নির্যাতনের দৃশ্য দেখায়, পরিবার আমাকে বাঁচাতে সেই টাকা দিতে বাধ্য হয়। এভাবেই তার নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন কম্বোডিয়ায় সাইবার দাসত্বের শিকার একজন ভুক্তভোগী। দেশে ফিরে এসে তিনি বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছেন। মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।

শুধু ওই ব্যক্তিই ভুক্তভোগী নন। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে ১৫ হাজার ৯২১ জন কর্মী চাকরি নিয়ে কম্বোডিয়া যান। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে চলতি জুন মাসেই পরপর চারদিনে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে ২২১ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন।

তাদের মধ্যে গত ১২ জুন থেকে ৩৭ জন, ১৩ জুন ৫৪ জন এবং ১৭ জুন ৭৮ ভুক্তভোগী শূন্য হাতে দেশে ফেরত আসেন। এর আগে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে ৮ জন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরে আসেন। তাদেরও ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়েসট হয়ে জোরপূর্বক মিয়ানমারে প্রবেশ করানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বিদেশের মাটিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। ভয়াবহ নির্যাতন করে তাদের দিয়ে নানা ধরনের সাইবার জালিয়াতির কাজ করানো হতো।

ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের একজন জানান, তাকে দালাল বলেছিল, কম্বোডিয়াতে সরাসরি কোম্পানিতে চাকরি হবে। সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে বিএমইটি ছাড়পত্র দিয়ে কম্বোডিয়া পাঠানো হয়। কিন্তু কম্বোডিয়া বিমানবন্দর থেকে তিনি একমাসের ভিজিট ভিসায় প্রবেশের অনুমতি পান। এরপর আর ভিসা দেয়নি দালালরা। তিনি আরও জানান, ওই দেশে কোনও কোম্পানিই খুঁজে পাননি। সেখানে থাকা রিক্রুটিং এজেন্সির প্রতিনিধিরা টাকার বিনিময়ে তাকে স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেয়।

আরেক ভুক্তভোগী জানান, তাদেরকে শারীরিক নির্যাতন করে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে তাদের বাধ্য করা হতো। কাজ করতে না চাইলে তাদের টর্চার সেলে নিয়ে শারীরিক নির্যাতনসহ বিদ্যুতের শক দেওয়া হতো। সম্প্রতি কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী স্ক্যাম সেন্টার-বিরোধী অভিযান চালালে চাইনিজ নাগরিকরা পালিয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে তারা মুক্তি পান।

যেভাবে পাচার ও বিক্রি করা হয়

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে কম্বোডিয়ার দূতাবাস না থাকলেও আগে দিল্লি থেকে ভিসা ইস্যু করা হতো। স্টিকার ভিসা বন্ধ থাকলেও ই-ভিসা চালু ছিল। পাচারকারী-চক্রের সদস্যরা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াতে অবস্থিত কম্বোডিয়ার দূতাবাস থেকে ভিজিট ভিসা সংগ্রহ করে ভুক্তভোগীদের তৃতীয় কোনও দেশের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় পাচার করে।

ফিরে আসা ভুক্তভোগীরা জানান, যখন জানতে পারি—আমাদের ৩ হাজার ডলারে বিক্রি করা হয়েছে, তখন শত চেষ্টা করেও দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। পরিবার থেকেও পারেনি যোগাযোগ করতে। নির্যাতনের কারণে টাকা পরিশোধ করার পর আমাদের ছেড়ে দেয়।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশি দালাল মামুন কম্বোডিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। তার মাধ্যমে কয়েক হাজার বাংলাদেশি সেদেশের স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি হয়েছেন। এসব কম্পাউন্ডে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।

তাদের মতে, কম্পিউটার, কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দিয়ে নিয়োগের লক্ষ্যে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে (ভুয়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি) প্রচার চলে। এরপর তাদের সুকৌশলে স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক জিম্মি করে স্ক্যামের কাজে নিয়োজিত করা হয়।

ফেরত আসা বাংলাদেশিরা জানিয়েছেন, হাজার হাজার কর্মী চাকরি না পেয়ে সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অথচ বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সবাইকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। ভুক্তভোগীরা জানান, কাজে বাধ্য করার জন্য শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি ইলেকট্রিক শকও দেওয়া হতো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ভাইরাস মহামারির সময় এ ধরনের সাইবার অপরাধ আরও বেড়েছে এবং অপরাধে বৈচিত্র্য এসেছে। কম্বোডিয়ায় মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দূত অধ্যাপক ভিতিত মুনতারভর্ন তার এক প্রতিবেদনে সিহানুকভিলে স্ক্যামিং কম্পাউন্ডগুলোকে ‘নরক’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘‘কম্বোডিয়ার সাইবার কেলেঙ্কারি সেন্টারগুলোতে সাম্প্রতিক অভিযান সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের আগস্টে মানবপাচারের ওপর করা বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে কম্বোডিয়ার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ‘সহযোগী’ হিসেবে কাজ করছেন।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সাইবার স্ক্যাম নিয়ে সবার সচেতনতা জরুরি। এটি মানবপাচারের ভয়াবহ এক ধরন। ভালো চাকরির কথা বলে বিদেশে নিয়ে সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার স্ক্যাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো।’’

