
নিজস্ব প্রতিবেদক | বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

একসময় ঈদ, পূজা কিংবা দীর্ঘ ছুটির মৌসুম মানেই ছিল কুয়াকাটায় পর্যটকদের ঢল। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকতো সাগরকন্যা খ্যাত এই জায়গাটি। হোটেল-রিসোর্টে কক্ষ পাওয়া ছিল দুষ্কর, ব্যবসায়ীদের দোকানে উপচে পড়ত ক্রেতার ভিড়। তবে সেই চিত্র এখন আর নেই। অব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত অবনতি, সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট নানা প্রশ্নে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই সৈকতের আকর্ষণ ক্রমেই ম্লান হচ্ছে। ফলে পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগও পড়েছে চাপের মুখে।
বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রসৈকত হিসেবে কুয়াকাটার বিশেষ পরিচিতি রয়েছে একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগের কারণে। তবে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
কুয়াকাটা টাইলস মার্কেটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও রাসেল ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিক মো. রাসেল ফকির জানান, গত বছরের কোরবানির ঈদের পরবর্তী ১০ দিনে তার দোকানে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকার পণ্য। অথচ চলতি বছর একই সময়ে বিক্রি নেমে এসেছে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে।
তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে আমরা ঋণ করে দোকানে মালামাল তুলি। সাধারণত ঈদের পর পর্যটকদের কাছে বিক্রি করেই সেই দেনা পরিশোধ করা যায়। কিন্তু এবার পর্যটক কম থাকায় বিক্রিও আশানুরূপ হয়নি। ফলে অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
স্থানীয় হোটেল ও রিসোর্ট মালিকরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও ছুটির মৌসুমে অধিকাংশ আবাসিক প্রতিষ্ঠানের কক্ষ শতভাগ বুকড থাকত। বর্তমানে অনেক সময় অর্ধেক কক্ষও ভাড়া হয় না। পর্যটকদের আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে সৈকতের পরিবেশ, সেবার মান এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দায়ী।
পর্যটকদের অন্যতম অভিযোগ সৈকতের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক, পলিথিন, পানীয়ের বোতল ও খাবারের প্যাকেটসহ নানা ধরনের বর্জ্য ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে সৈকতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে উপকূল রক্ষায় স্থাপিত জিওব্যাগ ও কংক্রিট কাঠামোও অনেকের মতে সৈকতের নান্দনিকতা নষ্ট করছে।
পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে শুধু পর্যটন নয়, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক পরিবেশও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সৈকতের বিভিন্ন অংশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়ে ওঠা অস্থায়ী দোকানও পর্যটকদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চায়ের দোকান, খাবারের স্টল ও বিনোদনসামগ্রীর ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ায় অনেক এলাকায় স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত মূল্য আদায়, অটোরিকশার বাড়তি ভাড়া, সৈকতে মোটরবাইকের বেপরোয়া চলাচল এবং ভিক্ষুকের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়েও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কুয়াকাটায় বেড়াতে এসেছেন মেহেদী হাসান আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, মাছের জন্য বিখ্যাত এলাকায় এসেও অনেক রেস্টুরেন্টে নিম্নমানের বা বাসি মাছ পরিবেশন করা হচ্ছে। অথচ দাম অত্যন্ত বেশি। এ ধরনের অভিজ্ঞতা পর্যটকদের হতাশ করে।
সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড বিলাসের জেনারেল ম্যানেজার আল-আমিন উজ্জ্বল বলেন, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার পরবর্তী ১০ দিনে তাদের রিসোর্টের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বুকিং ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে একই সময়ে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বুকিং পেতেও হিমশিম খেতে হয়েছে, তাও মাত্র কয়েক দিনের জন্য।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, গত এক দশকে কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে। আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট এবং বিভিন্ন পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু পর্যটক কমে যাওয়ার বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এসব বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. অপূর্ব রায়ের মতে, পর্যটক কমে যাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে প্রথম আঘাত আসবে পর্যটননির্ভর প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে স্থানীয় অর্থনীতিতে এবং পরবর্তীতে ক্ষতির মুখে পড়বেন বড় বিনিয়োগকারীরাও। দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা) কুয়াকাটার আহ্বায়ক কেএম বাচ্চু বলেন, কুয়াকাটা শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল। অপরিকল্পিত স্থাপনা, প্লাস্টিক দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির আহ্বায়ক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, কুয়াকাটার উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। সৈকতের নান্দনিকতা ফিরিয়ে আনতে জিও ব্যাগ ও কংক্রিট কাঠামোর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি টুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আচরণগত উন্নয়নে নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