শরিফুল হাসান জানান, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তিন দিনে ২২১ জন বাংলাদেশির ফেরত আসা প্রমাণ করে—বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার। ফেরত আসা বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি মামলা করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুরো ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়াও উচিত।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা মামলাটি তদন্ত করছেন। মূল আসামিরা নজরদারিতে আছে।

এর আগে গত মে মাসে কম্বোডিয়ায় এক বাংলাদেশিকে নির্যাতন এবং তার পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের একটি মানবপাচার মামলায় প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। জিজ্ঞাসাবাদের সময় চক্রের অন্য সদস্যদের যোগসাজশে আসামি ফিরোজ ভুক্তভোগীকে কম্বোডিয়ায় পাচার এবং নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পিবিআই। অভিযুক্ত ব্যক্তি ১৮ মে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার অধীনে আদালতে একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।

পিবিআই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাচারকারী সিন্ডিকেটের বাকি পলাতক সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছে। বিএমইটি’র কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাইবার স্ক্যামের ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর থেকে ছাড়পত্র ইস্যু করা বন্ধ আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় মানবপাচারের ঘটনায় চারটি পৃথক মামলা হয়েছে।

কম্বোডিয়া সরকার কী করছে

কম্বোডিয়া কর্তৃপক্ষ গত বুধবার (১৭ জুন) বলেছে যে দেশে চলমান অপরাধমূলক সাইবার অপরাধ কার্যক্রম দমন করার জন্য সরকারি সংস্থাগুলোকে প্রধানমন্ত্রী হুন মানেটের আদেশের কারণে এ সপ্তাহে এখন পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হুন মানেট ‘সুরক্ষা, জনশৃঙ্খলা এবং সামাজিক সুরক্ষা’ বজায় রাখা এবং সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের অনুমোদন দিয়ে এই আদেশ জারি করেছেন।

হুন মানেটের মঙ্গলবারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সরকার লক্ষ করেছে যে অনলাইন কেলেঙ্কারি বর্তমানে বিশ্ব ও অঞ্চলে হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করছে। কম্বোডিয়ায় বিদেশি অপরাধী গোষ্ঠীগুলো অনলাইন কেলেঙ্কারিতে জড়িত হওয়ার জন্য অনুপ্রবেশ করেছে।’’

জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থাগুলো অনুমান করে যে, সাইবার কেলেঙ্কারি, যার বেশিরভাগই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে উদ্ভূত, আন্তর্জাতিক অপরাধীগুলো বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার উপার্জন করে।

তথ্যমন্ত্রী নেথ ফেক্ট্রা এবং পুলিশের বিবৃতি অনুসারে, সোমবার (১৫ জুন) থেকে বুধবারের (১৭ জুন) মধ্যে কমপক্ষে পাঁচটি প্রদেশে অভিযানে ১ হাজারেও বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

আটককৃতদের মধ্যে ২০০ এরও বেশি ভিয়েতনামি, ২৭ চীনা এবং তাইওয়ান থেকে ৭৫ জন সন্দেহভাজন এবং রাজধানী নম পেন এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সিহানুকভিলে ৮৫ জন কম্বোডিয়ান আছে। এ সময় পুলিশ কম্পিউটার ও শত শত মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করেছে।

মন্ত্রী বলেন, সাইবার কেলেঙ্কারি এবং জুয়া ক্রিয়াকলাপের জন্য কুখ্যাত থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী একটি শহর পোইপেটে বুধবার ৪৫ জন নারীসহ কমপক্ষে ২৭০ জন ইন্দোনেশিয়ানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ক্রেটির পুলিশ থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার এবং ভিয়েতনামের নাগরিকসহ ৩১২ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং ভিয়েতনাম, চীন এবং মিয়ানমার থেকে পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ পারসাত থেকে ২৭ জনকে গ্রেফতার করেছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত মে মাসে কম্বোডিয়ায় সাইবার অপরাধের ১৮ মাসের তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে যে ‘‘চীনা অপরাধী দলগুলোর পরিচালিত সাইবার স্ক্যাম সেন্টারগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততা আছে।’’

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
আরও
Advertise with us

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

রবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০ 

ফলো করুন দেশবার্তা-এর খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক
মো: সামসুদ্দীন চৌধুরী
সম্পাদকীয় কার্যালয়